www.muktobak.com

সমাচার দর্পণ শুরু, শেষ... উদ্ধার


 মাহবুব আলম    ৮ জুলাই ২০১৯, সোমবার, ৬:৪০    দেশ


এক

উনিশ শতকের বাংলাদেশ একটু একটু পাপড়ি মেলছে। মধ্যযুগীয় আঁধার যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও অপসি য়মাণ। ‘আলো ক্রমে আসিতেছে।’ একদিকে ইংরেজি শিক্ষার উদয়, সঙ্গে মুদ্রণ যন্ত্রের আবির্ভাব, অন্যদিকে প্রচারক-মিশনারি পাদ্রিদের তত্পরতা, যাদের রুখতে এগিয়ে আসছেন ব্রাহ্মরা। সে বড় উথালপাতাল সময়।

বাঙালির সামাজিক জীবন তখন ইংরেজি শিক্ষার পিছু পিছু স্ত্রীশিক্ষা প্রবর্তনে বাংলায় নানা সামাজিক সংস্কারের প্রচেষ্টা চলছে, একই সঙ্গে তখন বাংলা গদ্যসাহিত্যও সৃষ্টির অভিঘাতে প্রবলভাবে আন্দোলিত। নতুন নতুন পেশার আবির্ভাব, সভা-সমিতি, আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, গ্রহণ-বর্জন, বাদ-প্রতিবাদের ঝাপটায় আর নানা পত্রপত্রিকা প্রকাশের উত্তেজনায় আবিষ্ট শিক্ষিত বাঙালি ওই উনিশ শতকের নবজাগরণের জোয়ারে উদ্বেল। এরই মাঝখানে অটল ব্যক্তিত্ব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, তবে তিনি নাস্তিক কি আস্তিক তা নিয়ে মতভেদের অন্ত নেই। এরই পাশাপাশি নবজাগরণের এই আলোকিত বলয়ের বাইরে পড়ে রইল এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী—মুসলিম সম্প্রদায় এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু। আবার অনেকের মতে, সমাজে এই জাগরণের ফলে কিছুই অর্জিত হয়নি বা অধস্তন শ্রেণীর উন্নতি না হওয়ায় সমাজের ইতিবাচক সংস্কার ফলপ্রসূ হয়নি। তবে এ কথা মানতেই হবে যে উচ্চ/মধ্যশ্রেণীর সমাজে এই জাগরণ এক ধরনের গতিধারা সৃষ্টি করেছিল। এই বিচিত্র উনিশ শতকের বহুমাত্রিক ইতিহাসটি যেন এক দক্ষ জহুরির নিপুণ হাতে কাটা নানা কৌণিক আলোয় উদ্ভাসিত এক হীরকখণ্ড। বিভিন্ন কোণ থেকে তাকালে নানা বর্ণের বিচ্ছুরণ চোখে পড়ে। চোখে পড়ে যে বাঙালি প্রচণ্ড মুক্ত মনের মানুষ হিসেবে সম্মানিত, আবার একই সঙ্গে কোনো বিশেষ সামাজিক প্রশ্নে ঘোর রক্ষণশীল, এবং একদেশদর্শী। এই প্রচণ্ড বৈপরীত্য উনিশ শতকের শিক্ষিত নবজাগরিত বাঙালি জীবনের এক বিচিত্র রূপ।

এই বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা অবশ্যই রয়েছে। তবে তা নিয়ে আলোচনা এ প্রবন্ধের মূল বিষয় নয়।

উনিশ শতকের জাতীয় চরিত্রটি বঙ্কিমচন্দ্রের ভাবনাকে আশ্রয় করে যতখানি পরস্ফুিট হয়েছিল, ততখানি সম্ভবত অন্য কাউকে আশ্রয় করে হয়নি। ‘বাঙালির ইতিহাস নাই, বাঙালির ইতিহাস চাই’—এই যথার্থ বাসনা থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র শুধুমাত্র ‘বাঙালির উত্পত্তি’ বিষয়েই তিনি বঙ্গদর্শনে সাতটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। কিন্তু সমাজসংস্কারমূলক আন্দোলনের ব্যাপারে বঙ্কিমের অনেক বক্তব্য নাকি বিভ্রান্তিকর। এর মধ্যে একটি বিষয়, বিধবা বিবাহ বিষয়ে তার মতামত। এখানেও স্ববিরোধ সুস্পষ্ট, আর এ কারণেই সমসময়ে তাকে নানা বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বৈপরীত্য আর স্ববিরোধ যেন উনিশ শতকের মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

এমন একটি স্ববিরোধ আক্রান্ত বিচিত্র কালের ইতিহাস নির্মাণ বড় সহজ কাজ নয়। নানা স্থানে এই বিচিত্র কালপর্বটির ইতিহাসের উপাদান ছাপার হরফে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর হলো সেই সময়ের সংবাদপত্র। সেই বিবর্ণ হলদে হয়ে যাওয়া তখনকার সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় রয়েছে সংবাদ কণিকাসম সমসময়ের এক বিশ্বস্ত দর্পণ। যা থেকে বাঙালি সেকালে তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পাবে সামান্য একটু ধুলো ঝেড়ে, এখনো টিকে যাওয়া সংবাদপত্রের বহু বছরের ফাইল ঘেঁটে। এক কথায় উনিশ শতকের বাঙালি জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্ববিরোধ—সবদিক সম্পর্কেই সে যুগের সংবাদপত্রের মধ্যে বহু উপকরণ রয়েছে। পাশাপাশি উনিশ শতকে যাদের আবির্ভাবে বাংলার ইতিহাস উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, তাদের জীবনচরিত রচনা করতে গেলেও সমসময়ের সংবাদপত্রের সাক্ষ্যগ্রহণ করতে হবে। সেকালের একখানি বিখ্যাত বাংলা সংবাদপত্র আমাদের এই বহুমুখী প্রয়োজন মিটিয়েছে। এ সংবাদপত্রটির নাম ‘সমাচার দর্পণ’। উল্লেখ্য, সে যুগের বাংলা সংবাদপত্রের মধ্যে এই পত্রিকাখানি একক নয়। কিন্তু পুরনো বাংলা সংবাদপত্র আজকাল এত দুষ্প্রাপ্য যে একমাত্র সমাচার দর্পণের প্রায় সব সংখ্যা এবং ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ ‘বঙ্গদূত’ ও ‘সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়’ পত্রের কতগুলো খুচরা সংখ্যা ছাড়া ১৮১৮ সালের পূর্বেকার কোনো বাঙ্গলা সাময়িকপত্র পাওয়া যায়নি। এ পর্যন্ত ১৮১৮ থেকে ১৮৪০ পর্যন্ত সমাচার দর্পণ সব সংখ্যার পত্রিকা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

ব্রিটিশ প্রভুত্ব পাকাপাকিভাবে গেড়ে বসার সময় হতেই বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি ইংরেজি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা ভাষার প্রথম ছাপানো সংবাদপত্র যে কোনটি, সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ সন্দেহ রয়েছে। শ্রীরামপুরের ‘সমাচার দর্পণ’ ও গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য্যের ‘বেঙ্গল গেজেট’ দুই-ই এ সম্মানের দাবিদার। দুটি পত্রিকার মধ্যে প্রথম প্রকাশকালের ব্যবধান ১০-১৫ দিনের বেশি হয়তো হবে না। তবে একেবারে প্রথম হোক বা না-হোক, সমাচার দর্পণ যে সে যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত পত্রিকা তাতে সন্দেহ নেই। মিশনারি কর্তৃক পরিচালিত হলেও এ পত্রিকায় পরধর্মের কুৎসা অথবা খ্রিস্ট ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ে আলোচনা স্থান পেত না। স্থায়িত্বের দিক থেকেও সমাচার দর্পণ এগিয়ে। বেঙ্গল গেজেট বছরখানেক প্রকাশিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়।

‘সমাচার দর্পণ’ ছাড়াও আরো কয়েকটি পত্রিকা ১৮৪০ সালের আগে প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে নিচের কয়েকটি পত্রিকা উল্লেখযোগ্য—

সম্বাদ কৌমুদী—প্রথম প্রকাশকাল ৪ ডিসেম্বর ১৮২১

সমাচার চন্দ্রিকা—প্রথম প্রকাশকাল ৫ মার্চ ১৮২২

বঙ্গদূত—প্রথম প্রকাশকাল ১০ মে ১৮২৯

সংবাদ প্রভাকর—প্রথম প্রকাশকাল ২৮ জানুয়ারি ১৮৩১

জ্ঞানান্বেষণ—প্রথম প্রকাশকাল ১৮ জুন ১৮৩১

সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়—প্রথম প্রকাশকাল  ১০ জুন ১৮৩৫

সম্বাদ ভাস্কর—প্রথম প্রকাশকাল মার্চ ১৮৩৯

 

দুই

পণ্ডিত গঙ্গাধর ভট্টাচার্য্য ইংরেজি ১৮১৮ সালে কলকাতায় প্রকাশ করেন বেঙ্গল গেজেট। গেজেট অর্থ সংবাদ, পত্রিকাটি আদৌ ইংরেজি ভাষায় লিখিত নয়। মিশনারিদের কাছে আমরা নানাভাবে ঋণী হলেও এটা অত্যন্ত গর্বের বিষয় বাঙ্গলা সাময়িকপত্রের সৃষ্টিকর্তা একজন বাঙ্গালি।

এ পত্রিকার নাম কেন বাঙ্গাল গেজেট, এর কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। বোধহয় সেই সময়ে ইংরেজি ভাষা ও ভাবের প্রভাবহেতু শিক্ষিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরাও সে ভাষার প্রভাব ও মর্যাদা সহজে এড়াতে পারেননি।

লর্ড সাহেব তার বাংলা গ্রন্থতালিকায় সাময়িকপত্র মাত্রকেই সংবাদপত্র বলে নির্দেশ করে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে বেঙ্গল গেজেট সংবাদপত্র ছিল না, ছিল একখানা সাহিত্যপত্র। রাজনারায়ণ বসুর মতে, এ ‘পুস্তিকা’য় বিদ্যাসুন্দর, বেতাল পঁচিশ ইত্যাদি কাব্য প্রতিকৃতিসহ মুদ্রিত হতো। রাজনারায়ণ বসুর বিবরণ থেকে জানা যায়, এই প্রথম বাঙ্গলা সাময়িকপত্রখানি ছিল মূলত একটি সচিত্র পত্রিকা। বেঙ্গল গেজেট সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্র ছিল কি না, তাও সঠিক জানার উপায় নেই। তবে লর্ড সাহেব লিখে গেছেন বেঙ্গল গেজেটের মাসিক মূল্য ছিল ১ টাকা। পত্রিকাটি মাত্র অল্প কিছুদিন বেঁচে ছিল।

বেঙ্গল গেজেটের অকালমৃত্যুর পর শ্রীরামপুরের ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিরা ‘দিগদর্শন’ নামে একখানা মাসিকপত্র বের করেন। পত্রিকাটি ক্ষুদ্র আকারের, ডিমাই ১২ পেজের মতো, ১৬ থেকে ২৪ পৃষ্ঠার মধ্যে এর পরিসর। শ্রীরামপুরের মিশনারিদের একখানা বাঙ্গলা সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করার ইচ্ছা বহুদিনের। কিন্তু সে সময়ে সরকার সংবাদপত্রের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করত। কিছু কিছু খ্যাতিমান ইংরেজ সম্পাদককে জোর করে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল পত্রিকায় প্রকাশিত তাদের মতামতের জন্য। কর্তৃপক্ষের এই বিরূপ মনোভাবের কারণে তারা দিগদর্শন পত্রিকাটি পরীক্ষামূলকভাবে বের করেছিলেন। প্রভুদের মনোভাব দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ অর্থাৎ সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করার সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে, এই ছিল ভাবনা। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন জে মার্শম্যান সাহেব।

দিগদর্শন প্রকাশের পর ইংরেজ রাজপুরুষরা তেমন কোনো আপত্তি জানালেন না দেখে মিশনারিরা বুকে বল পেলেন। ফলে দিগদর্শন বন্ধ করে দিয়ে তারা ভিন্ন নামে ও ভিন্ন আকারে একখানা সাপ্তাহিক বাঙ্গলা সংবাদপত্র বের করার প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলেন। এখানে বলে রাখা ভালো, আধুনিক গবেষকরা দিগদর্শনের পুরনো ফাইল ঘেঁটে মন্তব্য করেছেন যে, তারা দিগদর্শন পড়ে দেখেছেন, ওই পত্রিকায় কোনো সংবাদ থাকত না।

মিশনারিরা তাদের প্রস্তাবিত সংবাদপত্রের নাম স্থির করলেন বিলাতের প্রাচীনতম সংবাদপত্র ‘মিরর অব নিউজ’-এর অনুকরণে। নাম হলো, ‘সমাচার দর্পণ’।

কিন্তু এতে বাদ সাধলেন প্রখ্যাত মিশনারি ও ভাষাবিদ ড. কেরি। সংবাদপত্র বের করে রাজপুরুষদের আনুকূল্য হারানোর আশঙ্কায় ড. কেরি এই প্রস্তাবিত সংবাদপত্র প্রকাশে ঘোর আপত্তি জানালেন। তবে মিশনারিদের দীর্ঘ বৈঠকে, পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হলো সমাচার দর্পণ প্রকাশ করা হবে, তবে একটি বিশেষ শর্তে।

সমাচার দর্পণের মুদ্রিত প্রথম সংখ্যাটির সঙ্গে একটি অনুবাদসহ গভর্নমেন্টের কাছে পেশ করা হবে। তারপর গভর্নমেন্ট পত্রিকাটি পরিচালনার অনুমতি দিলেই তবে সমাচার দর্পণ নিয়মিত প্রকাশিত হবে। আর যদি গভর্নমেন্ট আপত্তি উত্থাপন করে, তবে সেই মুহূর্তেই পত্রিকাটির ছাপা বন্ধ করে দিতে হবে।

উপরের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২৩ মে ১৮১৮ খ্রি.-এ সমাচার দর্পণের প্রথম সংখ্যা ছাপিয়ে ড. মার্শম্যান কপি সঙ্গে নিয়ে কলকাতা যান এবং ওই সংখ্যার অনুবাদসহ পত্রিকাটির এক কপি ভাইস প্রেসিডেন্ট মি. এডমন্টনকে, একখানা চিফ সেক্রেটারিকে এবং একখানা গভর্নর জেনারেল হেস্টিংসকে প্রেরণ করেন। হেস্টিংস তখন কলকাতার বাইরে ছিলেন, তিনি নিজের হাতে লেখা চিঠিতে ড. মার্শম্যানকে দেশীয় জনসাধারণের জ্ঞান ও অনুসন্ধিৎসা বাড়ানোর জন্য তাদের বাংলা সংবাদপত্র প্রচারের এই শুভ উদ্যোগের প্রচুর প্রশংসা করেন।

শুধু এই নয়, তিনি সেই বছরেই নিরাপদে মুদ্রণযন্ত্রের ও সাময়িক পত্রিকা পরিচালনা উপযোগী নিয়ম অবধারিত রেখেই পাণ্ডুলিপি পরীক্ষার কঠোর নিয়মটি তুলে দেন। লর্ড হেস্টিংসের নিজের হাতে লেখা চিঠি পেয়ে শ্রীরামপুরের মিশনারিরা পরম উৎসাহে বাঙ্গলার প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র সমাচার দর্পণ প্রকাশ অব্যাহত রাখলেন, ফলে ১৮১৮ সালের ২৩ মে (১০ জ্যৈষ্ঠ ১২২৫, শনিবার) হল উপমহাদেশের প্রথম বাঙ্গালা সাপ্তাহিকের আত্মপ্রকাশের সোনালি দিন।

 

তিন

পত্রিকা প্রচারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে

প্রথম সংখ্যা সমাচার দর্পণে সম্পাদক বলেন, ‘এই সমাচারের পত্র প্রতি সপ্তাহে ছাপান যাইবে, তাহার মধ্যে এই সমাচার দেয়া যাবেই—’

১। এতদ্দেশের জজ ও কলেক্তর সাহেবেরদের ও অন্য রাজকর্ম্মাধ্যক্ষেরদের নিয়োগ।

২। শ্রী শ্রী যুত বড় সাহেব যে নতুন আয়িন ও হুকুম প্রভৃতি প্রকাশ করিবেন।

৩। ইংগ্লন্ড ও ইউরোপের অন্য প্রদেশ হইতে যে নতুন সমাচার আইসে এবং এই দেশের নানা সমাচার।

৪। বাণিজ্যাদির নতুন বিবরণ।

৫। লোকেরদের জন্ম ও বিবাহ ও মরণ প্রভৃতি ক্রিয়া।

৬। ইউরোপ দেশীয় লোককর্তৃক যে নতুন সৃষ্টি হইয়াছে, সেই সকল পুস্তক হইতে ছাপান যাইবে এবং যে নতুন পুস্তুক মাসে ইংগ্লন্ড হইতে আইসে, সেই সকল পুস্তকে যে নতুন শিল্প ও কল প্রভৃতির বিবরণ থাকে, তাহাও ছাপান যাইবে।

৭। এবং ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস ও বিদ্যা ও জ্ঞানবান লোক ও পুস্তকে প্রভৃতির বিবরণ।

এই সমাচারের পত্র প্রতি শনিবারে প্রাতঃকালে সর্ব্বত্র দেওয়া যাইবে, তাহার মূল্য প্রতি মাসে দেড় টাকা। প্রথম দুই সপ্তাহের সমাচারের পত্র বিনামূল্যে দেওয়া যাইবে। ইহাতে যে লোকের বাসনা হইবেক, তিনি আপন নাম শ্রীরামপুরের ছাপাখানাতে পাঠাইলে প্রতি সপ্তাহে তাহার নিকটে পাঠান যাইবে।’

মার্শম্যান সাহেব এই পত্রিকার সম্পাদক হলেও প্রকৃতপক্ষে পত্রিকা সম্পাদনের ভার এদেশীয় বাঙালি পণ্ডিতদের ওপরই ন্যস্ত ছিল। এমনকি পূজা-পার্বণ উপলক্ষে পণ্ডিতরা অনুপস্থিত থাকলে সমাচার দর্পণে নতুন সংবাদ প্রকাশও বন্ধ থাকত। ২৬ অক্টোবর ১৮৩৩ সালে সমাচার দর্পণ সম্পাদক জানান যে, ‘আমাদের পণ্ডিতগণ আগামী সোমবার পর্যন্ত নিজ নিজ বাটী হইতে প্রত্যাগত হইবেন না, অতএব এই কালের মধ্যে দর্পণে নতুন নতুন সংবাদ প্রকাশ না হওয়াতে পাঠক মহাশয়রা ত্রুটি মার্জনা করিবেন।’

পত্রিকাটির প্রথমাবস্থায় সম্পাদকীয় বিভাগে ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত জয় গোপাল তর্কালঙ্কার।

সমাচার দর্পণ ইংরেজ মিশনারি পরিচালিত কাগজ হওয়ার দরুন সেখানে নব্যপন্থীদের সংবাদ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তাহলেও পত্রিকাটি একান্তই একদেশদর্শী ছিল না। কারণ এতে প্রাচীনপন্থীদের সংবাদপত্র থেকে চিঠিপত্র, প্রতিবাদ, আপত্তিসংক্রান্ত বিবিধ সংবাদের সংকলনও পুনর্মুদ্রিত হতো। ফলে সে যুগের ধর্ম, শিক্ষা ও সমাজ সম্পর্কে যেসব আন্দোলনে বাঙ্গালি উদ্বেলিত হয়েছিল, সমাচার দর্পণ হতে তার ইতিহাস সংকলন করা অতি সহজ হয়ে ওঠে। অধিকন্তু সেকালের বাঙালির প্রায় সব কার্যকলাপ সম্পর্কেই সংবাদ ও তথ্য আহরণ করা সম্ভব এই পত্রিকার পাতা থেকে।

১৮৩০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সমাচার দর্পণে বাংলা সাহিত্য ভাষা ও নতুন পুস্তক সম্পর্কে যথেষ্ট সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে হলে এসব তথ্য বিশেষ মূল্যবান।

বাংলা ভাষার রীতি কেমন হওয়া উচিত, তাতে বিদেশী শব্দ থাকা উচিত কিনা, সংস্কৃত শব্দই বা কী পরিমাণ ব্যবহার করা উচিত—এসব বিষয় নিয়ে সে আমলে যে তর্ক-বিতর্ক চলেছিল, তার একটি বস্তুনিষ্ঠ ধারণা সমাচার দর্পণের পাতায় পাওয়া গেছে। এছাড়া বাংলা সাহিত্য সম্পর্কেও বহু সংবাদ সমাচার দর্পণে পাওয়া যায়। প্রথম যুগের মুদ্রিত বাংলা পুস্তক সম্পর্কে বহুদিন পর্যন্ত পাদ্রি লঙের তালিকাই আমাদের একমাত্র সম্বল ছিল। সমাচার দর্পণে এমন অনেক বাংলা পুস্তকের নাম উল্লিখিত হয়েছে, যার নাম লঙ সাহেবের তালিকায় অনুপস্থিত। সমাচার দর্পণে মাঝে মাঝে আগের বছরে প্রকাশিত বইয়ের তালিকা ছাপা হতো। বাংলা সাহিত্যের গবেষকদের জন্য এ তালিকার গুরুত্ব কম নয়। এসব তালিকা থেকে রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য্য, প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাস, নীলরত্ন হালদার প্রমুখের লিখিত অনেকগুলো বইয়ের নাম পাওয়া গেছে।

এছাড়া সমাচার দর্পণের তথ্য থেকে বাংলা, উর্দু, ফারসি, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত অনেক সংবাদপত্রের নাম পাওয়া যায়। এর মধ্যে ‘সম্বাদ কৌমুদী’, ‘সমাচার চন্দ্রিকা’, ‘সম্বাদ তিমিরনাশক’ প্রভৃতি বাংলা পত্রিকার এবং প্রথম হিন্দি সংবাদপত্র ‘উদন্ত মার্তণ্ডের’ এবং কয়েকজন ইংরেজি শিক্ষিত যুবক কর্তৃক প্রকাশিত ও ডি রোজিও সম্পাদিত পার্থিনিয়ানের নাম চোখে পড়ে। এ সমাচার পত্রগুলোর সঠিক প্রকাশকাল এর আগে বাঙ্গালি গবেষকদের জানা ছিল না। সে যুগের বাঙ্গালির আমোদ-প্রমোদের তথ্যও সমাচার দর্পণ উপেক্ষা করেনি। তখনও বাঙালির বিনোদন সেকেলে ধরনেরই ছিল, অর্থাৎ খেমটানাচ, হাফ-আখরাই, সংযাত্রা, কবির লড়াই, কুস্তি ইত্যাদি সমাচার দর্পণই প্রথম জানায়—বাঙ্গলাদেশে আজকাল দুর্গা পূজার যে সমারোহ হয়, তা খুব বেশিদিন আগের ব্যাপার নয়। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রই প্রথমে মহাজাঁকজমকের সঙ্গে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত করেন। নবাবি আমলের পতনের ফলে ইংরেজের উৎসাহে এ উৎসবের সমারোহ অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। সমাচার দর্পণ আরো এক ধরনের তথ্য দিয়েছিল—গত কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের বালিকাদের মধ্যেও শরীরচর্চা শুরু হয়েছে। এতে সমাজের প্রতিক্রিয়া অনুকূল বলে সমাচার দর্পণ আনন্দ প্রকাশ করেছে।

কোম্পানি সরকার সমাচার দর্পণের প্রতি প্রথম থেকেই অনুকূল মনোভাব দেখিয়েছে। সম্পাদক ইংরেজ মিশনারি হওয়া সত্ত্বেও পত্রিকাটি কিন্তু কখনো ‘কর্তাভজা’ বা সরকারের পো ধরা হয়নি। শান্তিপুরের কোনো এক দুঃখিনী সুতা কাটুনীর অতিকরুণ চিঠির কথা এ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এবার আরো একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সেটি এ দেশে ইংরেজ/ইউরোপিয়ানদের বসবাস ও কৃষিকাজ করার প্রস্তাব সম্পর্কে দেশীয়দের মনোভাব বা ক্ষোভ সম্পর্কিত।

সমাচার দর্পণ জানাচ্ছে, দ্বারকানাথ ঠাকুর ও প্রসন্নকুমার ঠাকুর কলকাতার টাউন হলের এক সভায় প্রস্তাব করেন যে, ইংরেজদের এ দেশে বসতি করার বিরুদ্ধে যে আইন আছে, তা এ দেশের কৃষিকর্ম, শিল্প ইত্যাদির উন্নতির পক্ষে বিশাল প্রতিবন্ধক। অচিরেই এই প্রতিবন্ধকতা বা বাধা দূর করে দেয়া হোক। জনৈক পত্রলেখক সমাচার দর্পণে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি লিখলেন যে যন্ত্রনির্মিত সুতার আমদানি হওয়ায় এ দেশের বহু দিনদরিদ্র নারীর অন্নাভাব হয়েছে, বিলাতের শিল্প কর্মচারীরা বিলাতে থেকেই এ দেশের মানুষের মুখের অন্ন ছিনিয়ে নিচ্ছেন, তারা এ দেশে এসে বসবাস শুরু করলে কি রক্ষা আছে! জুলাই ১৮২৯ থেকে সংবাদপত্রটি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় প্রকাশিত হতে থাকে। বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন ছিল বস্তুত একে অন্যের অনুবাদ। জানুয়ারি ১৮৩২ থেকে সমাচার দর্পণ প্রতি সপ্তাহে দুবার বের হতে লাগল—বুধবার ও শনিবার। পত্রিকার মূল্য প্রতি মাসে ১ টাকার পরিবর্তে দেড় টাকা ধার্য হলো। ডাকমাশুল বৃদ্ধি পাওয়ায় সপ্তাহে দুবার পত্রিকা প্রকাশন স্থগিত হয়ে আবার ৮ নভেম্বর ১৮৩৪ থেকে সাপ্তাহিক পত্রিকায় রূপ নিল।

১৮২৬ সালে সরকার মিশনারিদের সমাচার দর্পণের একটি ফারসি সংস্করণ বের করার অনুরোধ জানাল, কারণ উত্তর ভারতে দেশীয় ভাষায় কোনো ভারতীয় সংবাদপত্র না থাকায় সেই অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বিঘ্নিত হচ্ছিল। এই ফারসি সমাচার দর্পণের নাম হলো আখবার--শ্রীরামপুর। প্রকাশ হয়েছিল ৬ মে ১৮২৬। প্রতি মাসে ১০০ টাকা অনুদান দিয়ে সরকার পত্রিকাটিকে সাহায্য করেছিল। কিন্তু দুই বছর পর প্রয়োজনীয় সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আখবার--শ্রীরামপুর বন্ধ হয়ে যায়। গোড়া থেকে ইংরেজ সরকার সমাচার দর্পণের প্রতি অনুকূল মনোভাব পোষণ করে এসেছে যদিও, খ্রিস্ট ধর্মের প্রসার পত্রিকাটির মূল উদ্দেশ্য থাকলেও সরকার মিশনারিদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পত্রিকাটি পরিচালনা করতে নির্দেশ দেয়। পত্রিকাটি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে ডাকযোগে বিতরণের সুবিধা পেয়েছিল। ডাকমাশুল কমিয়ে নির্ধারিত মাশুলের পরিবর্তে এক-চতুর্থাংশ মাত্র মাশুল আদায় করা হতো। পত্রিকাটির লেখার ভাব ও সুর অন্যান্য মিশনারি পরিচালিত পত্রিকার চেয়ে অনেক নমনীয় ছিল। দেশীয়দের সমর্থনলাভের উদ্দেশ্যে এই নীতি নেয়া হয়। সরকার ও শিক্ষিত দেশীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পত্রিকাটির ভূমিকা প্রশংশিত হয়েছিল।

ডিসেম্বর ১৮৪১ সালে মিশনারিরা পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। প্রকাশ্যে বলা হলো, সম্পাদক জন ক্লার্ক মার্শম্যানকে সমাচার দর্পণ ছাড়াও কয়েকটি ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদনার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, ফলে তার হাতে যথেষ্ট সময় না থাকায় সমাচার দর্পণ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। গবেষকদের ধারণা সমাচার দর্পণ পত্রিকা হিসেবে যথেষ্ট সফল এবং জনপ্রিয় হলেও খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার ও প্রসারে আদৌ ফলপ্রসূ হয়নি। ১৮৪১ সালের শেষ পর্যন্ত সমাচার দর্পণ নিয়মিত এবং সময়মতো প্রকাশিত হওয়ার কৃতিত্ব অবশ্যই দাবি করতে পারে। ১৮৩৬ নাগাদ এর সার্কুলেশন সপ্তাহে ৪০০ কপিতে পৌঁছে, যা অন্য যেকোনো ভারতীয় ভাষার পত্রিকার চেয়ে অনেক বেশি।

সমাচার দর্পণের সংবাদ কণিকাও তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ব্রজেন্দ্রনাথের সংবাদপত্রে সেকালের কথা (দুখণ্ড) প্রকাশিত হয়। ১৩৩৯ সালে এই সংকলন প্রকাশিত হওয়ার পরই সামাজিক ইতিহাস শব্দটি বাঙ্গালি পাঠক ও গবেষকদের কাছে জলচল হয়ে ওঠে। বঙ্গে সামাজিক ইতিহাস উপকরণ সংগ্রহ হিসেবে গ্রন্থটিকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ (১৩৪১-৪২) পুরস্কৃত করেছিল। ব্রজেন্দ্রনাথ যথার্থই লিখেছিলেন, ‘এই সকল পত্রিকা হইতে আবশ্যক তথ্যগুলি সংকলন ও প্রকাশ করিলে দেশের ইতিহাস রচনার পথ সুগম হইবে।’

 

চার

সমাচার দর্পণ দীর্ঘদিন বিস্মৃতির ধুলোয় চাপা পড়েছিল। দু-চারজন বিদ্বান গবেষক এর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ফাইল হাতে পেয়ে কিছু নাড়াচাড়া করলেও পত্রিকাটিকে ইতিহাসের আকর হিসেবে তেমন গুরুত্ব দেননি। বিখ্যাত গবেষক ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অনেকটা আড্ডার মেজাজে এবং তাদের রবিবাসরীয় আড্ডার সদস্যদের বিনোদনের জন্যই নিজের অজান্তে তার ভবিষ্যৎ গবেষণা গ্রন্থ ‘সংবাদপত্রে সেকালের কথা’র ভিত্তির প্রথম গাঁথুনি দিয়েছিলেন। এই পত্রিকাটির মালমসলা দিয়ে তিনি তখন হাতের কাছে যে কখানি সমাচার দর্পণের ফাইল পেয়েছিলেন, তা ঘেঁটে ‘সেকালের কথা’ নামে বিভিন্ন বিষয় সংকলন করে জলধর সেনের ‘ভারতবর্ষে’ ধারাবাহিকভাবে ছাপাতে শুরু করেন। ধারাবাহিকের একটি কিস্তি তিনি তাদের রবিবাসরীয় আড্ডায় পড়েও শুনিয়েছিলেন। গবেষক, সাংবাদিক, ঐতিহাসিক যোগেশচন্দ্র বাগল তার স্মৃতিকথা ‘জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে’-তে লিখেছেন, ‘‘সেদিনের ‘সেকালের কথা’র কিস্তির বিষয় ছিল শান্তিপুর নিবাসিনী জনৈক সুতা কাটুনীর পত্র’ বিলেতি সুতার ঢালাও আমদানির দরুন সুতা কাটুনী নারীদের কী দুর্গতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, পত্রখানা সেই সম্পর্কেই লেখা। বাগলের ভাষায়, ‘ইহা তখন বেশ সময়োপযোগী হয় এবং আমাদের যে খুব ভাল লাগে তা বলাই বাহুল্য।’’

 ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবৃত ‘সমাচার দর্পণের’ প্রকাশ এবং খ্যাতির কাহিনী যেমন চিত্তাকর্ষক, তেমনি চিত্তাকর্ষক এই পত্রিকাটির ১৮১৮ থেকে ১৮৪০ পর্যন্ত সব ফাইল উদ্ধার করার সাফল্যজনক ইতিবৃত্তও। এই উদ্ধারকর্মের কৃতিত্বের দাবিদার ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তার সহকর্মী যোগেশচন্দ্র বাগলও। উৎসাহ ও পরামর্শ দিয়েছেন নীরদ সি চৌধুরী। এরা তিনজনই তখন প্রবাসী পত্রিকার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। এই উদ্ধার পর্বের কারণেই ব্রজেন্দ্রনাথের গবেষণায় এক নতুন মোড় নিয়েছিল।

সমাচার দর্পণের উদ্ধার পর্ব নিয়েও বিস্তারিত লিখেছেন যোগেশচন্দ্র বাগল, তার স্মৃতিকথা ‘জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে’ গ্রন্থে।

যোগেশচন্দ্র বাগলের বই পড়ে জানা যায় কিভাবে তিনি সমাচার দর্পণের হদিশ পেলেন, তিনি প্রথম জেনেছেন প্রবাসী পত্রিকার অফিসে গিয়ে, একদিন ওখানে গিয়ে জানলেন একটি আশ্চর্য জিনিস ‘আবিষ্কৃত’ হয়েছে, যা থেকে গত শতাব্দীর (উনিশ শতাব্দীর) প্রথম দিকের অনেক নতুন তথ্য পাওয়া যাবে। এর আগে ব্রজেন্দ্রনাথ রাজা রাধাকান্ত দেবের পারিবারিক গ্রন্থাগারে সমাচার দর্পণের ১৮৪০ সাল পর্যন্ত বহু বছরের পুরনো একটি ফাইল দেখে এসেছেন। তাতে প্রথম বছর ১৮১৮-১৯ ছাড়া সবগুলোই সংখ্যাই বাঁধানো ছিল। তিনি ভালো করে খতিয়ে দেখার জন্য এক ভলিউম সমাচার দর্পণ বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। তিনি নিজে সবটা পড়ে নীরদ চৌধুরীকে দেখতে দেন।

তারপর ব্রজেন্দ্রনাথ, নীরদচন্দ্র ও যোগেশচন্দ্র বাগল এক রোববার রাধাকান্ত দেবের পারিবারিক গ্রন্থাগারে হাজির হলেন।

রোববার ছাড়া গ্রন্থাগার খোলা হয় না। কাজেই ওই রোববারে গিয়ে তারা লাইব্রেরিটি খোলাই পেলেন। লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিকের সম্পর্কে একটি কৌতুকঘন চিত্র যোগেশচন্দ্র বাগলের স্মৃতিকথা থেকে উল্লেখ করা যেতে পারে। গ্রন্থগারের লাইব্রেরিয়ান মহাশয় প্রতিদিন পাঠাগারের দায়িত্ব একজন বেয়ারার হাতে সপে দিয়ে রাজবাড়ীর ভেতরকার পুকুরে ছিপ ফেলে মত্স্য শিকারে প্রভূত উদ্যম, অসীম মনোযোগ ব্যয় করেন। প্রথম দিনেই যোগেশচন্দ লাইব্রেরিয়ানের মৎস শিকারের দৃশ্য দোতলার বারান্দা থেকে দেখার স্মৃতি বেশ গুছিয়ে লিখে গেছেন, তিনি লিখেছেন—পুকুরটি বেশ বড়, পশ্চিমে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ। ওইদিন প্রায় বেলা ১১টা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে রাজবাড়ি ও গ্রন্থাগারকে তারা ভালোভাবেই দেখেছিলেন। লাইব্রেরির পাশে দক্ষিণ দিকে লম্বা হল। বহু তৈলচিত্র দেয়ালে টানানো। জানতে পারলেন এই বৃহৎ হলঘরটি প্রকৃতপক্ষে রাজবাড়ির নাচঘর হিসেবে ব্যবহূত হতো। এই নাচঘরে নাকি লর্ড ক্লাইভ থেকে শুরু করে আমন্ত্রিত বহু সাহেবসুবো দিশি নাচ উপভোগ করেছেন। গ্রন্থাগারের দুপাশে অনেক আলমারি, কোনোটার চাবি বন্ধ, কোনোটা খোলা। একটি প্রকোষ্ঠের মাঝখানে দু-তিনটি টেবিল, তার ওপর ইংরেজি-বাংলা খবরের কাগজের বাঁধানো ফাইল স্তূপীকৃত। ‘এই রূপ একটি স্তূপ হইতেই সমাচার দর্পণের ফাইলগুলি আবিষ্কৃত হয়।’

বাগল শুনলেন, তাদের আগেও কোনো কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি এই লাইব্রেরিতে এসেছেন। তার ধারণা সমাচার দর্পণের ফাইল তারাও দেখে থাকবেন। তবে তার অভিমত যে সেই সব পণ্ডিত ব্যক্তি এই পত্রিকার গুরুত্ব হূদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হননি।

পরের রোববারও তারা তিনজনই এ লাইব্রেরিতে গেছেন। ধুলা ঝেড়ে, কাগজপত্র ও পুস্তকাদি দেখেছেন। বলা বাহুল্য, ব্রজেন্দ্রনাথ ও নীরদচন্দ্র অত্যধিক সাগ্রহ ও উৎসাহের সঙ্গে এসব কাগজপত্র দেখতে লাগলেন। এখানে বিভিন্ন বিষয়ের পাণ্ডুলিপি এবং পুঁথিপত্র সংরক্ষিত ছিল। পুঁথিগুলোর মধ্যে মহারাজ নবকৃষ্ণের সভাপণ্ডিত, পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের মহামূল্য পুঁথি বিবাদ ভঞ্জন চোখে পড়ে তাদের। লর্ড কর্নওয়ালিশ হিন্দু ব্যবহার শাস্ত্রের সার সংকলনের জন্য পণ্ডিত প্রবরকে নিযুক্ত করেছিলেন। এ পুঁথিখানি কর্নওয়ালিশের উদ্যোগেরই ফসল। বহু বছর পর হারবার্ট টমাস কোলব্রুক এই পুঁথির ভিত্তিতেই ইংরেজিতে হিন্দু আইন পুস্তক সংকলন করেছিলেন।

বারবার লাইব্রেরিতে যাওয়া সত্ত্বেও যোগেশচন্দ্র বাগল লাইব্রেরিয়ানের দৈনন্দিন কর্মসূচিতে মত্স্য শিকারের কোনো পরিবর্তন না দেখতে পেয়ে বেশ হতাশ হয়েছিলেন। লিখেছেন, গ্রন্থাগারিকের কিন্তু একই ভাব। গ্রন্থাগারিক একবার দর্শন দিয়াই পুষ্করিণীর পাড়ে ছিপ ফেলতে বসে পড়তেন। প্রথমে একজন বৃদ্ধ ভৃত্যকে লাইব্রেরিতে দেখা যেত। পরে আরেকজন তার স্থান গ্রহণ করে। তারাও দরজা খুলে দিয়েই উধাও হয়ে যেত। পাঠকরা চলে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করত কিনা সন্দেহ। তবে লাইব্রেরিটি যথার্থই একটি রত্নখনি ছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা রাজা রাধাকান্ত দেব বিদ্বান, সাহিত্যসাধক, বিদ্যোৎসাহী—ইংরেজি, বাংলা, ফারসি, সংস্কৃত কত রকমের বই এখানে সংগ্রহ করিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া ইংরেজি, বাংলা বিভিন্ন সংবাদপত্র বছরের পর বছর বাঁধিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন এখানে। বিভিন্ন সরকারি কমিটির বহু রিপোর্ট এখানে চোখে পড়ে। উনিশ শতকের প্রথম দিকে প্রকাশিত বাংলা বইয়ের দুষ্প্রাপ্য প্রথম সংস্করণগুলো এখানে দেখে পাঠকরা বিস্মিত হতেন। বাগল প্রথম দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক জায়গায় বলেছেন, লাইব্রেরিটি তখনই আসলে কালের দশায় পড়ে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। উপযুক্ত পরিচালনা ও সংরক্ষণের অভাবে বহু অমূল্য পুঁথি নষ্ট হয়ে গেছে অথবা একেবারে উধাও হয়ে গেছে।

পুঁথি নিয়মনিষ্ঠ মানুষ ব্রজেন্দ্রনাথ এখানে প্রাপ্ত পত্রপত্রিকা ও বই নিয়মিত ব্যবহার করার একটি উপায় বের করে ফেললেন, যা খুব ফলপ্রসূ হয়েছিল। রাধাকান্তর বংশধর শিবপ্রসাদ দেব অধ্যাপক প্রিয়রঞ্জন সেনের বন্ধু ও সহপাঠী। ব্রজেন্দ্রবাবু প্রিয়রঞ্জন সেনের কাছ থেকে একটি পরিচয়পত্র এনে রাধাকান্ত দেবের বংশধরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং এক ভলিউম সমাচার দর্পণ তার সৌজন্যে নিয়মিতভাবে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেলেন। গবেষক বাগলও ব্রজেন্দ্রনাথের মাধ্যমে শিবপ্রসাদ দেবের সঙ্গে পরিচিত হয়ে  কিছু বইপত্র ও পাণ্ডুলিপি বাড়ি নিয়ে পড়ার অনুমতি পেলেন।

গ্রন্থাগারের ট্রাস্টি এই অমূল্য গ্রন্থরাজির গুরুত্ব সম্পর্কে আদৌ অবহিত নন। শিবপ্রসাদ দেবের মুখে এই রকম অভিযোগ তারা দুজনেই শুনেছেন। সুধী ও পণ্ডিত ব্যক্তিরা এই প্রাচীন গ্রন্থাগারে আগেও এসেছেন কিন্তু এখানে যে এত অমূল্য রত্নরাজি রক্ষিত আছে, ব্রজেন্দ্রনাথ তার ক্রমান্বয়ে সদ্ব্যবহার করার আগে কেউ সম্যকভাবে উপলব্ধি করেননি। তবে তাদের মুখে এ গ্রন্থগারের গুরুত্ব অনুধাবন করে পরবর্তীতে শিবপ্রসাদ দেব প্রমুখ রাজা রাধাকান্ত দেবের বংশধরেরা রোববার নিয়মিত গ্রন্থাগার খোলা রাখার ব্যবস্থা করেন। এবং নতুন করে বইপুস্তক ঝাড়া-পোছার কাজও বেগবান হয়। শিবপ্রসাদ দেব নিজেও যথার্থ গ্রন্থানুরাগী ছিলেন। তিনি উদ্যোগী হয়ে সব পুস্তকের তালিকা প্রস্তুত করালেন এবং প্রত্যেকটি আলমারি তালাচাবি দিয়ে বন্ধ করার ব্যবস্থা করলেন।

ব্রজেন্দ্রনাথ অভিজ্ঞ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ গবেষক। এতদিন তিনি সরকারি দলিল-দস্তাবেজের ওপর নির্ভর করে গবেষণা চালিয়ে গেছেন। সমাচার দর্পণের বহু বছরের ফাইল আবিষ্কার এবং প্রথম দিকে দু-এক খণ্ড তন্ন তন্ন করে পড়ার পর বুঝলেন, এই অমূল্য পত্রিকাটি ওই যুগের ধর্ম, সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতিবিষয়ক ইতিহাস লেখার জন্য একটি মূল্যবান আকর। তিনি শুধু সমাচার দর্পণ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। সমসময়ের অন্যান্য বাংলা কাগজের লেখা ও মতামত জানা প্রয়োজন মনে করেন। ফলে কোথায় কী কী পুরনো বাংলা কাগজের ফাইল পাওয়া সম্ভব, সেই অনুসন্ধানেও নেমে পড়লেন।

প্রথমেই কলকাতার অদূরে উত্তরপাড়া পাবলিক লাইব্রেরিতে হানা দিলেন, সঙ্গে নীরদ সি চৌধুরী এবং সাংবাদিক ও গবেষক বাগল। আগেই সব ব্যবস্থা করা ছিল। তারা প্রথমে জমিদার মুখুজ্জের বাড়ির দোতলায় গেলেন। জমিদারের নাম রাসবিহারী মুখোপাধ্যায়। তিনি অতিথি গ্রন্থপ্রেমিকদের একটি বড় ঘরে নিয়ে গেলেন। এটি তার লাইব্রেরি, হলঘরও বলা চলে। চারদিকে দেয়ালঘেঁষে আলমারি সাজানো এবং প্রত্যেকটি বইয়ে ঠাসা, এই লাইব্রেরি মুখুজ্জ মশাইয়ের একেবারে নিজস্ব। সেখানে প্রচুর ফরাসি বই দেখলেন। জমিদার নিজে ফরাসি জানতেন।

জমিদারবাড়ি থেকে এরপর তারা পাবলিক লাইব্রেরিতে হাজির হলেন। লাইব্রেরিটি সুরম্য দ্বিতল অট্টালিকা, গঙ্গার একেবারে কোলঘেঁষে।

নিচের তলায় লাইব্রেরি, দোতলায় অতিথি-অভ্যাগতরা মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিয়ে থাকেন, নিচের তলায় কয়েকটি কক্ষ, সারিবদ্ধ আলমারিতে বইপত্র সুরক্ষিত। আরোগ্যলাভের জন্য মধুসূদন দত্ত এর দোতলায় সপরিবার কিছুদিন কাটিয়েছেন।

গ্রন্থাগারে ঢুকেই তারা দেখলেন, দীর্ঘ শুভ্র শ্মশ্রুগুম্ফ সমন্বিত এক প্রবীণ ব্যক্তি টেবিলের সামনে বসে আছেন। তাকে সবিনয়ে জানানো হলো, এরা কলকাতা থেকে এখানে এসেছেন পুরনো বাংলা খবরের কাগজের খোঁজে। তিনি কোনো হদিস দিতে পারেন কিনা, জিজ্ঞাসা করলে তিনি নির্বিকার চিত্তে বললেন যে তার সন্ধানে কিছু নেই। ইচ্ছে করলে তারা লাইব্রেরি খুঁজে দেখতে পারেন। এরপর অতিথিরা এঘর-ওঘর ভালো করে খুঁজে দেখতে লাগলেন। একটি আলমারির মাথায় কিছু ছেঁড়া পুরনো কাগজের মধ্যে সংবাদ রসরাজের এক বছরের বাঁধানো ফাইল পাওয়া গেল।

একটি আলমারির মাথায় আলাদা করে সংবাদ রসরাজের ফাইল দেখে তারা দক্ষিণের বারান্দার দিকে পা বাড়ালেন। চোখে পড়ল বারান্দায় অনেক ইংরেজি কাগজের বাঁধানো ফাইল ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে রাখা। এর মধ্যে খুব পুরনো কাগজও রয়েছে। যেমন বেঙ্গল ক্রনিকল নামের ইংরেজি সাপ্তাহিকখানি দেখে বিস্মিত হলেন সন্ধানীরা। এসব কাগজপত্র সযত্নে সাজিয়ে রাখার অনুরোধ গ্রন্থাগারিককে জানানো হলো। এর কয়েক মাস পরে যখন তারা আবার সেখানে গেলেন তখন দেখেন অত অমূল্য কাগজগুলো কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে।

বারান্দার ওই অংশ একেবারে পরিষ্কার। বৃদ্ধ গ্রন্থাগারিক আগের মতোই নির্বিকার। এ বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি। বাঁধানো সংবাদ রসরাজখানাও নেই। তবে তারা একবারে শূন্য হাতে ফিরলেন না। ইংরেজি হিন্দু প্যাট্রিয়টের কিছু ফাইল ঘেঁটে এবং অন্যান্য কিছু ইংরেজি মাসিক পত্রিকা উদ্ধার করতে সমর্থ হলেন।

ব্রজেন্দ্রনাথ এখানেই থামলেন না, তিনি পুরনো খবরের তত্ত্ব তল্লাশিও অব্যাহতই রাখলেন। জুলাইয়ের শেষের দিকে ব্রজেন্দ্রনাথ তার সহকর্মীকে জানালেন, বহরমপুরে ড. রামদাস সেনের পারিবারিক লাইব্রেরিতে একবার হানা দিতে হবে। তিনি তার পূর্বসুহূদ কবি শৌরীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্যের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, এ গ্রন্থাগারে পুরনো কাগজপত্র কিছু কিছু মিলতে পারে। তার সৌজন্যে দিনক্ষণ ঠিক হতে দেরি হলো না। যাওয়ার দিন শনিবার সকালে তিনি প্রবাসী অফিসে এসেই বাগলের হাতে ১০ গ্রেন কুইনাইন দিয়ে বললেন, মুর্শিদাবাদে বেজায় ম্যালেরিয়া, তাই অগ্রিম সতর্কতা প্রয়োজন। তিনি দুটি পিল গলাধঃকরণ করলেন এবং বাগল মশাইকেও অনুরূপ দুটি পিল তখনই গিলতে হলো। বাগল বাবু কিন্তু ম্যালেরিয়ার পিল সহজে হজম করতে পারেননি বলে খেদ করেছেন, আর করবেন না-ইবা কেন, বহরমপুর পৌঁছেই তার মাথা ঘোরা শুরু হয়ে গেল এবং কলকাতায় ফিরেও চার-পাঁচদিন মাথা ঘোরা কমল না। শিয়ালদা থেকে ট্রেনে চেপে রাতে বহরমপুর পৌঁছেছিলেন। পরদিন সকালে ব্রজেন্দ্রনাথ ও বাগলবাবু ড. রামদাস সেনের বাড়িতে গেলেন। ড. সেন গত যুগের বঙ্কিমমণ্ডলীর অন্তর্ভুক্ত এক প্রধান ব্যক্তিত্ব। তার গ্রন্থাগার অমূল্য বইপুস্তকে এবং পত্রপত্রিকায় সমৃদ্ধ। কবি শৌরীন্দ্রনাথ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি গ্রন্থাগারটি তন্ন তন্ন করে দেখলেন কিন্তু দুঃখের বিষয় লাইব্রেরি কক্ষে ইঁদুরের বড় উপদ্রব। আলমারির নিচের তাকে কয়েকখানি বই এমন তছনছ করে মুষিকপ্রবরেরা কেটেছে যে তা কাগজের স্তূপে পরিণত হয়েছে। পুরনো খবরের কাগজ কিছুই পাওয়া গেল না। তবে ওখানে সাময়িকপত্রাদি যা সংরক্ষিত ছিল, তা কাজে লাগবে বলে ব্রজেন্দ্রনাথ খুবই খুশি হয়েছিলেন।

কাশিমবাজারের মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর পারিবারিক গ্রন্থাগারটির দুরবস্থার কথাও কবি শৌরীন্দ্রনাথের মুখে শোনা, তবু সেখানে এখনো কোনো পুরনো খবরের কাগজ সংরক্ষিত আছে কিনা অনুসন্ধান করে জানাতে ব্রজেন্দ্রবাবু তাকে অনুরোধ করেন।

কবি শৌরীন্দ্রনাথ তার কথা রেখেছিলেন। তিনি খোঁজ করে ঈশ্বর গুপ্তের সংবাদ প্রভাকরের বাঁধানো ফাইল কাশিমবাজারের লাইব্রেরিতে পান এবং ব্রজেন্দ্রবাবুকে পত্র দিয়ে এ সুসংবাদ জানান। আরো লেখেন যে তিনি নিজের দায়িত্বে ওই ফাইল সগৃহে রেখেছেন। কোনো বিশ্বাসী লোক পেলে তার হাতে তিনি ওই ফাইল পাঠিয়ে দিতে পারেন। ব্রজেন্দ্রনাথ উত্তরে জানান যে তার সহকর্মী যোগেশচন্দ্র বাগল নির্দিষ্ট দিনে ওই ফাইল আনতে যাচ্ছেন। বহরমপুরের পরেই কাশিমবাজার, ট্রেন থেকে নেমেই কবি শৌরীন্দ্রনাথ বাগলবাবুর জন্য প্রতীক্ষারত। তিনি সাদরে বাগলবাবুকে গ্রহণ করলেন।

পরদিন সকালবেলা রাজাবাটিতে নিয়ে গেলেন, দোতলার গ্রন্থাগারটি তখন তালাবদ্ধ থাকায় বই দেখার সুযোগ হলো না। রাজা আশুতোষ রায়ের ভবনেও কবি বাগলবাবুকে নিয়ে যান। সেখানেও কয়েকখানা আলমারিতে সাজানো-গোছানো বেশ বইপত্র রয়েছে।

শৌরীন্দ্রনাথ কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি যেখানে ছিল, তা এবং সাহেব-মেমদের কবরস্থানও দেখালেন। বাগলবাবু একটি সমাধি দেখেন, যেটি ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রথম স্ত্রীর। তখন ওই স্থান এবং আশপাশের জায়গা আগাছায় পূর্ণ হয়ে গেছে। নিকটেই একটি প্রকাণ্ড বিল। ঘাটের কাছে গেলে শৌরীন্দ্রনাথ বললেন, এখানেই কুঠিয়ালদের জাহাজগুলো এসে নোঙর করত। বিল প্রায় ছয় মাইল লম্বা। আগে ভাগীরথী এখানেই বহতা ছিল। ওইদিনই যোগেশচন্দ্র বাগল সংবাদ প্রভাকরের ফাইল নিয়ে কলকাতায় ফেরেন।

এত ঘোরাঘুরি এবং তল্লাশির পরও কিন্তু প্রার্থিত বস্তু অর্থাৎ সমাচার দর্পণের প্রথমবারের ফাইল ১৮১৮-এর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তবে তাদের চেষ্টা একেবারে বিফলে যায়নি। সমাচার দর্পণের সমসাময়িক (১৮১৮-১৮৪০) খবরের কাগজ ‘সমাচার চন্দ্রিকা’, ‘সংবাদ প্রভাকর’ এবং ‘সংবাদ পূর্ণ চন্দ্রোদয়’, ‘সংবাদ সাধু রঞ্জন’ প্রভৃতি খবরের কাগজের কিছু কিছু সংখ্যা তারা উদ্ধার করতে পেরেছিলেন।

ব্রজেন্দ্রবাবুর কর্মস্থলের অর্থাৎ প্রবাসী অফিসের অতিনিকটেই ছিল সাহিত্য পরিষদ—বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান। তারা অনুমতি নিয়ে সেখানেও হানা দিলেন। পরিষদ তাদের সহায়তা দিতে কোনো কার্পণ্য করেনি।

ব্রজেন্দ্রবাবু পরিষদ মন্দিরে বসেই পুরনো খবরের কাগজ ঘাঁটতে শুরু করলেন। পরিষদের প্রধান কর্মচারী কামকমল সিংহ ব্রজেন্দ্রবাবুকে নিজ দায়িত্বে বুধবার বিকালে ব্রজেন্দ্রবাবুর অদেখা পুরনো কাগজপত্র কিছু কিছু বাড়ি নিয়ে যেতে দিতেন। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক কর্মবিরতি পরিষদ বন্ধ থাকে, ব্রজেন্দ্রবাবু পাঠাগার থেকে আনা কাগজ দেখে পরদিন ভোরেই আবার ফিরিয়ে দিতেন। পরে তিনি পরিষদের সভ্য হয়ে গেলেন।

আগেই বলা হয়েছে, বহু পত্রিকা ও নানা স্থানে ছোটাছুটির পরও সমাচার দর্পণের প্রথম বছরে ১৮১৮-১৮১৯ পুরো ফাইল পাওয়া সম্ভব হয়নি। রাধাকান্ত দেবের লাইব্রেরিতেও পাওয়া যায়নি। সৌভাগ্যের বিষয় পরিষদ লাইব্রেরিতেই সেই প্রথম বছরের পুরো ফাইলটি পাওয়া গেল।

আগেই বলা হয়েছে, ২৫ ডিসেম্বর ১৮৪১ সালে মার্শম্যানের সম্পাদনায় শ্রীরামপুর থেকে সমাচার দর্পণের প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। তবে শ্রীরামপুর মিশন প্রকাশনা বন্ধ করে দিলেও পরে বাঙ্গালিদের চেষ্টায় সমাচার দর্পণের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

দ্বিতীয় পর্যায়ের সমাচার দর্পণ ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় ১৮৪২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের সমাচার দর্পণের সম্পাদনা করেন ভূতপূর্ব ‘জ্ঞানদীপিকা’ সম্পাদক ভগবতীচরণ চট্টোপাধ্যায়। এ পর্যায়ের সমাচার দর্পণ অল্পদিন বেঁচে ছিল।

এরপর সমাচার দর্পণের তৃতীয় পর্যায় আবার শ্রীরামপুরের মিশনের শুরু হয়। এ পর্বের সমাচার দর্পণের প্রকাশকাল ৩ মে ১৮৫১। পত্রিকাটি দেড় বছর চালু থেকে ১২ এপ্রিল ১৮৫৩-এ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। ১২ এপ্রিল, ১৮৫৩ সালেসংবাদ প্রভাকর সমাচার দর্পণের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করে এভাবে:

‘অগ্রহায়ণ ১২৫৯...সমাচার দর্পণপত্র শ্রীরামপুরে গঙ্গার জলে প্রাণ ত্যাগ করে।

শেষে কয়েক কথায় যদি বলি, দীর্ঘদিন ধরে একটানা প্রকাশিত সমাচার দর্পণ উনিশ শতকের প্রথমার্ধের বাঙালির সুখ-দুঃখ, চিন্তা-ভাবনা, শিক্ষা-চেতনা নিয়ে যে বিশাল তথ্যভাণ্ডার রেখে গেছে তা এক কথায় সমসময়ের একটি অসাধারণ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ রত্নভাণ্ডার, যা আজও বাঙ্গলার সামাজিক ইতিহাস রচনার জন্য এক অমূল্য আকর হিসাবে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়ে বিরাজ করছে।’ গবেষকরা নিশ্চয়ই তা তুলে আনবেন।

 

ঋণ স্বীকার:

সংবাদপত্রে সেকালের কথা

প্রথম (১৮১৮-১৮৩০) ও ২য় খণ্ড (১৮৩০-১৮৪০) সংকলিত ও সম্পাদিত। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ সাময়িকপত্র (বিভিন্ন খণ্ড), ড. মুনতাসীর মামুন।

ইতিহাসের খেরোখাতা, ড. মুনতাসীর মামুন

সারস্বতকুঞ্জ বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্য, কেদারনাথ মজুমদার। নিমাইচন্দ্র পাল সম্পাদিত সন্দেশ/স্কুল সাপ্লাই কো. ঢাকা।

বঙ্গভূমি বাঙ্গালির ইতিহাস, ড. নীতিশ সেনগুপ্ত, দে’জ কলকাতা।

জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে, যোগেশচন্দ্র বাগল, দে’জ পাবলিশিং কলকাতা।

(সমাচার দর্পণ শুরু, শেষ... উদ্ধার  লেখাটি বণিকবার্তার সিল্করুটে ২১ জুন প্রকাশিত। - মুক্তবাক)




 আরও খবর