www.muktobak.com

সাংবাদিকের সাহস!: রোহিঙ্গা নিধন পুলিৎজার বিজয়ী প্রতিবেদন


 এম এ মোমেন, বণিকবার্তা    ২৪ মে ২০১৯, শুক্রবার, ১:০৯    আন্তর্জাতিক


ওয়া লোন ও কিয়াও সে উ—দুজনই মিয়ানমারে রয়টার্সের সংবাদদাতা। মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে এবং জাতিগতভাবে বিলুপ্ত করার যে প্রক্রিয়া মিয়ানমার সরকার এখনো অব্যাহত রেখেছে, তারই এক খণ্ডাংশের প্রতিবেদন প্রকাশের অপরাধে দুজন সাত বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ওদিকে তাদের সত্যনিষ্ঠ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বছরের অন্যতম সেরা হিসেবে ২০১৯ সালের পুলিৎজার পুরস্কার পায়। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা (অং সান সু চির সরকার মনে করে, বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই, তাকে বলা হয় জেনারেল’স লেডি। তাকে সরকারে এনে সরকারের বেসামরিক চরিত্র দেখানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি মূলত সামরিক কর্তাব্যক্তিদের হুকুম তামিল করে চলেছেন) আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে সম্প্রতি দুই সাংবাদিককে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের ভার বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। মিয়ানমার বাংলাদেশের চেয়ে পাঁচ গুণ বড় কিন্তু জনসংখ্যা মাত্র ৪০ শতাংশ। দুই দেশের মধ্যে ২৭২ কিলোমিটার সীমান্ত, ৬৩ কিলেমিটার সমুদ্রসীমানা। সৌভ্রাতৃত্বের অঙ্গীকার থাকলেও সীমান্তে নিয়মিত সৈন্য ও নাসাকা বাহিনীর সমাবেশ, সীমান্তে মাইন পোঁতা, টাওয়ার নির্মাণের ঘোষণা, এ দেশের জেলে আটক, সীমান্তে গুলি, নাসাকার মদদে বাংলাদেশে মাদক ও ইয়াবার চোরাচালান—এগুলো বহুদিন ধরেই চলে আসছে। রোহিঙ্গা নিয়ে যে অমানবিক কাণ্ড সেখানে চলছে এবং এর ভার বাংলাদেশ যেভাবে বহন করছে, দুই-ই তুলনাহীন।

বাংলাদেশে অবস্থানকারী রেহিঙ্গারা সু চির মুক্তির জন্য হরতাল করেছে কিন্তু তারা অনুধাবন করেনি যে, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী কথিত মানবাধিকার নেত্রী নিজেও জেনারেলদের মতো মুসলমান রোহিঙ্গাবিদ্বেষী।

ইন ডিনমিয়ানমার

একসঙ্গে দড়িতে বাঁধা ১০ জন রোহিঙ্গা মুসলমান বন্দি দেখছে যে চোখের সামনে তাদের বৌদ্ধ প্রতিবেশীরা একটি অগভীর কবর খুঁড়ছে। কিছুক্ষণ পরই ২ সেপ্টেম্বর সকালবেলায় ১০ জনের সবাই মৃত পড়ে রইল। তাদের মধ্যে অন্তত দুজন গ্রামবাসীর পিটুনিতে নিহত, বাকিদের গুলি করে মেরেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। যারা কবর খুঁড়ছিলেন, তাদের দুজন এ কথা জানিয়েছেন।

ইন ডিনের রাখাইন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ৫৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক সো চে কবর খুঁড়তে সাহায্য করেছেন এবং তাদের হত্যা করতে দেখেছেন। ‘সৈন্যরা প্রত্যেককে দুই থেকে তিনবার গুলি করেছে। যখন তাদের কবর দেয়া হচ্ছিল, তখনো জীবিত এমন কয়েকজন শব্দ করছিল। বাকিরা ততক্ষণে মৃত।’

মিয়ানমারের পশ্চিমাংশে উত্তর রাখাইন প্রদেশে জাতিগত সহিংসতার রক্তাক্ত অধ্যায়টি রচিত হয়েছে ইন ডিনের উপকূলীয় একটি গ্রামে। ২০১৭-এর আগস্ট থেকে আনুমানিক ৬ লাখ ৯০ হাজার রোহিঙ্গা নিজেদের গ্রাম থেকে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে গেছে। অক্টোবর নাগাদ ইন ডিনের রোহিঙ্গার একজনও সেখানে ছিল না।

রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর দেশ মিয়ানমারে তাদের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব একেবারে মুছে ফেলার জন্য অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ বলেছে, সেনাবাহিনী সেখানে গণহত্যা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এটা জাতিগত বিনাশ। মিয়ানমার বলছে, রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের আক্রমণের জবাবে এটি হচ্ছে বৈধ পরিচ্ছন্নতা অভিযান। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের আবাস শত শত বছর ধরে কিন্তু অধিকাংশ বার্মিজ মনে করে, তারা বাংলাদেশ থেকে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত অভিবাসী। সেখানকার সেনাবাহিনী তাদের বলে ‘বাঙালি’। সাম্প্রতিক সময়ে জাতিগত উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় মিয়ানমার সরকার এক লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে একটি ক্যাম্পে আটকে রাখে; সেখানে খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষায় তাদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত।

ইন ডিনে আসলে কী হয়েছে, কেন এ ১০টি হত্যাকাণ্ড—যাদের দুজন বয়ঃসন্ধির বালক—রয়টার্স টুকরো টুকরো ঘটনাকে জোড়া দিয়েছে। রয়টার্সের রিপোর্টার দুজন বার্মিজ নাগরিক ওয়া লোন ও কিয়াও সে উ প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং তা রয়টার্স প্রকাশ করে। রাখাইনসংক্রান্ত গোপনীয় দলিল হস্তগত করার অপরাধে ১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ দুজন গ্রেফতার হন।

ইন ডিনে হত্যাকাণ্ড

মাইয়ু পর্বতমালা আর বঙ্গোপসাগরের মাঝামাঝি রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিটওয়ের ৫০ কিলোমিটার উত্তরে ইন ডিন। এখানে একটি স্কুল, একটি ক্লিনিক এবং একটি বৌদ্ধদের ধর্মাশ্রম ঘিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রাম্য কুটিরে রোহিঙ্গা বসতি। গ্রামের দক্ষিণ দিকটায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কুটির। মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যে অনেকদিন ধরেই উত্তেজনা; প্রায় সাত হাজার অধিবাসীর ৯০ শতাংশই মুসলমান। উত্তেজনা থাকলেও উপকূলে মাছ ধরে এবং ধান চাষ করে দুটি সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে জীবনযাপন করে আসছে।

২০১৬-এর অক্টোবরে রোহিঙ্গা জঙ্গিরা উত্তর রাখাইনে তিনটি পুলিশ পোস্ট আক্রমণ করে—নতুন এক বিদ্রোহের সূচনা। এ আক্রমণের পর ইন ডিনের বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের তাদের খামারে কিংবা বাড়ির অন্য কোনো কাজে নিয়োজিত করা বন্ধ করে দেয়। অবশ্য বৌদ্ধরা বলছে, কাজের জন্য রেহিঙ্গারাই আর আসেনি।

গত বছর ২৫ আগস্ট আবার আক্রমণ চালায়—৩০টি পুলিশ পোস্ট এবং একটি আর্মি বেইজে। এখান থেকে নিকটতম আক্রমণটি ঘটে চার কিলোমিটার উত্তরে। ইন ডিনে আতঙ্কিত বৌদ্ধরা অনেকেই গ্রামের কেন্দ্রে ধর্মশালায় আশ্রয় নেয়। বৌদ্ধ রাত-পাহারাদার ম্যান থিয়েন (৩৬ বছর) বললেন, বৌদ্ধ গ্রামবাসীরা ধরে নিয়েছে যে তাদের মুসলমান প্রতিবেশীরা গ্রামটিকে গিলে ফেলেছে। একজন বুড়ো বৌদ্ধ বললেন, শিশুসহ সব রোহিঙ্গাই বিদ্রোহী এবং সন্ত্রাসী।

নয়জন বৌদ্ধ গ্রামবাসী জানান, ২৭ আগস্ট মিয়ানমার ৩৩ লাইট ইনফেন্ট্রি ডিভিশনের ৮০ জন সৈন্যের একটি দল ইন ডিনে পৌঁছে। দুজন প্যারামিলিটারি পুলিশ অফিসার এবং অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক সো চাই জানান, সৈন্যরা এ ডিভিশনের ১১ ইনফেন্ট্রি রেজিমেন্টের। সৈন্যদের দলনেতা গ্রামবাসীকে সৈন্যদের জন্য খাবার রান্না করার এবং রাতে পাহারা দেয়ার নির্দেশ দেন। সো চাই জানান, সৈন্যদের নেতা বৌদ্ধদের প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি রোহিঙ্গা মুসলমানদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবেন।

পাঁচজন বৌদ্ধ গ্রামবাসী জানান, দলনেতা তাদের অপারেশনে ভলান্টিয়ার হিসেবে যোগ দিতে আহ্বান জানান। তবে যারা কম বয়সী, তাদের ভলান্টিয়ার হিসেবে যোগ দেয়ার আগে মা-বাবার অনুমতি নিতে বলা হয়।

সেনাবাহিনী ইন ডিনের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের সিকিউরিটি গ্রুপে যোগ দেয়ার মতো আগ্রহীদের পেয়ে গেল। ২০১২ সালে তিনজন রোহিঙ্গা একজন বৌদ্ধ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করলে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তার পর থেকে মুসলমানবিরোধী অনানুষ্ঠানিক মিলিশিয়া দল গঠিত হতে থাকে। সে সময় মিয়ানমার বেতার জানায়, জেলা আদালত ওই তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এলাকায় ইন ডিন নিরাপত্তা দল বৌদ্ধদের প্রহরায় নিয়োজিত থাকে—এ দলে যোগ দেন দমকল বাহিনীর শিক্ষক-ছাত্র ও বেকার যুবক। ইন ডিনের বৌদ্ধ গ্রাম প্রশাসক মং থিম চে বলেন, এ দল সেনাবাহিনীর জন্য খুব উপকারী। কারণ স্থানীয় ভৌগোলিক অবস্থা তাদের ভালো জানা।

প্রত্যেক দলে ৮০ থেকে ১০০ জন, তাদের হাতে লম্বা দা ও লাঠি। একজন সদস্য জানিয়েছেন, তাদের কারো কারো কাছে বন্দুকও আছে। ক্যামোফ্লেজ করার সবুজ সেনা পোশাক তাদের, তারা বলে মিলিশিয়া স্যুট। এমনকি কয়েকজন বৌদ্ধও বলেছে, ৩৩ লাইট ইনফেন্ট্রির আগমনের পর সৈন্য, পুলিশ ও বৌদ্ধ গ্রামবাসীরা ইন ডিনের অধিকাংশ মুসলমানের বাড়ি পুড়িয়ে ফেলেছে।

অষ্টম সিকিউরিটি পুলিশ ব্যাটালিয়নের দুজন প্যারামিলিটারি সদস্য জানান, তাদের ব্যাটালিয়ন ৩৩ লাইট ইনফেন্ট্রির সৈন্যদের নিয়ে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর অবরোধ করে; তাদের ওপর মৌখিক আদেশ ছিল—‘যাও এবং সাফ করে ফেলো’। তার মানে ‘যেখানে রোহিঙ্গা বাস করে, সেখানেই আগুন ধরিয়ে শেষ করে দাও।’

দ্বিতীয় একজন পুলিশ কর্মকর্তা ইন ডিনের উত্তরে অনেক গ্রাম অবরোধে অংশগ্রহণ করার কথা জানান। প্রতিটি অবরোধে ২০ জন সৈন্য, পাঁচ থেকে সাতজন পুলিশ থাকত। একজন মিলিটারি ক্যাপ্টেন বা মেজর সৈন্যদের নেতৃত্ব দিতেন, পুলিশ ক্যাপ্টেন পুলিশ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্য ছিল পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন ঠেকানো।

সৈন্যদের দলনেতা বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা যদি থাকার জায়গা পায়, যদি খাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে আরো আক্রমণ করবে। কাজেই নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের বাড়িঘর সব জ্বালিয়ে দাও।’

দ্বিতীয় একজন পুলিশ অফিসার ও ইন ডিনের বৌদ্ধ প্রশাসক জানালেন, সৈন্য, প্যারামিলিটারি সদস্য এবং পুলিশ গ্রামবাসীকে ধোঁকা দেয়ার জন্য শার্ট ও হাফ প্যান্ট পরেছে। পুলিশ অফিসার মনে করেন, (ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় অপারেশন) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ‘আমাদের খুব বড় সমস্যা হতে পারে।’

পুলিশের মুখপাত্র কর্নেল মিউ থু সো বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গ্রামে আগুন দিয়েছেন কিংবা তারা বেসামরিক পোশাক পরেছেন, এমন ঘটনা তার জানা নেই। এমনকি ‘যাও এবং সাফ করে দাও’ কিংবা ‘গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে দাও’—এ ধরনের আদেশের কথাও তার জানা নেই। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘এসব অসম্ভব ব্যাপার।’ যদি এ রকম কিছু ঘটে থাকে, তাহলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানালে দাপ্তরিকভাবে তার তদন্ত হবে।

তিনি রয়টার্সের সাংবাদিককে বলেন, “আপনি যখন বলেছেন, আমরা পরীক্ষা করব। তবে নিরাপত্তার কাজে দায়িত্ব পালনকারীকে ‘স্টেপ বাই স্টেপ’ ব্যবস্থাপনা, অনুসরণ করতে হয়। আপনি যা বলছেন, সে রকম কিছুই হয়নি বলে আমি মনে করি।”

সেনাবাহিনী রয়টার্সের প্রশ্নে কোনো সাড়া দেয়নি।

ইন ডিন ভিলেজ ক্লিনিকের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট অং মিয়াত তুন (২০) জানান, তিনি অনেক অবরোধে অংশগ্রহণ করেছেন। ‘মুসলমানদের বাড়িঘর পোড়ানো খুব সহজ কাজ। কারণ ঘরের উপরে খড়ের চাল, এক কোণে আগুন লাগিয়ে দিলেই হলো। বৌদ্ধ ভান্তেদের পোশাকের অংশ কেরোসিনে চুবিয়ে লাঠির আগায় লাগিয়ে দেশলাইয়ের আগুন ছুড়ে মারলেই হলো। অপারেশনের সময় আমাদের ফোন আনা নিষেধ ছিল। পুলিশ বলেছে, যদি আমাদের কাউকে এসবের ছবি তুলতে দেখা যায়, তাহলে গুলি করে হত্যা করা হবে।’

নিরাপত্তা গ্রুপের অন্যতম সদস্য রাত পাহারাদার সান থিয়েন জানান, প্রথমে সেনাবাহিনী মুসলমানদের বাড়িঘরের ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চালাত, তারপর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী গ্রামবাসীকে অগ্নিসংযোগ করার জন্য পাঠাত।

‘কালাররা (বার্মিজরা দক্ষিণ এশীয় অন্যান্য দেশের লোকদের ঘৃণাব্যঞ্জক ‘কালার’ বলে থাকে) দোকান ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় বাজার থেকে বিনে পয়সায় কেরোসিন পেতে আমাদের সমস্যা হতো না।’

এক বৌদ্ধ তরুণ বলেছেন, যখন একটি রোহিঙ্গা গৃহে আগুন জ্বলছিল, তিনি ভেতরে শিশুর কান্নার শব্দ শুনেছেন। আরো একজন গ্রামবাসী ঘরে লোকজন থাকা অবস্থায় সে ঘরে আগুন দেয়ার কথা রয়টার্সের কাছে স্বীকার করেছেন।

অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক সো চে ১০ জন রোহিঙ্গা পুরুষের জন্য কবর খনন করেন এবং নিজের হাতে একটি খুন করেন বলে জানান। তিনি রয়টার্সকে বলেন, সৈন্যরা ২৮ আগস্ট ইন ডিনে একটি খড়ের গাদার পেছনে তিনজন রোহিঙ্গা পুরুষ ও একজন নারীকে খুঁজে পায়। পুরুষদের একজনের কাছে একটি স্মার্টফোন ছিল, যা হত্যাকাণ্ডের ছবি তুলতে ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে।

সৈন্যরা সো চেকে বলেছে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে তোমার যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। আমি ফোনঅলা লোকটার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করি এবং বলি—দাঁড়াও। তারপর আমি তাকে বড় ছুরি দিয়ে কোপাতে থাকি। লোকটি মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর একজন সৈন্য তাকে গুলি করে।

উত্তর রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এ ধরনের সহিংসতা চলেছে বলে বহু বৌদ্ধ ও রাখাইন জানিয়েছে।

জাতিসংঘের ইউএন অপারেশনাল স্যাটেলাইট অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামে গৃহীত ছবি থেকে টানা ১১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রাখাইন অধ্যুষিত এলাকায় আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায়। নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত চিত্র বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, ২৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী তিন মাসে ৩৫০টিরও অধিক রোহিঙ্গা গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হয়েছে।

ইন ডিন থেকে ৬৫ কিলোমিটার উত্তরে লংডন নামের গ্রামে থার এনজি (৩৮) বলেন, পুলিশ ও স্থানীয় কর্মকর্তারা তাকে বুড্ডিস্ট সিকিউরিটি গ্রুপে যোগ দিতে বলেছে। হপত্ততিকং নামের কালারদের একটি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার জন্য সেনাবাহিনী আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এ অপারেশনে সৈন্য ও পুলিশসহ ২০ জন এবং চারজন গ্রামবাসী অংশ নিয়েছে। পুলিশ প্রথমে গ্রামের ভেতর গুলি চালিয়েছে, যাতে আতঙ্কিত হয়ে সবাই পালিয়ে যায়। তারপর আমরা ঘরে আগুন দিয়েছি। গ্রামটি পোড়ানো হয়েছে, কারণ পুলিশ মনে করত এ গ্রামের বাসিন্দারা জঙ্গি রোহিঙ্গাদের সমর্থন করে—কাজেই আগুনে ভস্মীভূত করে গ্রাম পরিষ্কার করা দরকার হয়ে পড়েছে।

লংডনের ১৫ কিলোমিটার উত্তরে তা মান থা গ্রামের বৌদ্ধ ছাত্র রোহিঙ্গাদের ঘরে আগুন লাগানোর কাজে নিজের অংশগ্রহণের কথা অপকটে বলেন। সেখানকার ‘কালারদের’ বাড়িঘর পোড়ানোর জন্য একজন আর্মি অফিসার ৩০ জন ভলান্টিয়ার চেয়েছেন। কিন্তু প্রায় ৫০ জন এসে এ কাজে যোগ দেয়। তারা বাজার ও মোটরবাইক থেকে তেল এনে আগুন লাগায়।

ছাত্রটি বলেন, আমাদের কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়। আমাদের সরাসরি গ্রামে ঢুকতে দেয়া হয়নি। প্রথম আমরা গ্রাম ঘেরাও করেছি। আমাদের আগে থেকে সেনাবাহিনী গুলি চালাত, পরে আমাদের ঢোকার নির্দেশ দিত।

রোহিঙ্গারা ইন ডিন গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেলে বৌদ্ধ প্রতিবেশীরা তাদের সম্পদ, মুরগি, ছাগল—সব নিয়ে যায় বলে তারাই রয়টার্সকে জানায়। কিন্তু তারা বলে, সবচেয়ে মূল্যবান দ্রব্য যেমন মোটরসাইকেল, গরু নিয়ে নিয়েছেন অষ্টম সিকিউরিটি পুলিশের সদস্যরা। তারা এসব বিক্রি করে দিয়েছেন। পুলিশ অফিসার এবং ইন ডিনের বৌদ্ধ প্রশাসকই এ কথা জানান। প্রশাসক মং থিন চে বলেন, অষ্টম ব্যাটালিয়নের কমান্ডার থান্ট জিন ও রাখাইন স্টেটের অন্য অংশের বৌদ্ধ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি করে নিয়েছিলেন, তারা লুট করা জিনিস কিনে নেয়। পুলিশ অফিসার চারটা গরু চুরি করেছেন বলে রয়টার্সকে জানান। কিন্তু তা নিজের জন্য নয়, সেনা কমান্ডার থান্ট জিন উর জন্য। এ ব্যাপারে কমান্ডার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পুলিশের মুখপাত্র মিউ থু সো বলেন, লুটপাটের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে।

১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শত শত রোহিঙ্গা নিকটবর্তী সৈকতে অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে নেয়, তারা ভারি বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে মাথার ওপর ত্রিপল দেয়ার ব্যবস্থা করে।

ইন ডিনের ১০ জন পুরুষকে পরদিন সকালে হত্যা করে। ইন ডিনের বৌদ্ধ সম্প্রদায়, নিহতদের আত্মীয় ও বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে যাদের পাওয়া গেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে রয়টার্স ১০ জনের সবাইকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

তাদের পাঁচজন পুরুষ—দিল মোহাম্মদ (৩৫), নূর মোহাম্মদ (২৯), শওকত উল্লাহ (৩৫), হাবিজু (৪০) এবং সাকের আহমেদ (৪৫) সবাই জেলে বা মাছ বিক্রেতা। এ দলের সবচেয়ে ধনী আবুল হাশিম (২৫) জাল এবং জেলে ও কৃষকদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বেচার দোকান চালাতেন। আট সন্তানের জনক ৪৫ বছর বয়সী আব্দুল মজিদের পান-সুপারির একটি ছোট দোকান ছিল। আবুল (১৭) এবং রশিদ আহমদ (১৮) হাই স্কুলের ছাত্র। আব্দুল মালিক (৩০) ছিলেন ধর্ম শিক্ষক।

১০ জানুয়ারি সেনাবাহিনী এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে যে বিবৃতি দেয়, নিরাপত্তা বাহিনী উপকূল এলাকায় দায়িত্বপালনের জন্য হাজির হলে প্রায় ২০০ বাঙালি লাঠি ও তরবারি নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনী যখন আকাশের দিকে গুলি ছোড়ে, বাঙালিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ তাদের ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলে, ইসলাম ধর্মীয় হুজুর আব্দুল মালিক তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি যায়। উদ্দেশ্য, তাঁবুর জন্য বাঁশ সংগ্রহ করা এবং কিছু খাবারের বন্দোবস্ত করা। অন্তত সাতজন সৈন্য এবং গ্রামবাসীর আক্রমণে তার মাথা থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, সশস্ত্র ব্যক্তিদের একজন ছুরি দিয়ে তার মাথায় কোপ মারে। প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা পুরুষের মাঝখান থেকে নূর মোহাম্মদকে তুলে নিয়ে যায়; তার স্ত্রী রেহানাকে বলে, সমুদ্রসৈকতে চলে যাও। সৈন্যরা নূর মোহাম্মদসহ ১০ জনকে ইন ডিন স্কুলে রাতের বেলা আটকে রাখে। সন্ধ্যায় তাদের গরুর মাংস ও ভাত খাওয়ানো হয় এবং পুরনো পোশাক খুলে নতুন পোশাক পরানো হয়।

মংনি নামের একজন বৌদ্ধ কৃষক কিছুদিন আগে নিরুদ্দিষ্ট হয়। রয়টার্স টিম তার কোনো হদিস করতে পারেনি। কিন্তু এই নিরুদ্দিষ্ট হওয়ার প্রতিশোধ নিতে সেনাবাহিনীর অফিসার মং নির দুই ছেলেকে ডেকে আনেন।

১০ জনের গোরখোদক সো চে জানান, মংনির প্রথম ছেলে এসে ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষক আব্দুল মালিকের মাথা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। দ্বিতীয় ছেলে এসে অন্য একজনের ঘাড়ে কোপ বসায়, তারপর সৈন্যরা গুলি করে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করে। ওদিকে ১০ জানুয়ারি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে বলে, ইন ডিনের দুই ভাই এবং অন্য একজন বাঙালি সন্ত্রাসীদের জবাই করেছে।

রয়টার্স টিম বাংলাদেশে নিহতদের পরিবারবর্গের সঙ্গে যোগাযোগের আগে তারাও জানতে পারেনি যে, তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যটির ভাগ্যে কী হয়েছে।

নিহত নূর মোহাম্মদের স্ত্রী বলেছেন, ‘আমার স্বামী চিরদিনের জন্য চলে গেছে। আমি আর কিছু চাই না, শুধু বিচার চাই।’

***

মিয়ানমার পুলিশের ক্যাপ্টেন ইয়ান মো নাইং আদালতে বলেছিলেন, রয়টার্সের দুজন সাংবাদিককে ফাঁসাতে সিনিয়র পুলিশদের মামলা সাজাতে দেখেছেন। সরকারি আইনের অমর্যাদা করার জন্য এ ক্যাপ্টেনের এক বছর কারাদণ্ড হয়। অন্যদিকে রোহিঙ্গা মুসলমান নিধনের প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে রয়টার্সের দুজন সাংবাদিক ওয়া লোন ও কিয়াও সে উ মিয়ানমারের উপনিবেশ যুগের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘনের দায়ে সাত বছরের কারাদণ্ড হয়। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়া ক্যাপ্টেন প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি ওই দুজন সাংবাদিকের জন্য দুঃখবোধ করছেন। তিনি পুলিশের ডিসিপ্লিনারি অ্যাক্ট সংশোধনেরও দাবি জানান।

দুজন সাংবাদিকের কারাবরণের বর্ষপূর্তিতে রয়টার্স আবার সংবাদ করে—নরহত্যার খবর ফাঁস করায় কারাগারে। দুজন সাংবাদিক তাদের সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে তাও খারিজ হয়ে যায়।

রয়টার্স-প্রধান বলেন, স্বৈরাচারী ক্ষমতাসীনরা সত্যকে স্তব্ধ করে দিতে চায়, এটা তারই অংশ।

টাইম ম্যাগাজিন লিখেছিল, ১০ মুসলমান রোহিঙ্গার মৃত্যুর কাহিনীর দলিলীকৃত করার অপরাধে দুই সাংবাদিকের সাত বছর কারাদণ্ড।

এ দুজনকে করা হলো টাইম ম্যাগাজিনের ২০১৯ সালের ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’।

শেষ পর্যন্ত ৫১২ দিন কারাবাসের পর আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার সরকার রয়টার্সের সাংবাদিক ওয়া লোন ও কিয়াও সে উকে ৭ মে ২০১৯ মুক্তি দেয়।

(রোহিঙ্গা নিধন : পুলিৎজার বিজয়ী প্রতিবেদন নিবন্ধটি ২৪ মে বণিকবার্তার শুক্রবারের সাময়িক সিল্করুটে প্রকাশিত। - মুক্তবাক)




 আরও খবর