www.muktobak.com

মার্কেস স্মরণীয় হতে চেয়েছিলেন সাংবাদিক হিসেবে


 মনজুরুল হক, অন্য আলো, প্রথম আলো    ১৩ জুলাই ২০১৯, শনিবার, ১:২৮    আন্তর্জাতিক


জাদুবাস্তবতার সবচেয়ে সফল প্রয়োগ যাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে, তিনি হলেন কলম্বিয়ার নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস এক শ বছরের নিঃসঙ্গতায় (ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড) একটি ঘটনার অদ্ভুত এক বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে পিস্তলের গুলিতে নিহত এক ব্যক্তির দেহনিঃসরিত রক্তস্রোত পৌঁছে যায় চেনা সড়কের পথ ধরে নিজের বাসভবনে, আর ওই রক্তের উপস্থিতিই গৃহকর্তার কাছে পৌঁছে দেয় সেই মৃত্যুসংবাদ। বাস্তবে নয়, কল্পনাতেই এটা সম্ভব। পুরো উপন্যাসে এমন অসংখ্য বর্ণনার দেখা আমরা পাই, যেগুলো বাস্তবকে মিশিয়ে দিয়েছে বর্ণালি এক জগতের সঙ্গে, কল্পনা এখানে ডানা মেলে মিশে গেছে আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখের মধ্যে।

মার্কেসের এসব কল্পনার উৎস কী, তা নিয়ে সরাসরি কোনো কিছু জীবদ্দশায় বলে যাননি লেখক। জীবনের একেবারে শেষ দিকে তিনি আত্মজীবনী রচনায় হাত দিয়েছিলেন, যার প্রথম খণ্ড লিভিং টু টেল দ্য টেল (বেঁচে আছি গল্পটি বলব বলে) ছাপার মুখ দেখলেও এর পরবর্তী অংশ তিনি আর শুরু করতে পারেননি।

আত্মজীবনীর সেই প্রকাশিত প্রথম অংশে আদি পৈতৃক নিবাস বিক্রি করে দেওয়ার জন্য মায়ের সঙ্গে লেখকের গ্রামের বাড়ি আরাকাতাকা-যাত্রার যে উল্লেখ আছে, প্রকারান্তরে তা-ই বলে দেয় এক শ বছরের নিঃসঙ্গতার পরিচিত গ্রাম মাকোন্দোর কথা। সেই বিবরণ অবশ্য লেখালেখির জগতে কীভাবে তিনি প্রবেশ করেছিলেন, তার ইঙ্গিতও আমাদের দেয়। জানতে পারি, সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন লেখালেখির প্রতি মার্কেসের তখন পর্যন্ত সুপ্ত থেকে যাওয়া আকর্ষণকে আরও অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে সাংবাদিকতা থেকেই যে গল্পকথক মার্কেসের সূচনা, সে কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে না। আত্মজীবনীতে তিনি নিজেই বলেছেন দৈনিক পত্রিকা এল এসপেতাদোর–এ নিয়মিত সংবাদভাষ্য লিখে কতটা আনন্দে কাটছিল তাঁর যৌবনের দিনগুলো।

সম্ভবত যৌবনের সেই প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা সাংবাদিকতার দিনগুলোর কথা মনে করেই গার্সিয়া মার্কেস পেশা হিসেবে নিজেকে সব সময় লেখক নয়, বরং দেখেছেন সাংবাদিক হিসেবে। আর্থিক প্রাপ্তির দিক থেকে টানাটানির জীবন কাটাতে হলেও সাংবাদিকতা তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছে। বলা যায় প্রায় আজীবন তিনি কাজ করে গেছেন দৈনিক পত্রিকা কিংবা সাময়িকীতে। এর বাইরে বিভিন্ন সময় নিজেও আবার সরাসরি যুক্ত ছিলেন কয়েকটি সাময়িকীর প্রকাশনার সঙ্গে।

শেষ বয়সে মার্কেস এমন মন্তব্য করেছিলেন: ‘এক শ বছরের নিঃসঙ্গতার লেখক হিসেবে নয়, এমনকি সাহিত্যে নোবেলজয়ী হিসেবে নয়, বরং তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকতে চান একজন সাংবাদিক হিসেবে।’ সাংবাদিকতাকে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পেশা’ এবং সেই সঙ্গে ‘মানবতার জৈবিক এক প্রয়োজনীয়তা’ হিসেবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঔপন্যাসিক মার্কেস আমাদের কাছে যতটা পরিচিত, সাংবাদিক মার্কেস ঠিক ততটাই অপরিচয়ের। লাতিন আমেরিকার একটি দেশের সংবাদপত্রের সঙ্গে জীবনভর যুক্ত থাকা এবং বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় সেসব লেখা খুব একটা প্রকাশিত না হওয়াই হয়তো এর প্রধান কারণ। আবার সাংবাদিক-গদ্যগুলো যেহেতু বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সীমিত গণ্ডির এবং কেবল সুনির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্যই কেবল প্রাসঙ্গিক, ফলে এসব রচনা নিয়ে বিদেশিদের মধ্যে সেভাবে আগ্রহ না থাকাই স্বাভাবিক। সম্ভবত এ জন্যই বেশির ভাগ সময় তা অনুবাদের বাইরে থেকে যায়। মার্কেসের সাংবাদিকতার লেখার বেলায়ও যে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি সেটা বলাই যায়, যদিও তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত অন্তত তিনটি গ্রন্থে সাংবাদিক মার্কেসের পরিচয় খুব সহজেই পেয়ে যাই আমরা।

সেই তিন বইয়ের প্রথমটি হচ্ছে এক জাহাজডুবি নাবিকের গল্প (দ্য স্টোরি অব এ শিপ রেক্টড সেইলর)। যে বইয়ের কাহিনির সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, জাহাজডুবির পর প্রাণে বেঁচে যাওয়া নৌবাহিনীর এক নাবিকের সাক্ষাৎকার সাংবাদিক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন মার্কেস। মূল স্প্যানিশ ভাষায় বেশ আগে বইটি প্রকাশিত হলেও এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে।

এর এক বছর পর চিলিতে পিনোশের সামরিক শাসনের প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা আমরা পাই তাঁর চিলিতে গোপনে (ক্ল্যান্ডেস্টাইন ইন চিলি) শিরোনামের বইয়ে। চলচ্চিত্র নির্মাতা মিগুয়ে লিতিন বইটির প্রধান চরিত্র। এর ঠিক দশ বছর পর প্রকাশিত হয় সাংবাদিকতার ওপর ভিত্তি করে লেখা মার্কেসের তৃতীয় বই একটি অপহরণ সংবাদ (নিউজ অব আ কিডন্যাপিং)। মেদেইনের মাদকচক্রকে নিয়ে লেখা হয়েছে বইটি। ফলে মার্কেস যে কেবল উপন্যাস রচনায় নিয়োজিত থেকে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে দাবি করেছেন, মোটেই তা নয়। দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। এতটাই জড়িত ছিলেন যে ১৯৭০-এর দশকের শেষে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো নয়া বিশ্বের তথ্য ব্যবস্থার সম্ভাবনা পরীক্ষা করে দেখার জন্য আয়ারল্যান্ডের রাজনীতিবিদ শন ম্যাকব্রাইডের নেতৃত্বে যে কমিশন গঠন করেছিল, সেখানে একজন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন মার্কেস।

২০১৪ সালে এ সাহিত্যিকের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ইংরেজি ভাষার পাঠকেরা এবার প্রথমবারের মতো সুযোগ পাচ্ছেন তাঁর সাংবাদিকতা-সংশ্লিষ্ট বাছাই কিছু রচনা পাঠের। যুক্তরাষ্ট্রের নামী প্রকাশনা কোম্পানি আলফ্রেড কনফ গেল মে মাসে বাজারে এনেছে দ্য স্ক্যান্ডাল অব দ্য সেঞ্চুরি অ্যান্ড আদার রাইটিংস নামের সেই বই। বইটির ইংরেজি অনুবাদক অ্যান ম্যাকলিন।

১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে লেখা মার্কেসের কলাম, প্রতিবেদন ও অন্যান্য রচনার নির্বাচিত এক সংকলন হলো এই বই।

মার্কেসের উপন্যাসে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে তাঁর স্বদেশ কলম্বিয়া। সাংবাদিকতায় থাকা অবস্থায় লেখা তাঁর অধিকাংশ রচনার কেন্দ্রেও রয়েছে নিজের দেশ। তবে বিস্তৃতির দিক থেকে আলোচ্য বইটির পরিমণ্ডল আরও খানিকটা সম্প্রসারিত। নিকারাগুয়ার বিপ্লবে সান্দানিস্তা গেরিলা যোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ অবরোধের বর্ণনার পাশাপাশি বিমানভ্রমণ নিয়ে লেখকের মনে সব সময় দেখা দেওয়া আতঙ্কের কথাও পাঠক এর মধ্য দিয়ে জেনে নিতে পারবেন। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানকালে সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে দেওয়া মার্কেসের বর্ণনার মধ্যেও তাঁরা পেতে পারেন চমকের দেখা। খুব সহজ ভাষায় লেখকদের আর্থিক সংকটের বর্ণনা দিতে গিয়ে মার্কেস এখানে যেমন বলেছেন, শ্রেষ্ঠ লেখক হলেন তাঁরাই, যাঁরা লেখেন কম আর ধূমপান করেন অনেক বেশি। ফলে এটা খুবই স্বাভাবিক যে ২০০ পৃষ্ঠার একটি বই লিখতে তাঁদের দরকার হয় কম করে হলেও ২৯ হাজার সিগারেট। তাই অঙ্কের হিসাবে এর অর্থ হলো—ধূমপানে তাঁরা যে অর্থ ব্যয় করছেন, এর পরিমাণ বই লিখে যে অর্থ তাঁরা উপার্জন করবেন, তার চেয়ে বেশি।

মার্কেসের সাংবাদিকতা কেবল লেখালেখির মধ্যেই সীমিত থাকেনি। ইউনেসকোর ম্যাকব্রাইড কমিশনে তাঁর অন্তর্ভুক্তির কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালে লাতিন আমেরিকার নব্য সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করতে কলম্বিয়ার কার্তাগেনায় যে ফাউন্ডেশন তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তা এখনো সক্রিয় আছে। ফলে নানা দিক থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন এই লেখক।

এবার দেখা যাক, কী আছে মার্কেসের দ্য স্ক্যান্ডাল অব দ্য সেঞ্চুরি অ্যান্ড আদার রাইটিংস-এ। বইটি শুরু হয়েছে ১৯৫০ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি নিবন্ধ দিয়ে, যেখানে তিনি কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতির নাপিত বা ক্ষৌরকারের কথা বলতে গিয়ে কিছুটা হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে পাঠকদের শুনিয়েছেন তাঁর নিজের কল্পনায় দেখা সেই নাপিতের জীবনের একটি আকাঙ্ক্ষা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেই কথা। চলমান সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে মার্কেসের গভীর দূরদৃষ্টির দেখা সহজেই মেলে এই নিবন্ধের একেবারে শেষ বাক্যে এসে। মার্কেস কল্পনায় দেখছেন প্রেসিডেন্টের সেই ক্ষৌরকার, যে কিনা প্রতিদিন প্রেসিডেন্টের গলা ঘেঁষে ক্ষুরের ছোঁয়া বুলিয়ে দেয়, তার নিজের প্রেসিডেন্টের আসনে বসার সুযোগ হলে সেই ব্যক্তি কী করতেন? মার্কেস বলছেন, টেলিফোন অপারেটরকে অন্য প্রান্তে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার যে আদেশ হয়তো তিনি দিতেন, সেটা এমন শোনাতে পারত: ‘অপারেটর, জনমতের সঙ্গে আমাকে লাগিয়ে দিন তো।’

সাংবাদিকদের যে কখনো কখনো লেখার বিষয়বস্তু খুঁজে পেতে রীতিমতো দুশ্চিন্তায় ভুগতে হয়, মার্কেস নিজেও তা থেকে মুক্ত ছিলেন না। এ বিষয়টি বোঝা যায় তাঁর ‘চলমান বিষয়বস্তুর বিষয়’ শিরোনামের লেখায়। যেকোনো বিষয় নিয়ে লেখা শুরু করতে পারাকে তাঁর কাছে কঠিন কাজ বলেই মনে হয়েছে সব সময়। বিষয়বস্তু খুঁজে পাওয়ার অভাবকে সাংবাদিকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হলেও শেষ পর্যন্ত সংবাদপত্রে লেখার কোনো কমতি থাকে না। একেবারে কোনো কিছু যেখানে নেই, তাকেও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থিত করতে পারার মধ্যে সাংবাদিক হিসেবে সফল হতে পারার ইঙ্গিত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে তিনি বলেছেন, ‘এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা বিষয়বস্তুর অভাবকেই সাংবাদিকের জন্য আকর্ষণীয় বিষয়ে পরিণত করে নিতে পারেন।’ এই যে আমরা প্রতিদিনের সংবাদপত্রে নিয়মিতভাবে এ রকম খবরের মুখোমুখি হচ্ছি, সেই বর্ণনা দেওয়ার জন্য তিনি বিশেষ একটি দিনের দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন খবরের উল্লেখ করেছেন, এসবের মধ্যে ব্রাজিলের কফি-সংকট থেকে শুরু করে স্পেনের একনায়ক ফ্রাঙ্কোর কন্যার বিয়ের খবরও আছে। তবে এখানেও মার্কেসের লেখকসুলভ সূক্ষ্ম কৌতুকবোধের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যখন তিনি আমাদের জানিয়ে দেন যে স্পেনে জেনারেলিসমো ফ্রাঙ্কোর হবু জামাতাকে ইতিমধ্যে সান-ইন লসমো হিসেবে কেউ কেউ ডাকতে শুরু করেছেন।

আর সম্পাদকীয় নিবন্ধের বেলায় মার্কেসের মন্তব্য খুবই খোলামেলা, ‘সম্পাদকীয় পড়ুন। প্রতিটি বিশেষণে দেখবেন অদম্য সেন্সরের বলিষ্ঠ উপস্থিতির ছাপ। ফলে কী আর করা? কমিকসের দিকেই শেষ পর্যন্ত নজর দিতে হয়।’

সাংবাদিকতায় তিনি যে সব সময় কেবল সমকালীন অপ্রীতিকর ঘটনাবলির দিকে আলোকপাত করে লেখালেখি করেছেন, তা নয়। এমনকি পরবর্তী জীবনে লেখা তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসের প্লটও আগাম জায়গা করে নিতে পেরেছে সেখানে। যেমন, ১৯৫৪-তে লেখা ‘বেন্দিয়াদের বাড়ি’ প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো মার্কেসকে দেখা যায় এক শ বছরের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসের প্লট খুঁজে পাওয়ায় নিয়োজিত থাকতে। ওই প্রতিবেদনকে একই সঙ্গে একটি উপন্যাসের জন্য লেখা সংক্ষিপ্ত নোট হিসেবেও তিনি উল্লেখ করেছেন। সেখানে আছেন কলম্বিয়ার বিপ্লবে যোগ দিয়ে ঘরে ফিরে আসা কর্নেল আরেলিয়ানো বেন্দিয়া, কর্নেলের স্ত্রী দোনা সোলেদাদ এবং পরিচিত সেই বাড়ি। ফলে বিশ্বখ্যাত এ উপন্যাসের কাহিনি যে অনেক দিন থেকেই মার্কেসকে আলোড়িত করে চলছিল, তাঁর সাংবাদিক গদ্যের মধ্যেও উঠে এসেছে তার বর্ণনা।

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে মার্কেস সক্রিয় সাংবাদিকতা থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলেও এ পেশার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনোই ছিন্ন হয়নি। নিয়মিতভাবে লিখে যাওয়ার বদলে বরং নিজের পছন্দের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এরপর থেকে অনিয়মিতভাবে কলাম লিখে গেছেন তিনি।

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে তাঁর যে দুটি লেখা অনেকের নজর কেড়েছে, সেগুলো ছিল ভেনেজুয়েলার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ ও কলম্বীয় বংশোদ্ভূত পপতারকা শাকিরাকে নিয়ে। শাকিরার পৈতৃক নিবাস একসময় ছিল বারাঙ্কিলায়, কলম্বিয়ার যে শহরে মার্কেস কাটিয়েছেন জীবনের বড় একটি সময়।

মার্কেসের সাংবাদিকতায় বিপ্লব-পরবর্তী কিউবার প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে এসেছে বারবার। এর কারণ যতটা না আদর্শগত দিক থেকে কিউবার বিপ্লবী চেতনার সঙ্গে তাঁর নিজের সম্পৃক্ত থাকা, এর চেয়ে বেশি হলো সাংবাদিকতার সূত্রে ফিদেল কাস্ত্রোসহ কিউবার বিপ্লবীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা তাঁর গভীর বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল মার্কেসের প্রথম কিউবা সফর থেকেই।

ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবার বিপ্লবীরা ফুলগেন্সিও বাতিস্তার সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের দুই সপ্তাহ পর ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে সে দেশে গিয়েছিলেন মার্কেস। বিপ্লবের ঠিক পরপর বার্বুদোস নামে পরিচিত হয়ে ওঠা শ্মশ্রুধারী তরুণ বিপ্লবীদের একটি দল জরাজীর্ণ এক বিমানে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে পৌঁছায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সেখান থেকে বিদেশি কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে এসে বিপ্লব-পরবর্তী কিউবার পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি পরিচয় করানো। মার্কেস ছিলেন সেই সাংবাদিকদের দলের একজন। পুরোনো ওই বিমানটি হাভানায় পৌঁছানোর পর সেখান থেকে প্রথম যে প্রতিবেদনটি তিনি পাঠান, তার শিরোনাম ছিল ‘শিরোনাম আমি ভেবে পাচ্ছি না’। ওই প্রতিবেদনে প্যারিসের লাতিন কোয়ার্টারে কিউবার কবি নিকোলাস গিয়েনের সঙ্গে কয়েক বছর আগের এক আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে মার্কেস লিখেছেন: ‘এমনকি প্যারিসের শীতকালের কঠিন সময়েও গিয়েন মোরগের ডাকে খুব সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠে কফির কাপে চুমুক দিয়ে পত্রিকার পাতায় চোখ বোলানোর অভ্যাস ধরে রেখেছিলেন (যদিও প্যারিসে কোনো মোরগ ছিল না)...এরপর নিজের শহর কামাগুয়েতে যেমনটা তিনি করতেন, ঠিক সেভাবে ব্যালকনির জানালা খুলে লাতিন আমেরিকা-সংক্রান্ত সব কটি খবর কিউবার কথ্য ভাষায় অনুবাদ করে চিৎকার করে পড়তে পড়তে পাড়ার অন্যদের ঘুম ভাঙিয়ে দিতেন। ...তবে একদিন সকালে জানালা খুলে একটিমাত্র সংবাদ চিৎকার করে বলে যাচ্ছিলেন তিনি—“সেই মানুষটি মারা গেছেন!”

‘কে মারা গেলেন, তা নিয়ে ঘুমন্ত পাড়ায় হঠাৎ কেমন একটা উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। আর্জেন্টাইনরা ভেবেছিল, সেই ব্যক্তি হলেন হুয়ান দোমিঙ্গো পেরোন; প্যারাগুয়ের মানুষ ভেবেছিল, তিনি আলফ্রেদো স্ট্রয়েসনার; গুয়াতেমালানরা ভেবেছিল, কাস্তিলো আরমাস; ডোমিনিকানরা মনে করেছিল, রাফায়েল লিওনিদাস ত্রুহিলো; আর কিউবানরা ভেবেছিল, ফুলগেন্সিও বাতিস্তা। আসলে তিনি ছিলেন পেরোন। পরে এ নিয়ে কথা বলার সময় কিউবার নিদারুণ দৈন্যদশার বর্ণনা আমাদের কাছে দিয়েছিলেন গিয়েন। সবশেষে তিনি বলেছিলেন, “ভবিষ্যতের জন্য একমাত্র ভালো যা আমি দেখছি, তা হলো মেক্সিকোতে অনেক কিছু করে যাওয়া সেই যুবক।” এরপর ভবিষ্যদ্রষ্টার মতো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বক্তব্য শেষ করেন এই কথা বলে—“সেই যুবকের নাম ফিদেল কাস্ত্রো!”’

সেই প্রথম ফিদেল কাস্ত্রোর নাম শুনেছিলেন মার্কেস। আর ওই ফিদেলের নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া বিপ্লবের সূচনালগ্নে নিজের হাভানায় পৌঁছে যাওয়ার বর্ণনা তিনি দিয়েছিলেন এভাবে: ‘দুপুরের আগেই আমাদের বিমান নেমে আসে হাভানার সবচেয়ে ধনী মানুষদের ব্যাবিলনীয় সব প্রাসাদকে চারদিকে রেখে দাঁড়িয়ে থাকা কাম্পো কলুম্বিয়া বিমানবন্দরে, যে বিমানবন্দর এর মধ্যেই পেয়েছে এক নতুন নাম—সিউদাদ লিবেরতাদ। মাত্র কয়েক দিন আগে যেখানে ছিল বাতিস্তার শক্ত দুর্গ, কামিলো সিয়েনফুয়েগোস সেখানে এখন তাঁর বিস্ময়ভরা চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখা বিপ্লবী কৃষক যোদ্ধাদের ঘাঁটি গড়ে নিয়েছেন। আমাদের প্রথম অনুভূতি ছিল যেন অনেকটা কৌতুককর, কেননা সাবেক সামরিক বিমানবাহিনীর যে সদস্যরা সেখানে আমাদের স্বাগত জানান, একেবারে শেষ মুহূর্তে তাঁরা বিপ্লবীদের পক্ষে যোগ দিয়েছেন এবং নিজেদের ব্যারাকে বসবাসরত অবস্থায় ইতিমধ্যে তাঁরা নিজেদের যেন বিপ্লবীদের মতো দেখা যায় সে জন্য শ্মশ্রুধারী হতে শুরু করেছেন।’

সেই প্রথম কিউবাভ্রমণ থেকে ফিদেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে মার্কেসের, যা অটুট ছিল তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত।

 প্রথমবার ভ্রমণের পর বারবার মার্কেস গেছেন বিপ্লবী কিউবায়। কাছের কিছু মানুষের অপছন্দ সত্ত্বেও কিউবা আর ফিদেলের সমর্থনে অনবরত ধরেছেন কলম। যেমন, ‘অবরোধের মোকাবিলা করছেন কিউবার জনগণ’ শিরোনামে এক সাংবাদিক-গদ্যে কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে তিনি লিখেছিলেন: ‘অবরোধ যখন শুরু হয় সেই প্রথম রাতে কিউবায় ছিল ৪ লাখ ৮২ হাজার ৫৬০টি মোটরগাড়ি, ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৩০০টি ফ্রিজ, ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৭০০টি রেডিও, ৩ লাখ ৩ হাজার ৫০০টি টেলিভিশন, ৩ লাখ ৫২ হাজার ৯০০টি বৈদ্যুতিক ইস্তিরি, ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০০টি ফ্যান, ৪১ হাজার ৮০০ ওয়াশিং মেশিন, ৩৫ লাখ ১০ হাজার হাতঘড়ি, ৬৩টি লোকোমোটিভ বা রেল ইঞ্জিন এবং ১২টি বাণিজ্যিক জাহাজ। এর মধ্যে কেবল সুইজারল্যান্ডে তৈরি ঘড়ি ছাড়া বাদবাকি সবকিছু ছিল আমেরিকায় তৈরি।

‘মনে হয় এসব প্রাণঘাতী সংখ্যা নিজেদের জীবনে কোন অর্থ বহন করবে, তা বুঝে ওঠার জন্য কিছুটা সময় কিউবার লোকজনের লাগবে। উৎপাদনের দৃষ্টিকোণ থেকে কিউবা দ্রুতই বুঝে উঠতে পারবে যে ভিন্ন কোনো অস্তিত্বের দেশ সেটি ছিল না, বরং দেশটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ।’

মার্কেস এভাবে একের পর এক সাংবাদিক হিসেবে লিখেছেন নানা রকম লেখা। সেই লেখাগুলো সংকলিত হয়ে আছে সদ্য প্রকাশিত দ্য স্ক্যান্ডাল অব দ্য সেঞ্চুরি অ্যান্ড আদার রাইটিংস বইয়ে। ফলে দেরিতে হলেও এ বইটি লেখক মার্কেসের পাশাপাশি সাংবাদিক মার্কেসকে আরও ভালোভাবে জানার সুযোগ করে দেবে।

প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকী অন্য আলোতে মার্কেস স্মরণীয় হতে চেয়েছিলেন সাংবাদিক হিসেবে লেখাটি ২৮ জুন প্রকাশিত। - মুক্তবাক




 আরও খবর