www.muktobak.com

‘আমাকে একুশে টেলিভিশন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল’


 বাধন ডট নেট    ২৫ জুন ২০১৯, মঙ্গলবার, ৯:৩৩    সাক্ষাৎকার


হারুন উর রশীদ জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের ঢাকা প্রতিনিধি। একইসঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে। অপরাধ বিষয়ক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। একুশে টেলিভিশনের পরিকল্পনা সম্পাদক থাকাকালে ‘একুশের চোখ’ নামের সংবাদবিষয়ক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে সাংবাদিকতায় হারুন উর রশীদের অনন্যতার জায়গা হলো তার কমিউনিটি ফিলিং, সততা ও সাহস। আমাদের আলাপচারিতার ফোকাসও সেখানেই।‘সংবাদকর্মীর দিনলিপি’র সঙ্গে হারুন উর রশীদ-এর আলাপচারিতায় তার কর্মজীবনের গল্পও এসেছে। সংবাদকর্মী হিসেবে তিনি যেমন নিজের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, তেমনি নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন। একুশে টেলিভিশনে থাকাকালে কুচক্রীরা কীভাবে তাকে প্রতিষ্ঠান ছাড়তে বাধ্য করেছিল, বাদ যায়নি সেই প্রসঙ্গও। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাধন অধিকারী। 

সততা আর সাহস ছাড়া কি সত্যিকার সাংবাদিক হওয়া যায়?

হারুন উর রশীদ: প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সততা ও সাহসকে  সাংবাদিকতার প্রধান দুই উপাদান বলে আমি মনে করি। একজন সাংবাদিককে যেমন সাহসী হতে হয় তেমনি  সৎ হতে হয় সাংবাদিকতার স্বার্থেই। তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে সৎ হতে হয়। সাংবাদিকের তথ্য মানেই যথার্থ তথ্য। সুতরাং সততা না থাকলে যথার্থ তথ্য উপস্থাপন করা যায় না। আর সাহসিকতার প্রসঙ্গটি আসে যে আমার তথ্য সব সময় তো নিরীহ নয়। কখনও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, কখনও ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে, কখনও কখনও তা আবার ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যায়। তো সেই তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে যদি আমার সাহস না থাকে, যদি একজন সাংবাদিকের না থাকে তাহলে সেই তথ্য পরিবেশন তো কঠিন। সাংবাদিকতার মধ্যেই সততা থাকে। সুতরাং এটিকে সাংবাদিকতা থেকে আলাদা করারই কিছু নেই। প্রশ্ন তখন ওঠে যখন সাংবাদিকতার মধ্যে অসততা ঢুকে যায়। তো সাংবাদিকতা করতে হলে তাকে অবশ্যই সৎ এবং সাহসী দুটোই হতে হবে।

আপনার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্কের জায়গা থেকে আমি জানি, আপনি বড় বড় অর্থনৈতিক লোভকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এসেছেন বারবার। কখনও নিজের পেশাগত জায়গা থেকে বিচ্যুত হননি, আপস করেননি। টাকার কাছে নতি স্বীকার করেননি। তবে আপনি নিজেও স্বীকার করবেন, গোটা সাংবাদিক কমিউনিটির বাস্তবতা একরকম নয়। কেন? সাংবাদিকরা লোভের কাছে কেন নতি স্বীকার করে?

হারুন উর রশীদ: আসলে লোভের কাছে মানুষ নতি স্বীকার করে। এখন তিনি যে পেশায়ই থাকুন না কেন তার যদি নৈতিক অবস্থান শক্ত না হয়, তিনি যদি সৎ না হন তাহলে তিনি এক পর্যায়ে লোভের কাছে নতি স্বীকার করবেন। যিনি ভয়ের কাছে নতি স্বীকার করেন, তিনি লোভের কাছেও নতি স্বীকার করেন। কিছু সামাজিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। আমার সিস্টেমই যদি সততা ও সাহসিকতাকে পুরস্কৃত করে, সাহসিকতাকে পুরস্কৃত করা হয়। সিস্টেমটাই যদি হয় সৎ মানুষ ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারে তাহলে এই সংখ্যাটি কমে আসবে। মানুষ আর লোভের কাছে, ভয়ের কাছে নতি স্বীকার করবে না। যে সাংবাদিক অর্থের কাছে, অবৈধ অর্থের কাছে নতি স্বীকার করেন, আমি মনে করি তিনি মানুষ হিসেবে এর কাছে নতি স্বীকারের জন্য প্রস্তুত হয়েই আছেন। তিনি আসলে ওই চরিত্রের লোক। এখানে সাংবাদিকতার কিছু আসে যায় না। আসলে তিনি এটাকেও তার অবৈধ মানি মেকিং মেশিনের উপাদানে পরিণত করতে চান।  সাংবাদিকতা নয় কেবল, অন্য পেশাও থাকলেও তিনি একই কাজ করতেন। সাংবাদিকতাকে বলা হয় চতুর্থ স্তম্ভ। সাংবাদিকরা সমাজের জঞ্জাল সরাবেন, অসততা, দুর্নীতি এসব দেখিয়ে দেবেন। এগুলো করতে গিয়ে তিনি যদি অসৎ হন তাহলে তিনি তো সাংবাদিকতার যোগ্যতাই হারিয়ে ফেললেন। আমার দুঃখ হয় যে অসৎ হয়ে তিনি সাংবাদিকতা করেন। আমি যদি নিজে অসৎ হই তাহলে অন্য কারও অসততা, দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার অধিকার আমার থাকে না। তার সাংবাদিকতা ছেড়ে চলে যাওয়াই ভালো।

সংবাদকর্মী হিসেবে আপনি বারবার ক্ষমতাশালীদের অস্বস্তির কারণ হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন এজেন্সির অন্যায্যতার বিরুদ্ধেও আপনি সত্য হাজির করেছেন বারবার। আপনি ভয় পান না? আপনার সাহসের উৎস কী?

হারুন উর রশীদ: আমি আমার প্রতি পেশার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চাই, জীবনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চাই। আমি মানুষ হিসেবে আমার নিজের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চাই। মানুষ তো জন্মায় এবং ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে ওঠে। তো মানুষ কারা? যারা সৎ, দায়বদ্ধ, সত্য ও সুন্দরের প্রতীক তারাই মানুষ। মেরুদণ্ডহীন হয়ে বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না। যদি আমার সত্য কথাটা নাই বলতে পারলাম, সত্যটা যদি সঠিকভাবে উপস্থাপন নাই করতে পারলাম তাহলে তো আমি আসলে মেরুদণ্ডহীন। মেরুদণ্ডহীন হয়ে তো বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকা ভালো। আমি মনে করি না যে, আমি ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বলি। যা সত্য, আমি সেটাই বলি। তাতে কেউ বিরক্ত হতে পারে, সে কথা কারও বিরুদ্ধে যেতে পারে বা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমার টার্গেট কিন্তু ক্ষতি করা না। আমি এই অন্যায়গুলো চাই না। অন্যায়কে প্রতিরোধ করতে চাই। আমি মনে করি আমাদের আদর্শ অনুযায়ী সবকিছু জনগণের। জনগণের জন্য যা ক্ষতিকর তাতো আমাকে বলতেই হবে। রাষ্ট্রীয় অর্থ এটা তো সাধারণ মানুষের অর্থ, রাষ্ট্রের যে কর্মকর্তা তিনি তো সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের পয়সায় চলেন। তার দুর্নীতি, সরকারি কর্মকর্তার দুর্নীতি বা অন্যায়-অনিয়ম এটা নাগরিক হিসেবে যেমন আমার বলার দায়িত্ব, সেরকম সাংবাদিক হিসেবে তো আরও বেশি বলার দায়িত্ব। এটা যদি আমরা না বলি এক সময় কিন্তু আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাবো। মূলত সবাই সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য, মানুষের নামকে সঠিকভাবে প্রতিপন্ন করার জন্য আমি সত্য প্রকাশে ভীত হই না।   

আপনার পেশাগত জীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা কোনটা? আমাদের সঙ্গে একটু শেয়ার করবেন?

হারুন উর রশীদ: স্মরণীয় অভিজ্ঞতা তো কয়েক রকম হয়েছে। দুঃখজনক স্মরণীয়, আবার ভালো অভিজ্ঞতা স্মরণীয়। একবার ঢাকা শহরে প্রচুর ছেলেমেয়ে চাকরির নামে টাকা দিয়ে চাকরি পাচ্ছে না। একটি সংস্থায় টাকা দিয়েও চাকরি পাচ্ছে না। আমি তখন একুশে টেলিভিশনে কাজ করি। এর মধ্যে একটি ছেলে ছিল খুবই গরিব। ওর নাম আমার এখনও মনে আছে, এখনও আমার কাছে আসে। সে এখন ঢাকায় একটি বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। ঈদ কোরবানিতে সে কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা করে যায়। ও একবার আমাকে জানালো তার প্রায় সাড়ে দশ হাজার টাকা মেরে দিয়েছিল। ছেলেটি খুবই গরিব। তার মা বোধহয় তাদের কয়েকটি ছাগল ছিল সেগুলো বিক্রি করে এই টাকাগুলি দিয়েছিল। তো তারপরে আমি অনুসন্ধানে নামি। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরে ফেলি। তখন মালিকপক্ষ প্রায় একশো ছেলেমেয়ের টাকা ফেরত দিয়েছিল। আমি পুলিশ ডেকে তাদের মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়ায় টাকাগুলো ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। তো মালিকপক্ষ ভেবেছিল এটা নিয়ে হয়তো আর রিপোর্টিং হবে না। তবে রিপোর্ট আমি করেছি। তারা যে অপকর্ম করেছিলেন, টাকা যে ফেরত দিলেন তা তো জানাতে হবে। তো সেই রিপোর্টিংয়ে যেটা হলো অনেকেই প্রতারকদের বিরুদ্ধে সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। এটা আমার অনেক ভালো অভিজ্ঞতা যে অনেক মানুষ উপকৃত হয়েছিলেন। তারা আমাকে এখনও মনে রেখেছেন। মানুষের জন্য কাজ করলে তারা আপনাকে ভুলবে না। শুধু তাই নয় তারা যদি এখনও কোনও অন্যায় অপকর্ম দেখেন তাহলে এখনও আমাকে ফোন দেন। যে হারুন ভাই এটা হয়েছে। এটা আমার সুখকর অভিজ্ঞতা।

দুঃখজনক অভিজ্ঞতাও আমার রয়েছে। একুশে টেলিভিশনে কাজ করতে গিয়ে আমি খুব চাপের মুখে পড়েছিলাম। ওখানে একটি গ্রুপ ছিল যারা ছোটবড় করাপশন করতো। আমি বলছি সেই একুশে টেলিভিশনের কথা, যখন আবদুস সালাম সাহেব এটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েই আমাদের এক সহকর্মীর করাপশনের বিরুদ্ধে একুশে টেলিভিশনেই একবার একটা প্রতিবেদন করেছিলাম আমরা। তখন সেই গ্রুপটি অনেক ষড়যন্ত্র তৈরি করলো। তখন তাদের সঙ্গে এক সাবেক সামরিক আমলাও যোগ দিয়েছিলেন। এবং তিনি নানাভাবে, নানা কৌশলে আমার বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলাও দায়ের করেছিলেন। এবং মামলা শুধু নয় আমাকে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যেতেও বাধ্য করতে চেয়েছিলেন। মালিকপক্ষ আমাকে ডেকে তাদের এসব ষড়যন্ত্রের কথা বললো আর জানালো যে সেই এতই প্রভাবশালী যে তারা আমাকে নানাভাবে ঝামেলায় ফেলতে পারে। আমি বললাম যে আমার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ তার একটিও প্রমাণ করুক। তখন মালিকপক্ষ বললো, আমি জানি তুমি সৎ মানুষ। তোমার বিরুদ্ধে কোনও কিছু প্রমাণ করা যাবে না। তুমি বরং কিছু দিন ছুটি নাও। আমি বললাম আপনাদের যেহেতু সেই অসৎ মানুষদের নিয়েই কন্টিনিউ করতে হবে সেহেতু আমি ছুটিই নিচ্ছি। ছুটি শেষে আমাকে ফিরে যাওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল। তবে আমি ফিরিনি। পরে দেখেছি যারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন তারা নানা ঝামেলায় জড়িয়েছেন। নানা বিপদে পড়েছেন। আমি জানি সততার জন্য আপনাকে পীড়ন নিতে হবে কিন্তু চূড়ান্তভাবে সততাই টিকে থাকবে।

সংবাদমাধ্যমে কাজের পরিসরটা সামষ্টিক। আপনি নিজেও বলে থাকেন, এটি একটি টিম ওয়ার্ক। আবার এখানে ব্যক্তিগতভাবে ভালো করার, অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার একটা ব্যাপারও রয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে মেলবন্ধন কী করে হবে? কী করে একজন সংবাদকর্মী একইসঙ্গে তার নিজের ক্যারিয়ার আর যৌথ কাজের জায়গাকে মেলাবেন?

হারুন উর রশীদ: বাংলাদেশের সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠানগুলো এক ধরনের অ্যাকাডেমিক শিক্ষা দেয়। মূলত ফিল্ড লেভেলে যে সাংবাদিকতা তা প্রাকটিক্যালি শিখতে হয়। তবে আমি মনে করি অ্যাকাডেমিকভাবে সাংবাদিকতার ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে তার জন্য ফিল্ড লেবেলের সাংবাদিকতা ধরতে সুবিধা হয়, যদি না তিনি কোনও মৌলবাদ দ্বারা আকৃষ্ট না হন। অনেকে আছেন যিনি মনে করেন আমি কী শিখেছি বইয়ের ভাষায় যেটা আছে সেটা নিয়ে কিভাবে যাবো। নানা কিছু। আসলে এগুলো উদারভাবে দেখতে হবে। তো আপনি বলছিলেন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কথা। প্রতিষ্ঠান তো নানা ধরনের হতে পারে। ভালো প্রতিষ্ঠান, খারাপ প্রতিষ্ঠান বা দুর্বল প্রতিষ্ঠান। এটি বোঝা যায় তার খবরের মান, কন্টেন্টের মান দেখে। আমি কন্টেন্ট বলছি কারণ এখন তো শুধু প্রিন্ট নয়, ইলেকট্রনিক, মাল্টিমিডিয়া নানা ধরনের সংবাদমাধ্যম রয়েছে। এটা বোঝা যায়। তো এই বোঝার জায়গা থেকে যারা এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন তারা যদি প্রতিষ্ঠানটিকে খেয়াল করেন, তার খবর, কন্টেন্ট খেয়াল করেন তাহলে তারা বুঝতে পারবেন নিজের খবরের মান কী হবে, কোয়ালিটি কী হবে, নীতিমালা কী হবে, প্রেজেন্টেশন কী হবে। এটা তারা বুঝতে পারেন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সেখানে থেকেই।

পেশা হিসেবে সাংবাদিকতার ভবিষ্যত কী, বাংলাদেশে?

হারুন উর রশীদ: সাংবাদিকতা নিয়ে আমাদের যেমন হতাশার একটি জায়গা তৈরি হয়েছে তেমনি আবার গর্ব করার মতো, এগিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়ও রয়েছে। নইলে বাংলাদেশে এতগুলো সংবাদমাধ্যম রয়েছে। এসব সংবাদমাধ্যম চালানোর মতো কমবেশি মানুষ তো রয়েছে। তো আমি যেটি বলতে চাচ্ছি সেটি হলো এখানে যোগ্য এবং অযোগ্য দুই ধরনের মানুষই রয়েছে। ফলে এই দুই ধরনের মানুষকেই এক পাল্লায় মাপা হচ্ছে। যেটি একটি সংকট তৈরি করছে। এবং অনেক সংবাদপত্র মালিক আছেন যারা টাকা থাকলেই একটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান খুলে ফেলে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। আর তাদের সঙ্গে যোগ দেয় কিছু ছাপোষা ও দালাল সাংবাদিক। তারা মালিকপক্ষের সাথে যোগ দিয়ে নানা ধরনের পদ পদবি আর সুযোগ সুবিধা বাগিয়ে নেয়। ফলে আমরা সাংবাদিকতার সত্যিকার যে স্বাদ তা পুরোপুরি পাচ্ছি না। আমি চাই সাংবাদিকদের জন্য সেন্ট্রালি একটা পরীক্ষা হবে। আর সেখান থেকেই বিভিন্ন মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে হবে। তখন তাকে যথাযথ বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এখন যেটি হয় অনেক সময় বাড়ির পিয়ন-গৃহকর্মীকেও অনেক সময় সাংবাদিক বানিয়ে ফেলেন। এই সুযোগটা বন্ধ করতে হবে। থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রি সাংবাদিকতার উর্বর ক্ষেত্র। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ভবিষ্যত নেই বলে আমি মনে করি না। তবে ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যম কেমন হবে তা নিয়ে আমার একটি ভাবনার জায়গা রয়েছে। আমি মনে করি একজন সাংবাদিক একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবেন। অনেকেই বলেন একজন সাংবাদিক আর একটা নিউজ পোর্টাল। আমি তো মনে করি এটাই হবে একসময়। একজন সাংবাদিক সপ্তাহে চার-পাঁচটা খবর প্রকাশ করবেন তাতেই তিনি জনপ্রিয় হবেন। তার ওই সংবাদই মানুষ পড়বেন বা দেখবেন। সারা দুনিয়াতেই ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা এখন অনেক জনপ্রিয়। ভবিষ্যতে হয়তো সোশ্যাল নেটওয়ার্কে একটি খবর প্রকাশ করলে আর ওই খবর মানুষ পড়লে নেটওয়ার্ক সাইটই তাকে টাকা দেবে। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান গুরুত্ব হারিয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি সাংবাদিক গুরুত্ব হারাবে না। একজন ব্যক্তি একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার, একটি সংবাদমাধ্যম হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আমি দেখছি।      

তরুণ সংবাদকর্মীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

হারুন উর রশীদ: পরামর্শ তো আর ওভাবে দেওয়া যাবে না। তরুণরাই তো শক্তি। তরুণ যারা সাংবাদিকতাতে আগ্রহী হচ্ছেন, তারা তো বুঝে শুনেই আগ্রহী হচ্ছেন। তো তরুণরাই তো পারবে। তরুণেরাই সবকিছু বদলে দেয়। এক সময়ে অনলাইন সাংবাদিকতাকে অনেকেই নাক সিঁটকাতো। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন অনলাইন সাংবাদিকতা বাংলাদেশে নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণরাই। এখন সবাই অনলাইন সাংবাদিকতার দিকেই ঝুঁকছে। তরুণেরা তো পড়াশোনা করেই আসবেন। তাদের কাছে আমার একটাই প্রত্যাশা থাকবে তারা যেন ভীতি, লোভের কাছে নতি স্বীকার না করেন। যেকথা আমি প্রথমেই বলেছি। আমি আবারও বলছি তরুণেরা যেন সাংবাদিকতাকে কেবল বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে চিন্তা না করেন। বিশ্বপরিসরে চিন্তা করতে হবে। ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে হবে। বাংলার পাশাপাশি আরও দুই একটা ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। মনে রাখতে হবে সাংবাদিকতায় পয়সা উপার্জন করতেই হবে। কেননা সাংবাদিককে খেতে হয়, সমাজে বাঁচতে হয়। সুতরাং অর্থ উপার্জন করতে না পারলে যে কেউই অসৎ হতে পারেন। লোভের কাছে নতি স্বীকার করতেই পারেন। আপনি হয়তো কম পয়সায় চলতে পারেন, কিন্তু আপনার স্ত্রী-সন্তান তা না চাইতেই পারেন। সুতরাং ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করুন। বাংলাদেশে বসেই বিশ্বজনীন সাংবাদিকতার সুযোগ এখন ঝলমল করছে।

‘আমাকে একুশে টেলিভিশন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল’ সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে বাধন ডট নেট হতে। - মুক্তবাক




 আরও খবর