www.muktobak.com

বাক স্বাধীনতার মনস্তত্ত্ব


 মো. শহিদুল ইসলাম    ৭ জুলাই ২০১৯, রবিবার, ৮:৫৫    মতামত


জনগণের কথার দাম বুঝাতে ফরাসী দার্শনিক রুশো বলেছে - “ভয়েস অব দ্য পিপল ইজ দ্যা ভয়েস অব গড”। সেই জনগণকে পবিত্র কুরআনে স্বয়ং স্রষ্টা (আল্লাহ) তার প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মানুষ এবং মানুষের কথার গুরুত্ব স্রষ্টা বুঝেন, দার্শনিকরা বুঝেন, কিন্তু এ দেশের সমাজ ব্যবস্থা রাষ্ট্র ব্যবস্থা তা বুঝে না।

জনগণের কথা বলার স্বাধীনতাকে ‘ফ্রিডম অব স্পিস’ বলা হয়। সরল বাংলায় এর অর্থ ‘বাক স্বাধীনতা’। বাংলাদেশের সংবিধানে ৩৯ নং ধারায় প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে। এদিক থেকে বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ফিডম অব থটস’, ‘ফ্রিডম অব স্পিস’, ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেসন’ ও ‘ফ্রিডম অব প্রেসে’র নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে কেন স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে সেই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলা হয়েছে -“বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিতকরণার্থে”। মানুষের যদি বাক-স্বাধীনতাই না থাকে তাহলে তার মানবিক মর্যাদা কোথায় থাকে?

সংবিধান অনুযায়ী আপনি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন, ভাব প্রকাশ করতে পারেন স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন। আপনার বিবেক বোধ বিবেচনায় কোনো কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ইচ্ছা করলে সেটাও আপনি করতে পারেন। আপনি কথা বলতে পারেন সরকারে বিরুদ্ধে। সরকারের যা ভালো মনে করছে আপনার কাছে তা নাও ভালো হতে পারে। আপনি আপনার অভিমত দিয়ে তা জানান দিতে পারেন। আবার সরকার অন্যায় করলে তার বিরোধীতা করতে পারেন। তাকে কাঠগঢ়ায় দাড় করাতে পারেন। তার বিরুদ্ধে সভাসমাবেশ, মিছিল মিটিং, লেখা-লেখি কিংবা বক্তৃতায় আপনার অবস্থান জানান দিতে পারেন। আবার সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করেও আপনি আপনার অবস্থান জানান দিতে পারেন। এটাই মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এটাই বাক স্বাধীনতা।


আপনি যা ভাবেন তা নিঃসকোচে, নির্ভয়ে নিদ্বিধায় বলতে পারেন। বলার পর আপনি কোন উৎকণ্ঠায় থাকবেন না। আপনার মধ্যে এই ভয় কাজ করবে না যে আপনাকে কোন বিশেষ বাহিনী তুলে নিয়ে যাবে কিংবা গুম করে ফেলবে। আপনি আপনার জীবনকে হুমকি মনে করবেন না।

কোনো টকশোতো গিয়ে কথা বলে আসার পর আপনাকে বিশেষ বাহিনীর ফোন থেকে এই কথা শুনতে হবে না ‘আপনি আর টকশোতে আসবেন না’। পত্রিকাগুলো নিজেদের রুটি রুজি টিকিয়ে রাখার জন্য ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ আরোপ করবে না। এইগুলো মত প্রকাশের স্বাধীনতার লক্ষণ। বাক স্বাধীনতার লক্ষণ।
একটি টেলিভিশনে সাক্ষাতকার দেয়ার জন্য আপনাকে রক্ষমাখা শার্ট দেখতে হবে না। যেই সরকারকে আপনি টাকা ও মতামত দিয়ে আপনাকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিয়েছেন তার দুর্নীতির রিপোর্ট করার জন্য আপনি এবং আপনার স্ত্রীকে সাংবাদিক হওয়া স্বত্ত্বেও মরতে হবে না। এটাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

আপনি সরকারকে ট্যাক্স দেন এবং আপনিসহ আপনার আশপাশের ব্যবস্থাপনার জন্য। যারা এই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী তাদের মধ্যে থেকে আপনি একজন বা একাধিক জনকে নির্বাচন করে সেই দায়িত্ব অর্পন করেন। তারা আপনার অর্পিত দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে কিনা তা নিয়ে আপনি কথা বলবেন নাতো গরু-ছাগল কথা বলবে?
কিন্তু কোথায় কথা বলার জায়গা? একটি রাষ্ট্রে প্রধানত রাজনৈতিক দল সংগঠিতভাবে কথা বলে। কিন্তু বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া এই দেশের সেটা অনেক দিন ধরেই বন্ধ। তারা উৎকণ্ঠায় থাকে কখন কোথা থেকে তাদের তুলে নেওয়া হয়! তার বাইরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যারা কথা বলে ফেসবুকে লিখে কিংবা পত্র-পত্রিকায় লেখে তাদের একজনকেও পাওয়া যাবে না যিনি উৎকণ্ঠা নিয়ে জীবন যাপন করে না!

আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি সেখানে আমরা আমরা স্বাধীনতার ছাড় দিতে দিতে নাই এর পর্যায়ে চলে এসেছি। এখন আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনাত বলতে বুঝি দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে বন্দুক যুদ্ধে গত এক বছরে প্রায় ৩৬৬ জন নিহত হয়েছে এই সংবাদ জানতে পারা। তনু-নুসরাতরদের হত্যার খবর জানতে পারা। আমাদের কাছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে সাগর-রুনি খুন হয়েছে তার খবর ও ২৪ ঘন্টায় তার খুনের সুরাহা করা হবে সেই আশ^াস শুনতে পাওয়া। আমাদের কেউ কেউ জোর গলায় বলি বাক্ স্বাধীনতা আছে বলেই এই খবরগুলো জানতে পারছিৃ! আহা...! যদি বাক-স্বাধীনতটা না থাকতো তাহলেতো এই খবরগুলো কি জানতে পারতাম? সত্যিই তো যদি এই খবর পাওয়াটা না থাকতো তাহলে কি হত? বাক-স্বাধীনতাকে আমরা কোথায় নিয়ে গেছি...!

আমরা সত্যিই বড় দুর্ভাগা জাতি। যে জাতি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রের গাড়ীতে উঠে। কিন্তু গণতন্ত্রের গাড়ি ভাগাড়ে যায় আর স্বৈরাচার প্রেসিডেন্ট প্যালেসে থেকে বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করে।
শুরু করেছিলাম রুশোর ভয়েস অব দ্যা পিপল দিয়ে। আমরা এমন এক বাস্তবতায় আছি যেখানে সেই পিপলের ভয়েসকে অবদমিত করার সকল কার্যক্রমই আছে।

আপনার ভয়েস আছে তবে তার শব্দ নেই। সঞ্জীব চৌধুরী বলেছেন -

“সব নিষিদ্ধ
কষ্ট নিষিদ্ধ কষ্ট নাই
দুঃখ নিষিদ্ধ দুঃখ নাই
আমাদের কষ্ট থাকতে নাই দুঃখ পাওয়ার আদেশ নাই
কষ্ট নিষিদ্ধ কষ্ট নাই দুঃখ নিষিদ্ধ দুঃখ নাই
আমাদের জিহ্বা নাই বাক্য নাই
আমাদের মস্তক নাই হস্ত নাই
আমাদের মাথা থাকতে নাই মাথা থাকার নিয়ম নাই”।
এভাবে সব কিছু মেনে নিতে নিতে একদিন আমরা বলবো “বেঁচে আছি এই বেশ ভালো আছি”।

*মো. শহিদুল ইসলাম : লেখক ও গবেষক




 আরও খবর