www.muktobak.com

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও সাংবাদিকতা


 শাকিল মাহমুদ    ১৯ এপ্রিল ২০১৯, শুক্রবার, ১০:৫৪    আন্তর্জাতিক


জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে পালতে রীতিমতো হিমশিম অবস্থা ছিল ইকুয়েডরের। লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে বসে অ্যাসাঞ্জ কী করতে পারবেন কিংবা করতে পারবেন না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছিল। দূতাবাসের নিরাপত্তা ক্যামেরা বন্ধ করে দেন অ্যাসাঞ্জ। দূতাবাসের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখা ও নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছিলেন অ্যাসাঞ্জ। চলতি বছরের শুরুর দিকে ভ্যাটিকান সম্পর্কিত কিছু দলিলপত্র ফাঁস করে উইকিলিকস।

ইকুয়েডর প্রেসিডেন্ট বলছেন, এসব কাগজপত্র ফাঁসের মাধ্যমে বিশ্ব নিশ্চিত হয়েছে যে, উইকিলিকসের মাধ্যমে অ্যাসাঞ্জের এখনও সম্পর্ক আছে এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তারা হস্তক্ষেপ করছে। ৯ বছর আগে উইকিলিকস একটি ভিডিও ফাঁস করে। ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে বেসামরিক লোকদের গুলি ছুড়ে হত্যার দৃশ্য ছিল এটি। আফগানিস্তানে শত শত বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। ইরাকে ৬৬ হাজারের বেশি বেসামরিক লোককে হত্যার কথা প্রথম ফাঁস করে উইকিলিকস। ইরাকি সেনা দ্বারা বন্দি নিপীড়ন ও মার্কিন কূটনীতিকদের মধ্যে আদান-প্রদানের আড়াই লাখ বার্তাও উন্মোচন করে দেয় অ্যাসাঞ্জের ওয়েবসাইট। যদিও এগুলো গোপন রাখা হয়েছিল।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক বিশ্নেষক চেলসি ম্যানিং কর্তৃক ফাঁস করে দেওয়া বহু তথ্যও প্রকাশ করে উইকিলিকস। ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেন হামলার দিন একে অপরের খবর নিতে স্বজনরা যে পেজার বার্তা প্রদান করেছিলেন, তারও ছয় লাখ বার্তা প্রকাশ করে উইকিলিকস। এমনকি প্রেসিডেন্ট বুশ সম্পর্কিত বার্তাও ছিল এতে। যাতে লেখা ছিল- প্রেসিডেন্টের গমন পথ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। তিনি ওয়াশিংটন ফিরছেন না। তবে কোথায় যাবেন, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন। ২০১৫ সালে মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সনি পিকচারসের দুই লাখ ই-মেইল ও ২০ হাজার নথি ফাঁস করা হয়। উঠে আসে লিওনার্ডো ডি ক্যাপ্রিওকে গালি দেওয়া এবং অ্যাঞ্জেলিনা জোলিসহ জনপ্রিয় তারকাদের সম্পর্কে প্রোডিউসারের কটূক্তিমূলক কথাবার্তার বিষয়টিও।

১১ এপ্রিল সেই অ্যাসাঞ্জকে যেভাবে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে টেনে-হেঁচড়ে বের করে আনে ব্রিটিশ পুলিশ, তা নিঃসন্দেহে মানবাধিকারের লঙ্ঘন। সরকারের গোপন তথ্য সংবলিত একটি কম্পিউটার হ্যাকের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে অভিযুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। কিন্তু তারপরও ২০১৮ সালের মার্চে উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে ভার্জিনিয়ার আদালতে এই অভিযোগ দায়ের করা হলেও এতদিন বিষয়টি গোপন রাখা হয়। ১১ এপ্রিল অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতারের পর বিষয়টি প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে গোপনীয় তথ্য প্রকাশের জন্য তার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অভিযোগ নেই। এটিকে মার্কিন সরকারের কৌশল বলছেন অনেকে। অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে শুধু হ্যাকিংয়ের ষড়যন্ত্রেও অভিযোগ আনা ছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের চতুর একটি সিদ্ধান্ত। গোপন তথ্য প্রকাশের জন্য গুপ্তচরবৃত্তির অপেক্ষাকৃত বড় অভিযোগ আনার সুযোগ ছিল তাদের সামনে। কিন্তু মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংক্রান্ত ধারাটির ওপর তা সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হতে পারত। সেটি সুকৌশলে এড়াতেই হয়তো এমন চেষ্টা। তথ্য প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়টি বাদ দিয়ে অবৈধভাবে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সাংবিধানিকভাবে নিরাপদ মনে হচ্ছে। অন্য দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তথ্য প্রকাশের আইনটি আলাদা। সেখানে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা তথ্য শুধু বৈধই নয়, এমনকি সাংবিধানিকভাবে তা সুরক্ষিতও। অভিযোগপত্রে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, অ্যাসাঞ্জ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের 'ক্ল্যাসিফায়েড ডকুমেন্টস' এবং যোগাযোগ রক্ষায় ব্যবহূত নেটওয়ার্ক সিক্রেট ইন্টারনেট প্রটোকলের সঙ্গে যুক্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি কম্পিউটারের সংরক্ষিত পাসওয়ার্ড ভাঙার ব্যাপারে সহযোগিতা দিতে সম্মত হয়েছিলেন। এ অভিযোগ প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে অ্যাসাঞ্জকে। মার্কিন অভিযোগপত্রে সরকারি কম্পিউটার হ্যাকিং করাকে গোপন তথ্য প্রকাশের থেকে আলাদা করে দেখানোটা তাৎপর্যপূর্ণ। অভিযোগপত্রে সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও উইকিলিকসের কাছে তথ্য ফাঁসকারী চেলসিয়া ম্যানিংসহ অন্য ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে অ্যাসাঞ্জ কীভাবে অনলাইন  চ্যাটের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেছেন এবং 'ক্লাউড ড্রপ বক্সে'র মাধ্যমে কীভাবে তথ্য আদান-প্রদান করেছেন, তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। 

এ অভিযোগপত্রে সাংবাদিকতার এমন অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, যা শুধু আইনসঙ্গত নয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতারও মূল বিষয়। সাংবাদিকরা যেভাবে তাদের সোর্স বা সূত্র বজায় রাখেন এবং তাদের সঙ্গে নিরাপদে যোগাযোগ করেন, সে প্রক্রিয়া এর মাধ্যমে হুমকির মুখে পড়েছে। এখানে বড় সমস্যা হলো অভিযোগপত্রে সাংবাদিকতার সম্পূর্ণ বৈধ কর্মকাণ্ডকে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের প্রতি যেহেতু বিরাগভাজন; তাই অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে হয়তো আরও অভিযোগ আনা হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে শত্রু ভাবেন ট্রাম্প। মার্কিন সরকারের এই মামলা পরিচালনা প্রক্রিয়ার ওপর গভীর নজর রাখা প্রয়োজন। কারণ সরকারের এই মামলা পরিচালনা প্রক্রিয়া সাংবাদিকতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। 

বলা দরকার, উইকিলিকসের মাধ্যমে সায়েন্টিফিক জার্নালিজমকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। এই দর্শনটি মূলত এসেছে কার্ল পোপারের দর্শন থেকে। ২০১০ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অ্যাসাঞ্জ বলেছিলেন, তিনি নতুন মানদণ্ড নির্মাণ করতে চান, তা হলো- বৈজ্ঞানিক সাংবাদিকতা। অ্যাসাঞ্জ বলেছিলেন, ধরেন আপনি ডিএনএ বিষয়ে একটি পেপার প্রকাশ করলেন, এ ক্ষেত্রে গবেষণার পুঙ্খানুপুঙ্খ সব নথিই থাকতে হবে জার্নালে, যাতে পাঠক সহজেই এগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি  সম্ভব। আর এ অসম্ভবকে সামনে এনেছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। 

সিনিয়র ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট
shakilmahmud.bd@gmail.com

দৈনিক সমকালে ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত। - মুক্তবাক




 আরও খবর