www.muktobak.com

তথ্য জানানোর স্বাধীনতা


 আসিফ নজরুল    ৩০ জুলাই ২০১৯, মঙ্গলবার, ৩:২৯    মতামত


আমরা কিছু হলে অমর্ত্য সেনের উদাহরণ দিতে পছন্দ করি। তার কথা উদ্ধৃত করে এটা বলতে আরও পছন্দ করি যে, গণতন্ত্র বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা থাকলে একটা দেশে দুর্ভিক্ষ থাকতে পারে না। আসলে এ ধরনের কথা আরও বহু আগে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। কয়েক শত বছর আগে থেকে এই ধারণা উন্নত সমাজে ক্রমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, অর্থনৈতিক অধিকারগুলো (যেমন অনাহারে না থাকার অধিকার) তখনই সুরক্ষিত হয় যদি রাজনৈতিক অধিকারগুলো (যেমন : বাকস্বাধীনতা) সমাজে সুনিশ্চিত হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণা আলোচনাকালেও অভাবমুক্ত (ফ্রিডম ফ্রম ওয়ান্ট) থাকার স্বাধীনতার সঙ্গে নির্ভয়ে থাকার স্বাধীনতার (ফ্রিডম ফ্রম ফিয়ার) সম্পর্ক জোরালোভাবে আলোচিত হয়েছে।

একটি সমাজে মানুষ নির্ভয়ে আছে কিনা তা সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় বাকস্বাধীনতা চর্চার মাধ্যমে। বাকস্বাধীনতার কিছু অনিবার্য অনুষঙ্গ রয়েছে। যেমন প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা, তথ্য জানানোর স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ইত্যাদি। এসব স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যেই। কারণ যারা বাকস্বাধীনতার চর্চা করেন, তা অনেকটা অর্থহীন হয়ে পড়ে সংবাদপত্র যদি তা জনগণকে জানাতে না পারে। সংবাদপত্রকে যদি সরকারের ফরমায়েসী সংবাদ বা নিষেধাজ্ঞা মেনে কাজ করতে হয়।

বিষয়টি আমাদের বেশি করে নজরে আসে জেনারেল এরশাদের আমলে। তখন সারা দেশ আন্দোলনে মুখর থাকলেও বিটিভি দেখে তা একদম বোঝা যেত না, বোঝা যেত না সরকারি বেতারের সংবাদ শুনলেও। বিটিভির তখন নাম দেওয়া হয়েছিল সাহেব বিবি গোলাম! অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি পরে। তবে বেসরকারি রেডিও-টিভি চ্যানেল আসাতে বিটিভি বা বাংলাদেশ বেতারের খবর নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাতে হয়নি পরে তেমন।

 

কিন্তু তারপরও তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর আমলে গণমাধ্যমের ওপর বিভিন্নভাবে আঘাত এসেছে। আগের বিএনপি আমলে একুশে টিভি বন্ধ করার মাধ্যমে এর সূচনা ঘটে। বর্তমান সরকারের আমলে আরও খেলো অজুহাতে গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ নতুন কিছু আইনের কারণে বেসরকারি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আরও বড় চ্যলেঞ্জের সামনে এসে পড়েছে।

২.

আমাদের সংবিধান অনুসারে, বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা- এসব অধিকারকে সীমিত করা যায় কেবল সুনির্দিষ্ট আইনে। এসব অধিকারকে সীমিত করতে হলে সেই সীমিতকরণ যুক্তিসংগত হতে হবে, তা আইনের বিধান অনুসারে করতে হবে, সেই আইনটি সংবিধানে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট কারণে (যেমন : জনস্বার্থ, জনস্বাস্থ্য, শান্তিশৃঙ্ঘলা রক্ষা ইত্যাদি) প্রণীত হতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রুদ্ধ করার জন্য আমাদের দেশে বিশেষ ক্ষমতা আইন, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টস, ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশনসহ নানা আইনেও এমন কিছু বিধান রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে প্রণীত এসব আইন কলোনিয়াল শাসকদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত বলে বাংলাদেশে কখনো এসবের প্রয়োগকে ভালো চোখে দেখা হয়নি। সাম্প্রতিককালে সরকার গণমাধ্যম বন্ধ করতে গিয়ে এমনকি এসব আইনের আশ্রয় পর্যন্ত নেয়নি, বন্ধ করা হয়েছে আরও অগণতান্ত্রিকভাবে অর্থাৎ ব্যক্তিবিশেষের মৌখিক নির্দেশে।

যেমন বছর পাঁচেক আগে দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করার সময় আমাদের তথ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে, এগুলো বন্ধ করা হয়েছে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডব ও ধ্বংসযজ্ঞ চলাকালে তা উসকানিমূলকভাবে সম্প্রচার করার জন্য। তিনি জানিয়েছেন যে, টিভি দুটোর প্রতি প্রদত্ত কারণ দর্শাও নোটিসের উত্তর সন্তোষজনক হলে তারা আবার সম্প্রচারে যেতে পারবে। তার এ বক্তব্য ছিল অস্বচ্ছ ও স্ববিরোধিতাপূর্ণ। কোনো সম্প্রচার উসকানিমূলক কিনা তা পরীক্ষা করার কি মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া মন্ত্রণালয়ের রয়েছে? মন্ত্রণালয়ের কারা, কোনো আইনসম্মত কর্তৃত্বে সম্প্রচার উসকানিমূলক বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এটিও স্পষ্ট করে বলা হয়নি। নোটিসের উত্তর সন্তোষজনক হলে টিভি দুটো আবার সম্প্রচারে যেতে পারবে বলা হয়েছিল। কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনাই যদি ছিল তাহলে উত্তর পাওয়ার আগে বা টিভি দুটোর কোনো বক্তব্য না শুনেই সম্প্রচার কেন বন্ধ করা হয়েছিল? গত পাঁচ বছরে এ বিষয়টি সুরাহা এখনো হয়নি কেন তার কোনো জবাবও পাওয়া যায়নি কোথাও থেকে।

বর্তমান সরকার আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনাও বন্ধ করেছিল অনেকটা স্বেচ্ছাচারমূলকভাবে। সার্চ ওয়ারেন্টের নামে ছাপাখানায় অনির্দিষ্টকালের জন্য তালা দেওয়া এবং অন্য ছাপাখানা থেকে আমার দেশ বের করতে হলে সরকারের পূর্ব-অনুমতি লাগবে বলে যে কথা বলা হয়েছিল তার কোন আইনগত ভিত্তি ছিল না। এ পত্রিকাটিও আজও আলোর মুখ দেখেনি বন্ধ হওয়ার পর।

৩.

প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যম যেভাবে টার্গেটেড হয়েছে, তেমনি গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ব্যক্তিগতভাবেও নানা মামলা ও হামলার শিকার হয়েছে গত বছরগুলোতে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে আইসিটি আইনের কুখ্যাত ৫৭ ধারাকে।

কালো আইনের খারাপতম দিকটি হচ্ছে এর অস্পষ্টতা। যেসব দেশে বিচার বিভাগের ওপর নানাভাবে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে এবং যেসব দেশে জাবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো (সংসদীয় কমিটি) মূলত সরকারের আজ্ঞাবাহী হয় সেখানে এমন আইনের অপপ্রয়োগের সুযোগ থাকে আরও বেশি। আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার ক্ষেত্রে আমরা বারবার এমন ঘটনা ঘটতে দেখেছি। এই আইনে শুধু ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টের কারণে যেসব মামলা হয়েছে তার প্রায় সবগুলো সরকারি দলের লোকজনের করা মামলা। বিরোধী দল বা ভিন্নমতের মানুষের বিরুদ্ধে ফেসবুকে নানা অকথ্য প্রচারণা থাকা সত্ত্বেও এই আইনে তাদের পক্ষে মামলা হয়নি।

৫৭ ধারা হয়ে গিয়েছিল একপাক্ষিক মামলা ও হয়রানি-ভোগান্তির হাতিয়ার। এই ধারার কতটা অপপ্রয়োগ হয়েছে তার একটি প্রমাণ হচ্ছে মানহানি সংক্রান্ত মামলাগুলো। আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে মানহানি মামলা করতে পারে যার মান ক্ষুণ্ন হয়েছে তিনি অর্থাৎ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি। অথচ ৫৭ ধারায় এসব মামলা করেছে সরকারি মন্ত্রী বা নেতার কর্মীরা, আদালত তা গ্রহণও করেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। যে পত্রিকায় আমি এ লেখা লিখছি সেই বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদকের বিরুদ্ধেও এই আইনে হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে বেশ কয়েকটি।

এই আইনের চরম সমালোচনার মুখে পড়লে সরকার এক পর্যায়ে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নামে নতুন একটি আইন প্রণয়নের ঘোষণা দেয়। আমাদের মনে থাকার কথা নতুন আইনটির মাধ্যমে আইসিটি অ্যাক্ট নামের আইনটির চরম নিবর্তনমূলক ৫৭ ধারা বাতিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হওয়ার পর দেখা গেল এতে এটিতে আসলে ৫৭ ধারার সব কটি খারাপ বিধান বিভিন্ন ধারায় ভাগ করে ঢোকানো হয়েছে। এই আইনে বরং নতুন করে ৩২ ধারার বিধান ঢুকিয়ে দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথকে রুদ্ধ করা হয়েছে। ৩২ ধারা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চললে কোন দুর্নীতি, অনিয়ম আর অবিচারের ঘটনা তুলে ধরা যাবে কেবলমাত্র এসব অপরাধের অভিযোগ যার বিরুদ্ধে তিনি নিজেই তথ্য-উপাত্ত ও দলিল সেধে সেধে দিলে। অথবা সরকার নিজেই এসংক্রান্ত কোনো শ্বেতপত্র বা তদন্ত রিপোর্টের তথ্য সাংবাদিকদের জানালে। প্রথমটি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা কোনোভাবেই নেই। পাগল বা মহাপুরুষ ছাড়া কেউ নিজের বা নিজের লোকজনের দুর্নীতির খবর সাংবাদিকদের জানাবে না। দুর্নীতিবাজদের পাগল বা মহাপুরুষ হওয়ার কোনো কারণও নেই। বাকি থাকে সরকারের উচ্চতর কর্তৃপক্ষ যদি তদন্ত করে কোনো তথ্য প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারগুলো এমন তদন্ত করে থাকে কেবল অতীতের প্রতিপক্ষ সরকারের বিরুদ্ধে। নিজেদের আমলে নিজেদের লোকের বিরুদ্ধে বিপাকে পড়লে তদন্ত হয় মাঝে মাঝে, কিন্তু তার রিপোর্ট সরকার গোপন রাখে। ফলে নতুন আইনে তা প্রকাশ করার সাধ্য থাকবে না কারও। 

৩২ ধারার অনেক সমালোচনা হচ্ছে এখন। তবে আমার বিবেচনায় সমালোচনা করতে হবে এই আইনের অধিকাংশ পেনাল প্রভিশনের উদ্দেশ্য নিয়ে। আমরা জানি গণতান্ত্রিক বিশ্বে ফৌজদারি অপরাধ হয় দৃশ্যমান ক্ষেত্রে। অর্থাৎ শরীর (যেমন খুন, অপহরণ) বা সম্পত্তির (যেমন চুরি ডাকাতি) বিরুদ্ধে যেসব অপরাধ শুধুমাত্র সেসবের জন্য ফৌজদারি কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। মানহানির মতো অন্যান্য যেসব অপরাধ মূলত মানুষের বোধ ও অনুভূতির বিরুদ্ধে তা হচ্ছে দেওয়ানি অপরাধ। এসব অপরাধের শাস্তি হয় অর্থদণ্ডের মাধ্যমে। অথচ ৫৭ ধারার মতো ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনেও এসব অপরাধকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

নতুন আইনে শুধু মানহানি নয়, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা কেউ অসৎ বা নীতিভ্রষ্ট হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কিছু ইলেকট্রনিক্স মাধ্যমে প্রকাশ করাও ফৌজদারি অপরাধ। এসব আইনের প্রয়োগ হলে তা মারাত্মক অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন : বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা পাচারের জঘন্য অপরাধের কথা আমরা জানি। এ সংক্রান্ত যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে তার রিপোর্ট আজ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। অথচ ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি অনুসারে কোনো সাংবাদিক এ তদন্ত রিপোর্টের কোনো অংশ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ করলেই তার শাস্তি হবে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি এখানে আসলে ক্ষুণ্ন করল কে? বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা লোপাটের জন্য দায়ী দুষ্কৃতকারীরা, তদন্ত রিপোর্ট ঝুলিয়ে রেখে বিচার ব্যাহত করার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা নাকি এ রিপোর্ট প্রকাশ করে আইনের শাসনের পথে অবদান রাখা সাংবাদিক?

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট অনুসারে অপরাধটি করেছেন সাংবাদিক!

এ আইনে পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার হলেও পুলিশকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, দেশের তথ্যাধিকার ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আইনের ওপর এর প্রাধান্য ঘোষিত হয়েছে।

এমন বহু বিষয় এই আইনে রয়েছে যা প্রচলিত গণমাধ্যম এবং সামাজিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করবে। মানুষকে তথ্য জানানোর স্বাধীনতা আরও বেশি বির্পযস্ত হবে।

৪.

মানুষকে তথ্য জানানোর অধিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও তাকে রক্ষা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় সবচেয়ে বড় অবদানও রেখেছে এই অধিকারের প্রয়োগ।

স্যামুয়েল হান্টিংটন আধুনিক গণতন্ত্রের তিনটি স্রোত বা উন্মেষকালকে চিহ্নিত করেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম উন্মেষকালে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল সার্বজনীন ভোটাধিকারের, পরের দুটো পর্বে বড় ভূমিকা ছিল মানুষের স্বাধীনতাবোধের। বিশেষ করে সত্তর দশক থেকে সূচিত তৃতীয় পর্বে এশিয়া, আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ আর লাটিন আমেরিকায় বহু গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল মানুষের বাকস্বাধীনতা এবং মানুষকে তা জানানোর অধিকারের নির্ভীক প্রয়োগ থেকে।

গত এক দশকের একডেমিক ডিসকোর্সে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় যে তিনটি অধিকারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তা হচ্ছে বাকস্বাধীনতা এবং সংগঠন ও সমাবেশ করার স্বাধীনতাকে। এ তিনটি স্বাধীনতা ছাড়া মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকার (রাইট টু প্রটেস্ট) প্রয়োগ অসম্ভব হয়ে ওঠে, প্রতিবাদ করার অধিকার না থাকলে নির্বাচিত শাসকের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

ইউরোপ বা আমেরিকায় জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন : পার্লামেন্টারি কমিটি, উচ্চ আদালত ও বিভিন্ন সাংবিধানিক ও আইনগত কমিশন) স্বাধীনভাবে কাজ করে থাকে বলে সেখানে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবাদ করার অধিকার সব সময় প্রয়োগ করতে হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের মতো নামেমাত্র গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এসব প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন সরকারের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করে। ফলে এসব দেশে নাগরিক সংগঠন ও বিরোধী দলগুলোর জন্য প্রতিবাদ করার অধিকারের কোনো বিকল্প নেই। এই অধিকারের প্রয়োগ কার্যকরী হয়ে উঠে গণমাধ্যম এগুলো মানুষকে জানানোর অধিকার পূর্ণভাবে প্রয়োগ করার স্বাধীনতা পেলে।

আমরা বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে পরবর্তী সামরিক আমলগুলো এবং সর্বশেষ ১/১১ সরকারের সময় এ ধরনের চেষ্টার কারণে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে নানাভাবে হোঁচট খেতে দেখেছি। নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া আশির দশক থেকে নানাভাবে এর শিকার হয়েছেন, কিন্তু তাদের দুজনের উত্থান হয়েছে নানা বাধাবিপত্তির মুখে তাদের সংগ্রামকে গণমাধ্যম প্রচার করার সাহস দেখিয়েছিল বলে।

তাদের শাসনামলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকোচনের চেষ্টা তাই কোনোভাবে প্রত্যাশিত হতে পারে না। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে তারপরও দুই নেত্রীর আমলে আমরা এসব প্রচেষ্টার অব্যাহত সম্প্রসারণ লক্ষ্য করছি।

মত, পথ ও বিশ্বাসের পার্থক্য ভুলে আমাদের নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতার অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ কখনো প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারবে না।

লেখক :   অধ্যাপক, আইন বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তথ্য জানানোর স্বাধীনতা লেখাটি ১৫ মার্চ ২০১৮ তারিখে বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত। - মুক্তবাক




 আরও খবর