www.muktobak.com

আমাদের গণমাধ্যম : অন্ধকার যুগ


 শওকত মাহমুদ    ২১ এপ্রিল ২০১৯, রবিবার, ১:১২    মতামত


এখন বই-ই পড়া হয় না। টিভি, ইন্টারনেট, অনলাইন, ফেসবুক দাপিয়ে বেড়ায় মুহূর্তগুলো। অবসর মানেই হাতে টিভি রিমোট কন্ট্রোল বা স্মার্টফোনের বোতাম। আর অ্যাকশন ছবি অথবা অ্যাভেঞ্জার্স বা ক্যাপ্টেন মার্ভেল ছাড়া অন্য কোনো সিনেমা ভালোই লাগতে চায় না। কী এক অদ্ভুত পতনে আমরা। কেন ও কিভাবে এ পতন?

ক্রিস হেজ নামে পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া আমেরিকার এক সাংবাদিক তার বেস্ট সেলার ডেথ অব দ্য লিবারেল ক্লাস (২০১০) বইয়ে এর সঠিক উত্তরটি দিয়েছেন। তিনি বলছেন- 'The death of the liberal class has been accompanied by a shift from a print based culture to an image based culture. The demise of newspapers- along with that of book publishing coupled with degradation of our educational system for all but the elites, has created a culture in which verifiable fact, which is rooted in the complexity and discipline of print, no longer forms the basis of public discourse or our collective memory. It has been supplanted by the blogosphere, the social media universe and cable television..... This shift has denied many citizens the intellectual tools for critical thought and civic dialogue - the discourse that creates informed citizens. Images and words defy the complex structures of print when isolated from the context.

আমি ইন্টারনেট বা তথ্যপ্রযুক্তি বিরোধী নই। শুধু অসহায়ত্বের কথা বললাম। এর মধ্যেই চোখে পড়ল হাউ ডেমোক্র্যাসিস ডাই অর্থাৎ গণতন্ত্রের মৃত্যু যেভাবে আসে। গণতন্ত্রহীন এক রাষ্ট্রের নাগরিকের কাছে এমন শিরোনামের বই তো সুস্বাদু। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতন্ত্র নিয়ে ২০ বছরের বেশি সময় গবেষণা করছেন এমন দুই পণ্ডিত প্রফেসর স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবল্যাট বইটি লিখেছেন। তারা ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার গণতন্ত্র নিয়ে, সেসবের বিচ্যুতি নিয়ে সমীক্ষা করতে করতে এবার নিজ দেশের প্রতি চোখ ঘুরিয়েছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অস্বস্তিকর ব্যক্তির উত্থান এবং মৌলিক অধিকারের প্রতি তার তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টি তাদের উদ্বেগের কারণ। তারা বিশ্বময় গণতন্ত্রের ওপর যুগান্তকারী কিছু পর্যবেক্ষণও দিয়েছেন। বইটি ২০১৮ সালে বেরিয়েছে এবং নিউইয়র্ক টাইমসের মূল্যায়নে সেরা কাটতির বই। লেখকদ্বয় বলছেন, মিলিটারি ক্যু, মার্শাল ল বা সংবিধান স্থগিত করার মধ্য দিয়ে একসময় গণতন্ত্রকে হত্যা করা হতো। স্নায়ুযুদ্ধকালে গণতন্ত্র হত্যার প্রতি চারটি ঘটনার তিনটিই ছিল সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এখন জেনারেলদের হাতে নয়, গণতন্ত্র মারা যায় নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর হাতে। এ মৃত্যুতে নাটকীয় কিছু থাকে না, ঘটে ধীরে ধীরে, কিন্তু এর ধ্বংস ক্ষমতা আরো বেশি। বিপদটা হচ্ছে, জনগণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এটা বুঝতেই পারে না, বরং মনে করে গণতন্ত্রের ঘষামাজা চলছে। উন্নয়নের সুঘ্রাণ ম ম করছে চার দিকে। হোক না কর্তৃত্ববাদ বা একদলীয় শাসন, কিন্তু সংসদ বসছে, আদালত চলছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ জারি আছে, মিডিয়া সত্য এড়িয়ে চললেও মিউ মিউ তো করছে। অথচ চার দিকে কেমন এক নীরবতা। ভিন্নমতের প্রকাশ ঘটলেই গুম বা নিপীড়ন, কেউ মুখ খুলছে না। আসলে গণতন্ত্র মরে যাচ্ছে। নির্বিকারচিত্তে কালো আইন পাস করতে উন্মুখ হয়ে আছে সংসদ।

Those who denounce government they may be dismissed as exaggerating or crying wolf. লেখকদ্বয় বলছেন, হিটলার ১৯৩৩ সালে জার্মানির রাইখস্টাগের অগ্নিকাণ্ডের পর গণতন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দিলো। সেটা কিন্তু সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না। মুসোলিনির ফ্যাসিবাদও এ রকমই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনেক ক্যু-এর ঘটনা ঘটল। ১৯৭৩ সালে চিলির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে মেরে গদিতে বসে গেল সেনাপ্রধান জেনারেল পিনোশে। কিন্তু এখন দুনিয়ায় খুব কমই ঘটে ক্যু। এর উসকানিদাতারাও নাকি হাত গুটিয়ে নিয়েছে। ভেনিজুয়েলা, জর্জিয়া, হাঙ্গেরি, নিকারাগুয়া, পেরু, ফিলিপাইন, পোল্যান্ড, রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইউক্রেন প্রভৃতি দেশে নির্বাচিত নেতারাই গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরেছেন। এ বিপর্যয় শুরু হয়েছে ভোট জালিয়াতির মধ্য দিয়ে। ট্রাম্প, পুতিনের নির্বাচন আরো এককাঠি সরেস।

হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ও তার ফিডেস পার্টি এ দশকে উদার গণতন্ত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৯৮ থেকে ২০০২ পর্যন্ত গণতান্ত্রিকভাবেই হাঙ্গেরি চালিয়েছেন ভিক্টর। কিন্তু ২০১০ সালে ক্ষমতায় ফিরে আগাগোড়া স্বৈরাচারী হয়ে গেলেন। আমাদের দেশেও এমন নজির আছে। এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তান পর্যন্ত লেখকদ্বয় এগিয়েছেন, ভাগ্যিস বাংলাদেশ অবধি আসেননি।

আপনি এসব রাজনীতিবিদের কর্তৃত্বপরায়ণতা বুঝবেন কিভাবে? তাদের আগের গণতান্ত্রিক রেকর্ড তো ভালো। তাই স্বৈরাচারী মনেই হতো না। ওই দুই প্রফেসর স্বৈরশাসকদের আচরণগত চারটি বিপদ সঙ্কেতের কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন : ০১. যদি একজন রাজনীতিবিদ গণতন্ত্রের বিধিবিধান মানতে না চান, অর্থাৎ বিভিন্ন সংগঠন বা গণমাধ্যম নিষিদ্ধ করেন কি না, নাগরিক অধিকার খর্ব করেন কি না; ০২. রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদের স্বীকৃতি দেন কি না, নাকি উল্টো বিরোধীদের রাষ্ট্রদ্রোহী বা সন্ত্রাসী বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি মনে করেন; ০৩. তারা ভায়োলেন্সকে সমর্থন করেন কি না, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে দুর্বৃত্ত লেলিয়ে দেন কি না, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা করান কি না; ০৪. বিরোধী দলের বা সুশীলসমাজের অধিকার খর্ব ও মিডিয়া বন্ধ করেন কি না, সংবাদপত্র ও সাংবাদিক নিপীড়ন কিংবা বাকস্বাধীনতা আটকে দেন কি না। এ নিবন্ধে শুধু মিডিয়ার মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করছি। অন্যগুলো পাঠক নিজেরাই বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় মিলিয়ে নিন।

দেশের বর্তমান রাজনীতির হাল-হকিকত ভোট-তামাশা, বিরোধী দলের দমবন্ধ অবস্থা, সরকারি তরফে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা করা, মানবাধিকারের চরম বিপর্যয় নিয়ে ফের বলাবলি হয়েছে ও হচ্ছে। গত এক দশক সময়ে খুন হয়েছেন ৩৫ জন সাংবাদিক। এর একটা ঘটনারও বিচার হয়নি। শুধু চলতি সালের প্রথম তিন মাসেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৪ জন সাংবাদিক। ২০১৩ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় জনপ্রিয় দৈনিক আমার দেশ এবং টিভি চ্যানেল দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি। এই যে মিডিয়া সংহার এবং কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কথিত কলম পেশা মজুরদের ওপর নিপীড়ন- এটা গণমাধ্যমের ধূসর একটা দিক। আরেকটি দিক হচ্ছে, সরকারের সাথে রাজনৈতিক দূরত্বহীন সাংবাদিকেরা মোটা দাগে আজ সচ্ছল, বেশ কয়েকজনের জন্মদিন পালন করা হয় ফাইভ স্টার হোটেলে, কেউ ব্যাংকের মালিক, টিভি মালিক। তাদের হাতেই মিডিয়া এবং তথ্যপ্রবাহ। তারা সজ্ঞানে অথবা সেন্সর-গোয়েন্দাদের সহায়তায় সংবাদ বা গল্পপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের মিডিয়ায় মন্ত্রীদের বক্তব্যেই বেশির ভাগ নিউজ, ৯০ ভাগ খবরের উৎস সরকার। এ অবস্থায় মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে গেছে। তাই ফেসবুকের কদর বেশি। গুজবও ক্ষণে ক্ষণে ডালপালা ছড়ায়।

পেশাগত সততা বা সত্যের প্রতি অঙ্গীকার বিকিয়ে দেয়া যায় না। এই উপমহাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস তো দ্রোহের ইতিহাস। টানাটানির সংসারেও দীপ্যমান ছিল আদর্শ। মুক্তিযুদ্ধের আগে সাংবাদিকেরা তো অভাবে ছিলেন না। কেন তারা মুক্তিযুদ্ধে গেলেন, বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রাণ দিলেন? পাক-হানাদার বাহিনী কেনইবা জাতীয় প্রেস ক্লাবে গোলা ছুড়ল, ইত্তেফাক, সংবাদ, পিপল অফিস আগুনে পুড়িয়ে দিলো? এই তো সেদিন, যেদিন বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংসদে পাস করা হলো, একদল সাংবাদিককে দফতরে ডেকে নিয়ে ২০ কোটি টাকা অনুদান দেয়া হলো। অন্য দিকে যারা প্রতিবাদী, যারা সরকারের পীড়ন নীতির ঘোরতর বিপক্ষে, তারা খেয়ে না খেয়ে প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন। তাদের ৯০ ভাগই কর্মচ্যুত।

দক্ষতা থাকলে কী হবে, রাজনৈতিক বিশ্বাসের দরুন তারা চাকরি পান না। বেকারদের আড্ডায় হঠাৎ করে কেউ যখন অফিসে যাবো বলেন, তখন চাপাকান্না জমে ওঠে বাকিদের। কত দিন অফিস দেখেন না! কেউ কোথাও চাকরি পেলে চিহ্নিত লোকজন হইচই করে তাড়িয়ে দেয়। শুধু তারাই নয়, বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী যেসব সিনিয়র ও দক্ষ সাংবাদিক রয়েছেন, তারাও চাকরি পান না তদবিরের অভাবে নতুবা জুনিয়র মিডিয়া বসদের অনীহায়। সুলেখক শঙ্খ ঘোষের কথাতেই বলি না কেন, রাষ্ট্র তার প্রশস্তি চায়। আর সেই প্রশস্তি উপার্জনের জন্য একটা সাজানো তথ্যভাণ্ডার মজুদ থাকে, থাকে দেশের কিছু নির্বাচিত মার্জিত আর সমৃদ্ধ অংশ। বহিরাগত মান্য কোনো অতিথির কাছ থেকে ভালো কথাটা আদায় করে নেয়া হয় এভাবে। আবার কথার মধ্যে দু-চারটে নেতির ইঙ্গিত থাকলে তা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টার মধ্যে বিশেষ তফাত নেই এখানে-ওখানে।

বিজ্ঞানী প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ দেখেছিলেন, ইতালির কাগজগুলো লিখেছে- রবীন্দ্রনাথ কেবলই মুসোলিনি সরকারের জয়গান করে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি যে বারবার এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন শুধু বাইরের সফলতাই একমাত্র কাম্য বস্তু নয়, রাষ্ট্রের মানুষগুলোর মন কিভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ আছে সেটাই সাফল্যের প্রধান পরিচয় সেসব কথার কোনো চিহ্ন নেই কাগজে। কেননা, রাষ্ট্রের বিবেচনায় ওই অংশ সাধারণ মানুষের কাছে তেমন কোনো তথ্যই নয়। এ ব্যাপারটা কি কেবল মুসোলিনির ইতালিতেই ঘটে শুধু?

আজকের বাংলাদেশে ২০০৭ থেকে এখন পর্যন্ত আমরা কী দেখছি? আইন, মানবিকতা, মানবাধিকার, ভিন্নমত পোষণ ও চর্চার অধিকার কি মুখ থুবড়ে পড়েনি? রবীন্দ্রনাথ যেমনি মুসোলিনির ইতালিতে গিয়ে প্রথমে খুব মন্দ কিছু দেখতে পাননি, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন নানা সরকারি উৎসবে ঢাকায় এসে কি সেভাবেই দেখেননি বা দেখতে চাননি? তিনি একবারো তো বললেন না, আপনাদের দেশেই তো একজন নোবেল বিজয়ী আছেন, তিনি কোথায়, তাকে ডাকুন না, তাকে প্রধান অতিথি করুন না।

সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র শতবর্ষে মস্কো থেকে ছাপা হয়েছিল একটি নথিপত্রের সঙ্কলন, সেখানে তার দিনযাপন বিষয়ে নথিপত্র। এতে রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠিগুলো ছাপা হয়েছিল, কিন্তু ১৩ নম্বর চিঠিটি বাদে। কারণ রাশিয়া চায়নি, ওই চিঠিটি রুশ জনগণ জানুক। চিঠিটির একাংশে ছিল... মানুষের ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত সীমা এরা যে ঠিক ধরতে পেরেছে, তা আমার বোধ হয় না। সে হিসেবে এরা ফ্যাসিস্টদের মতো। এ কারণে সমষ্টির খাতিরে ব্যষ্টির প্রতি পীড়নে এরা কোনো বাধাই মানতে চায় না। ভুলে যায়, ব্যাষ্টিকে দুর্বল করে সমষ্টিকে সবল করা যায় না, ব্যষ্টি যদি শৃঙ্খলিত হয় তবে সমষ্টি স্বাধীন থাকে না। মধ্যরাতের পুলিশি ভোটে (জনবয়ান মতে, ঊর্ধ্বতন বাহিনীগুলোর পাহারায়) সরকার ক্ষমতায়। সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচনে কেন্দ্রে কেন্দ্রে সক্কালবেলা ব্যালট পেপার পাঠিয়ে নির্বাচন কমিশন পরে হলেও স্বীকার করে নিয়েছে যে, সংসদ নির্বাচনে আগের বিকেলে ব্যালট পেপার পাঠানো এবং রাতে বাক্সগুলো ভরে দেয়াটা ঠিক হয়নি। এমন মহাচুরি নিয়ে সরকার ;বেশরম আর বিরোধী দল তো একরত্তি প্রতিবাদই করেনি। হয়তো অপেক্ষা করছিল আপনা-আপনি দয়া-দাক্ষিণ্যে কিছু আসন মিলতেও পারে।

মিডিয়া এই দুটি ভোট-বধের ঘটনা রেখেঢেকে হলেও বলার চেষ্টা করেছে। ব্যস, এ টুকুই। গণমাধ্যমের কথা বলছি এ জন্য যে, আজ সত্য থেকে দূরে দাঁড়িয়ে তারা। কারণ, সত্য বলার ভয়াবহ বিপদ আছে। বরং নানা অপপ্রচার সত্যকে আড়াল করতে চায়। স্বেচ্ছায় বা চাপে সত্যকে আজ ঘুরিয়ে নিলেই এক লহমায় মিথ্যে, আর মিথ্যাকেই বানিয়ে নিই সত্য। পাতায় পাতায় খুঁজে বেড়াই কে আমাদের শত্রু, যেন কারোই কোনো বন্ধু নাই কোথাও (মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে : শঙ্খ ঘোষ।)

মন্ত্রণালয় নয়, নতুন এক নিয়ন্ত্রক প্রতি সেকেন্ডেই অপলক মনিটরিং করছে। শোনা যায়, টকশোতে কথক বাছাইয়ে তারা ভূমিকা রাখে। নিরপেক্ষতা তো এক ধরনের মায়ামৃগ পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় দলিলের রূপকথা শীর্ষক লেখায় ২০০৫ সালে চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এভাবে-সংবাদ আজকে মূলত গল্পপ্রবাহ। তথ্যকে আর শালগ্রামশিলার মতো অপরিবর্তনীয় মনে করার কারণ নেই। তথ্যচিত্র যে বাস্তবের প্রশংসাপত্র নয়, তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি...।

আমার মনে পড়ে, বহুল কাটতির এক পত্রিকার কার্টুনিস্ট দেশনেত্রীকে কেমন করে আঁকেন আর জননেত্রীকে কিভাবে রেখায় রেখায় বাঙময় করেন। সোজা কথা, সংবাদ নামের গল্পপ্রবাহ কিভাবে সাজানো হবে তার পেছনে কাজ করে শাসকের সাথে আমার কী সম্পর্ক, আমার লাভালাভ কী অথবা আমিই বা কিভাবে দেখি ঘটনাকে। উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা জ্যোতিবসু অবসর গ্রহণের দিন সাংবাদিকদের বিদায়ী সম্ভাষণে বলছিলেন, তথ্যের কৌমার্যচ্যুতিতে মুদ্রণ মাধ্যমের কর্মীদের বিবেক জাগ্রত থাকা উচিত। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় এই মন্তব্যটুকু সামনে এনে বলছেন- জ্যোতি বাবু জানেন যে, লেনি রিফেনস্থাল তথ্য পরিবেশনের নামে ট্রায়াম্ফ অব দ্য উইল নামের যে নাৎসি প্রতিবেদনটি পেশ করেছিলেন, তা প্রকৃত প্রস্তাবে তথ্যের অধিকার হরণ করে। যেখানে জার্মান জাতিতত্ত্বের ভ্রান্তিকে এতদূর পুরোভাগে নিয়ে আসা হয় যে, হিটলারকে দেবরাজ জিউস ও স্বস্তিকা চিহ্নকে দেবতাদের কবচকুণ্ডল বলে মনে হতে থাকে।

এমন প্রতিবেদন তো আমরা দেখেছি সাদ্দামকে হটাতে বুশ-ব্লেয়ারের হয়ে এক শ্রেণীর পশ্চিমা গণমাধ্যম কি মিথ্যেটাই না প্রচার করেছে! সাদ্দামের কাছে নাকি স্তূপে স্তূপে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র মজুদ আছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা রিপোর্ট তা-ই। ব্রিটিশ সরকারের একজন বিজ্ঞানী যিনি ভেতরের খবর রাখতেন, বিবিসির এক সাংবাদিককে খানিকটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ওই গোয়েন্দা রিপোর্টে রঙ ছড়ানো হয়েছে। আর যায় কোথায়, ওই বিজ্ঞানীর ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করা হলো যে, তিনি শেষমেশ আত্মহত্যাই করে বসলেন। বিবিসির একজন কর্তা পদত্যাগ করলেন। কিন্তু সেই যুদ্ধের শেষে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া গেল না।

বাংলাদেশের মিডিয়ায় এখন আকছার মিথ্যাচার চলছে। খোদ সরকারও কিছু করছে। কে করবে প্রতিবাদ? কোন আদালত সরকারের বিরুদ্ধে মামলা নেবে? এক রাতে দেখলাম দুটি টিভি এবং দুটি ইংরেজি দৈনিকে খবর বেরোল, সৌদি আরবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মালিকানার বিশাল মার্কেট ভবন আছে। এসব নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশ তদন্ত করছে। খবরটির কোনো বিশ্বাসযোগ্য সূত্র ছিল না। সেজন্য বেশির ভাগ আওয়ামী মিডিয়াও এ ভুয়া প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। পরদিন বাছাই করা সম্পাদক ও রিপোর্টার নিয়ে সংবাদ সম্মেলন। বলা হলো- প্রতিবেদনটি পাঠানো হলেও সবাই দেখাল না কেন? অবাধ তথ্যপ্রবাহ, তথ্য অধিকার, মুক্তচিন্তা, ভিন্নমত পোষণের এবং বিস্তারের অধিকারের গোড়া হচ্ছে মানবাধিকার। মানবাধিকার বিষয়টি সর্বপ্রথম স্বীকৃতি পায় ফরাসি মনীষী দেনিস দিদেরার (১৭১৩-৮৪) কাছ থেকে।

ফরাসিদের আঠারো শতকের বিখ্যাত এনসাইক্লোপিডিয়াতে ন্যাচারাল রাইটস শীর্ষক নিবন্ধটির লেখক ছিলেন দিদেরা। ১৭৫৫ সালের ওই নিবন্ধে জেনারেল উইল বা সার্বজনীন অভিপ্রায়ের ধারণাটির মাধ্যমে তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানুষের কতকগুলো জন্মগত স্বাভাবিক অধিকার রয়েছে। অন্তরাল থেকে এসব অভিপ্রায়ই যেন আমাদের সামাজিক ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত নির্দেশ করে চলেছে সব সময়। দিদেরার সিদ্ধান্ত এ রকম- ০১. শুধু ব্যক্তি অভিপ্রায়ের দিকে মগ্ন ব্যক্তি মানবজাতির শত্রু; ০২. প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই সার্বজনীন অভিপ্রায় এমন এক মানদণ্ড, যার সাহায্যে অন্যের কাছে আমার প্রত্যাশা এবং আমার কাছে অন্যের প্রত্যাশা সহজে নির্ণয় করা যায়; ০৩. সার্বজনীন অভিপ্রায়কে মেনে চলাই সব সমাজের মূলভিত্তি এবং আইন সবার জন্য; কোনো একক ব্যক্তির জন্য নয়। অধিকার সংক্রান্ত চিন্তার বিবর্তনে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধও এক জরুরি পর্ব।

১৭৭৬ সালে টমাস জেফারসনের ঘোষণাটি ছিল এক স্পষ্ট উচ্চারণ। এতে বলা হয়- এই সত্য স্বতঃপ্রকাশ বলে আমরা গ্রহণ করি; সব মানুষই সৃষ্টিলগ্নে সমান এবং সৃষ্টিকর্তার হাত থেকেই তারা কিছু অপরিত্যাজ্য অধিকার অর্জন করেছে। এই সব অধিকারের মধ্যে আছে জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের সন্ধানের অধিকার। সৃষ্টিকর্তার হাত ধরে- এটাই হচ্ছে মূল কথা। মানুষের মধ্যে সার্বজনীন অভিপ্রায়ের উদ্ভব কিভাবে, তা আমরা খতিয়ে দেখি না, দেখতে চাই না, এই ভয়ে যে ইসলামের কথা বললে যদি মৌলবাদী রূপে চিহ্নিত হয়ে যাই!

অসীম করুণাময় ও পরম দয়ালু আমাদের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন শরিফের সূরা আস-সাজদার ৭, ৮ ও ৯ আয়াতে বলছেন, যিনি তাঁর সৃষ্টির প্রত্যেকটিকে সঠিকরূপে সৃষ্টি করেছেন এবং কাদামাটি থেকে মানুষ সৃষ্টির সূচনা করেছেন। এরপর তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে তার বংশ বানিয়েছেন। এরপর তিনি তাকে সুগঠিত করেছেন এবং তাতে ফুঁকে দিয়েছেন তার রূহ থেকে এবং তোমাদের জন্য বানিয়েছেন কান, চোখ ও অন্তর। তোমরা সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।

আল্লাহ প্রতিটি মানবদেহে জন্মপ্রক্রিয়ার সময় তার রূহ থেকে ফুঁ দিয়ে দেন। এর অর্থ মানবদেহে আত্মা সঞ্চারিত করেন। উল্লিখিত আয়াতসমূহে আল্লাহ তায়ালা রূহকে নিজের সাথে যুক্ত করে বলেছেন, যাতে সমগ্র সৃষ্ট জীবের মধ্যে মানবাত্মার শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে ওঠে। মানবাত্মা ছাড়া আর কোনো সৃষ্টিতে আল্লাহ তার রূহ থেকে ফুঁকে দেন না। একমাত্র মানবাত্মার মধ্যেই আল্লাহর নূর গ্রহণ করার যোগ্যতা রয়েছে। এ জন্য মানুষ সৃষ্টির সেরা। এরই অপর নাম সার্বজনীন অভিপ্রায়, যা সৃষ্টিকর্তা সরাসরি ফুঁকের মাধ্যমে আমরা লাভ করেছি। ইসলাম এ দুনিয়ায় এনেছে শ্রেষ্ঠতম সভ্যতা, যা মানব সমাজকে প্রকৃত মুক্তি দিয়েছে। ইসলাম মানেই শান্তি। ইসলাম দাসপ্রথা বিলোপ এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।

মানবাধিকার, নারী অধিকার নিশ্চিত করেছে। সার্বজনীন অভিপ্রায়ের যে কথায় বলা হয়েছে অপরের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধের কথা, সেটি ইসলামই অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেছে। একে অপরের হক আদায় করা, অর্থাৎ আপনার প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে আপনি নিজে খেতে পারেন না, দান-সদকা ও জাকাত দিয়ে গরিবদের সাহায্য করা বাধ্যতামূলক। বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম সভ্যতার পূর্ণাঙ্গ বিধান পবিত্র কুরআন শরিফের সূরা বাকারার ৪২ আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ো না আর জেনেশুনে সত্য গোপন করো না। সভ্যতার জন্য, মানবসমাজের জন্য এবং সাংবাদিকতার জন্য এর চেয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ আর কী হতে পারে?

প্রায় ১৫ শ বছর আগে নাজিল হওয়া কুরআন শরিফের সূরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- হে বিশ্বাসীগণ! যদি কোনো ফাসেক (সমাজে যারা ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে) তোমাদের কাছে কোনো খবর আনে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজান্তে তোমরা কোনো সম্প্রদায়কে আঘাত না করে বসো এবং পরে তোমাদের কাজের জন্য তোমরা লজ্জা না পাও।

লেখক : ইকোনমিক টাইমসের সম্পাদক, বিএফইউজে এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি




 আরও খবর