www.muktobak.com

আমার চোখে নাজিম হিকমত


 প্রথম আলো    ১৭ অক্টোবর ২০১৮, বুধবার, ১২:৪৭    বইপত্র


আমার চোখে নাজিম হিকমতনাজিম হিকমতকে সোভিয়েত ইউনিয়নে অনেকেই ডাকত ‘নীলচোখো দানব’ নামে। নারীরা তাঁকে ভালোবাসত। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, তাঁর সবচেয়ে উথালপাতাল করা ভালোবাসা ছিল ভেরা তুলিয়াকোভার প্রতি, এটাই ছিল নাজিমের শেষ প্রেম। ভেরার সঙ্গে নাজিমের দেখা হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নেই। পঞ্চাশের দশকে যখন রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে নাজিম হিকমত সোভিয়েত ইউনিয়নে চলে এলেন, তখনই। নাজিমের সঙ্গে ভেরার বয়সের ব্যবধান ছিল ৩০ বছর। নাজিম জন্মগ্রহণ করেন ১৯০২ সালে, ভেরার জন্ম ১৯৩২ সালে।

ভেরা তুলিয়াকোভা ছিলেন নাজিম হিকমতের চতুর্থ স্ত্রী। ১৯৬০ সালে তিনি ভেরাকে বিয়ে করেন। ১৯৬৩ সালের ৩ জুন নাজিম মারা যাওয়ার পরের বছর ভেরা নাজিমের সঙ্গে শেষ কথোপকথন নামে একটি বই লেখেন। এ বইয়ের তিনটি সংস্করণ হয়েছে তুরস্কে—রাশিয়ায় এটি ছাপা হয় ২০০৯ সালে। ২০০৮ সালে ভেরার বইটি অবলম্বন করে ভালোবাসার চেয়ে বেশি কিছু নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করা হয়। এটি দেখানো হয় রাশিয়ার সংস্কৃতি চ্যানেলে। নাজিমকে কবর দেওয়া হয় মস্কোর নভোদেভিচিয়েম কবরস্থানে। সেখানেই সমাহিত হন ভেরা তুলিয়াকোভা। তিনি মারা গেছেন ২০০১ সালের ১৯ মার্চ। এখনো অনেক মানুষ প্রতিদিন তাঁদের সমাধিস্থলে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন।

নাজিমের সঙ্গে শেষ কথোপকথন নামে যে বইটি লিখেছিলেন ভেরা, তা থেকে চারটি চুম্বক ঘটনার উল্লেখ করা হলো এখানে। বইটির নামই বলে দিচ্ছে, এটা কোনো জীবনীগ্রন্থ নয়। ভেরা তুলিয়াকোভা হিকমত যেভাবে দেখেছেন নাজিম হিকমতকে, সেভাবেই লিখেছেন। বইটি লেখা হয়েছে কথা বলার মতো করে। লেখাটি ছাপা হয়েছে মিডিয়াম ডট কম–এ।

প্রথম স্বীকারোক্তি

একদিন তুমি আমাকে ফোন করলে, বললে পুরোনোকালের ফরাসি ছবি রাইকের সন্তানেরা দেখতে চাও। এই ছবির প্রদর্শনী করা সে আমলের জন্য ছিল খুবই কঠিন কাজ। আমরা রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ থেকে বহু কষ্টে সে ছবি বের করলাম। ১৯৫৬ সালের ৩ নভেম্বর তুমি এলে ছবিটি দেখতে। সঙ্গে নিয়ে এলে বাবায়েভসহ কয়েকজন বন্ধুকে।

বছরের প্রথম দিকের তুষারপাতের সময় বলে ঘর গরম করার যন্ত্রগুলো তখনো ছাড়া হয়নি। খুব ঠান্ডা ছিল হলটি। আমরা পোশাক না ছেড়েই ওভারকোট পরে বসে গেলাম সিটে। বিষণ্ন, মলিন আর্লেকিনের প্রেমে বিমোহিত লুই বারো তাঁর অনুভূতির প্রকাশ দিয়ে আমাদের বিমোহিত ও বিস্মিত করলেন। তুমি খুবই রোমাঞ্চিত ছিলে সেদিন। তুমি আমাকে পাশে এসে বসতে বললে। আমি খেয়াল করে দেখলাম, তোমার মধ্যে কেমন এক অস্থিরতা। আমার মনে হলো, তুমি শীতে জমে যাচ্ছ, তাই আমি বুফেত (ক্যানটিন) থেকে তোমার জন্য গরম চা নিয়ে এলাম। তুমি চা খেলে, কিন্তু হাতেই রেখে দিলে চায়ের গ্লাস (কাপে নয়, রুশ দেশে সাধারণত রং চা খাওয়া হয় বড় বড় কাচের গ্লাসে)। আমি গ্লাসটা ক্যানটিনে নিয়ে যাই, সেটা তুমি চাওনি। ছবিটি আমার মনে তুমুল আলোড়ন তুলল। আমি সেদিনই প্রথম জনপ্রিয় অভিনেতা লুই বারোর অভিনয় দেখলাম। তাঁকে আমি কখনোই ভুলব না। কারণ, তাঁর সঙ্গেই আমার জীবনের সবচেয়ে দামি মুহূর্তটির সংযোগ। সেই মুহূর্ত বিস্মিত হওয়ার, মুক্তির।

নাজিম, তুমি তোমার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালে। হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়ালে এবং বললে, ‘আমার এখন যেতে হবে।’ আমি খুবই অবাক হলাম, এই সিনেমা দেখার জন্য নিজেই অনুরোধ করেছিলে তুমি আর এখন ছবিটা পুরো না দেখেই বেরিয়ে যাচ্ছ!

‘আপনার কি ছবিটা ভালো লাগছে না?’




 আরও খবর