www.muktobak.com

বরিস জনসন: সাংবাদিকতা থেকে ডাউনিং স্ট্রিটে


 মীর মোশাররফ হোসেন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম    ২৫ জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ১০:৫৯    আন্তর্জাতিক


দেড় যুগের সাংবাদিকতা আর রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চলেছেন বরিস জনসন। ঘনিষ্ঠ মিত্রদের বিশ্বাসঘাতকতায় মাত্র কয়েক বছর আগেও যার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ দেখা যাচ্ছিল, যার উল্টোপাল্টা মন্তব্য অনেকবারই কনজারভেটিভ নেতৃত্বকে বিব্রত করেছে, অবশেষে সেই জনসনই যাচ্ছেন ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে।

মঙ্গলবার ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি তাদের নতুন প্রধান হিসেবে ৫৫ বছর বয়সী সাবেক এ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করে। ব্রেক্সিট নিয়ে বেহাল দশায় জুনে টেরিজা মে ক্ষমতাসীন টোরি দলের নেতৃত্ব ও প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর কয়েক সপ্তাহের নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে জনসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্টের সঙ্গে। তবে দলের নিবন্ধিত কর্মী-সমর্থকরা শেষ পর্যন্ত লন্ডনের সাবেক মেয়রকেই বেছে নিয়েছেন।

বরিস জনসনের জন্ম পরিচয়

পিতৃকূলের দিক থেকে জনসনের আছে একইসঙ্গে ব্রিটিশ ও তুর্কি উত্তরাধিকার। তার দাদার বাবা আলি কামাল ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। উদারপন্থি এ সাংবাদিক সুলতানের গ্র্যান্ড ভিজার (প্রধানমন্ত্রী) দামাত ফরিদ পাশার মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

জনসনের দাদার নানি মেরি লুই দে পিফেল ছিলেন উর্তেমবার্গের যুবরাজ পলের বংশধর; সেই সূত্রে গ্রেট ব্রিটেনের রাজা জেমস ওয়ান ও রাজা জর্জ টু-রও বংশধর। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সাবেক কনজারভেটিভ সাংসদ স্ট্যানলি জনসন ও তার প্রথম স্ত্রী চিত্রকর শার্লট ফসেটের সন্তান আলেক্সান্ডার বরিস দে পিফেল জনসনের জন্ম ১৯৬৪ সালের জুনে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে। রাজনীতিতে আসার আগে স্ট্যানলি বিশ্ব ব্যাংক ও ইউরোপিয়ান কমিশনে কর্মরত ছিলেন।

জনসনের নানা স্যার জেমস ফসেট ইউরোপিয়ান মানবাধিকার কমিশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় জনসনের শৈশব কেটেছে নিউ ইয়র্ক, লন্ডন ও ব্রাসেলসে। বধির ছিলেন তিনি। যে কারণে শৈশবেই তাকে বেশ কয়েকবার অপারেশনের টেবিলে যেতে হয়েছিল; জনসন সেসময় তুলনামূলক চুপচাপ ছিলেন বলে তার আত্মীয়স্বজন জানিয়েছে।

কিং স্কলারশিপে বার্কশায়ারের ইটন কলেজে পড়ার পর অক্সফোর্ডের বেলিওল কলেজে ক্ল্যাসিকসে ডিগ্রি নেন জনসন। তিনি বিতর্ক সংগঠন অক্সফোর্ড ইউনিয়নেরও প্রেসিডেন্ট ছিলেন; ছিলেন বুলিনডং ক্লাবের সদস্য, যেখানে তার সঙ্গী ছিলেন ডেভিড ক্যামেরনও।

সাংবাদিকতা ও রাজনীতি ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর জনসনের সাংবাদিকজীবন শুরু হয়। ১৯৮৭ সালে টাইমসে প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর একজনের উদ্ধৃতি জাল করায় চাকরি হারাতে হয় তাকে। ডেইলি টেলিগ্রাফে জনসন ইউরোপ বিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন ৫ বছর। পরে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত তিনি একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৪ সাল থেকেই জনসন ম্যাগাজিন দ্য স্পেকটেটরে রাজনৈতিক কলাম লেখা শুরু করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি ম্যগাজিনটির সম্পাদক হন; ২০০৫ পর্যন্ত তিনি এ পদেই ছিলেন। টেলিগ্রাফে থাকার সময় ১৯৯৭ সালে ক্লয়েড সাউথ এলাকা থেকে হাউস অব কমন্সে নির্বাচন করেন জনসন। সেবার লেবার পার্টির মার্টিন জোন্সের সঙ্গে জিততে পারেননি। সাংবাদিক হিসেবে সুপরিচিত জনসনকে ১৯৯৮ সাল থেকে বিবিসির হ্যাভ আই গট নিউজ ফর ইউসহ টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা যেতে থাকে।

২০০১ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে হেনলি অন টেমস আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন এ কনজারভেটিভ সদস্য। টেলিভিশন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সুপরিচিত হলেও জনসনের রাজনৈতিক উত্থান মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। স্পেকটেটরের একটি সম্পাদকীয় প্রকাশের জেরে তাকে লিভারপুল সিটির কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল; এক সাংবাদিকের সঙ্গে প্রেমের গুঞ্জনে ছায়া শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকেও তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। অবশ্য এর কোনোটিই ২০০৫ এর নির্বাচনে তার ফের জয়ী হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

দুই বছর পর লন্ডনের মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জনসন। অপরাধ দূর ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আস্থা জিতে নেন ভোটারদের। সেবার লেবারের কেন লিভিংস্টোনকে সামান্য ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যের রাজধানী জয় করে রক্ষণশীলদের মুখে হাসি এনে দিয়েছিলেন। ২০১২ সালের নির্বাচনে ফের লিভিংস্টোনকে হারিয়ে দলকে দিয়েছিলেন স্বস্তি; মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে ৮০০-র বেশি আসন হারিয়ে কনজারভেটিভ পার্টি তখন হাঁসফাঁস করছিল।

২০০৭ সালে মেয়র নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগেই সংসদ সদস্যপদ ছেড়ে দিয়েছিলেন; আট বছর পর, ২০১৫ সালে পশ্চিম লন্ডনের উক্সব্রিজ অ্যান্ড সাউথ রুইস্লিপ আসনে জয়ী হয়ে ফের পার্লামেন্টে ঢোকেন জনসন। ১৯৯০ এর পর সেবারই কনজারভেটিভ পার্টি যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতাগ্রহণ করেছিল। দুই মেয়াদের পর আর মেয়র নির্বাচনে দাঁড়াননি জনসন; তার বদলে থাকা কনজারভেটিভ প্রার্থীকে সহজেই হারিয়ে রাজধানী ফের বগলদাবা করে লেবাররা; মেয়র হন সাদিক খান।

যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কিনা, তা নিয়ে গণভোটের প্রচারে জনসনকে দেখা যায় ব্রেক্সিটপন্থিদের অন্যতম প্রভাবশালী মুখপাত্র হয়ে উঠতে। ইউরোপকে এক করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেষ্টাকে নেপোলিওন ও অ্যাডলফ হিটলারের চেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেও বেশ সমালোচিত হন তিনি। ২০১৬-র ২৩ জুনের গণভোটে ৫২ শতাংশ ভোটার ব্রেক্সিটের পক্ষে মত দিলে, ডেভিড ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেন।

অনেকেই তখন জনসনকেই নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখলেও তৎকালীন বিচারমন্ত্রী মাইকেল গোভসহ ঘনিষ্ঠ অনেকেই লন্ডনের সাবেক এ মেয়রের পাশ থেকে সরে যান। জনসন সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না এবং ব্রেক্সিট সম্পন্নে কাজ করতে পারবেন না- এমন মন্তব্য করে গোভ নিজেই নিজের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।

ঘনিষ্ঠ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী সাংসদও গোভকে সমর্থন দিলে শেষ পর্যায়ে প্রার্থীতাই প্রত্যাহার করে নেন জনসন। পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ এবং রাজনীতিতে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা ক্যামেরন, জনসন ও গোভের একে অপরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার এ চিত্রকে সেসময় শেকসপিয়ারের কাহিনীর সঙ্গে তুলনা দিয়েছিল ব্রিটিশ গণমাধ্যম।

টেরিজা মে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর জনসন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১৭ সালের জুনে আগাম নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর কনজারভেটিভ নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু সরকারের নতুন মন্ত্রিসভায়ও জনসনের পদ বহাল থাকে। 

পারিবারিক জীবন ও লেখালেখি

দুই ছেলে ও দুই মেয়ের বাবা জনসন প্রথমে ১৯৮৭ সালে অ্যালেগ্রা মস্টিন ওয়েনকে বিয়ে করলেও তাদের সংসার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৯৩ সালে জনসন আইনজীবী মেরিনা-হুইলারের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। জনসনের ৪ সন্তানের মা-ই মেরিনা। দুই যুগ পর গত বছর এ দম্পতি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। প্রবন্ধ সংকলন লেন্ড মি ইউর ইয়ারস ছাড়াও জনসন উপন্যাস সেভেন্টি টু ভার্জিনসও রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে দ্য ড্রিম অব রোম লিখেছেন। ২০১৪ সালে ঝুলিতে যুক্ত করেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে নিয়ে লেখা দ্য চার্চিল ফ্যাক্টর: হাউ ওয়ান ম্যান মেইড হিস্টরি বইটিও।

সূত্র: ব্রিটানিকা ডটকম।

বরিস জনসন: সাংবাদিকতা থেকে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রতিবেদনটি বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর থেকে নেয়া। - মুক্তবাক




 আরও খবর