www.muktobak.com

'গণকণ্ঠ' এর কিছু স্মৃতি


 মহিউদ্দিন আহমদ    ৮ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার, ৫:৫৪    মতামত


আমার কাজের ক্ষেত্রটি বৈচিত্র্যময়। কত জায়গায় কত ধরনের কাজ করেছি, গুনে শেষ করা যাবে না। সব জায়গারই টক-ঝাল-তেঁতো-মিষ্টি স্মৃতি আছে কিছু কিছু। মাঝে মাঝে এগুলোর জাবর কাটি।
কাজের শুরু গণমাধ্যম দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যুক্ত হয়েছিলাম দৈনিক গণকণ্ঠে। তখন আমি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার। তখন গণকণ্ঠে ছিলেন একঝাঁক কবি। সবার ওপরে আল মাহমুদ। তিনি সম্পাদক। সম্পাদকীয় বিভাগে আরও জুটলেন আবুল হাসান, আবু কায়সার, নির্মলেন্দু গুণ। বার্তা বিভাগেও কয়েকজন কবি ছিলেন অরুণাভ সরকার আর মাশুক চৌধুরীর কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। আমার পরে বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিয়েছিল আবু করিম। সেও কবি।

বছর না পেরোতেই আমি প্রায় সব ধরনের কাজে ঢুকে গেলাম। রিপোর্টিং করি। সাক্ষাৎকার নিই, সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয়ও লিখি। ওই সময় সম্পাদকীয় বিভাগে চুক্তিভিত্তিক কাজে যোগ দিলেন আহমদ ছফা। গণকণ্ঠেই শুরু করলেন একটি ধারাবাহিক কলাম- 'বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস'। পরে এটি বই আকারে বের হলে বেশ সাড়া পড়ে যায়।

অফিস ছিল র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিট, ওয়ারীতে। পাকিস্তান আমলে এটি ছিল জনতা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজেস লিমিটেড। এখান থেকে বের হতো জামায়াতে ইসলামীর দৈনিক পত্রিকা 'সংগ্রাম'। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আফতাব উদ্দিন আহমাদের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা অফিসটির দখল নিয়ে গণকণ্ঠ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করে। প্রথম সংখ্যাটি ছাপা হয়েছিল ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। ওই বছর ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে এটি দৈনিক হয়।

গণকণ্ঠ সরকারের কোপানলে পড়েছিল। প্রায়ই পুলিশের লোক রাতের বেলা এসে কম্পোজ রুমে গিয়ে সিসার তৈরি সাজানো অক্ষরগুলো ভেঙে তছনছ করে দিত। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের কয়েকদিন পরে ওই বাড়ি থেকে গণকণ্ঠ উৎখাত হয়। পত্রিকার প্রকাশনা বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকে। পরে টিপু সুলতান রোডে একটি চারতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে আবারও কাজ শুরু হয়। ওখানে মাস দুয়েক কাজ করার পর আমি চলে আসি। সামনে অনার্স পরীক্ষা। পত্রিকায় কাজ করার মতো সময় নেই। পরিবেশও তেমন অনুকূল ছিল না।

১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে গণকণ্ঠ বন্ধ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে বেশ কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। পাল্টে গেছে রাজনীতির চালচিত্র। গণকণ্ঠ চালাতেন জাসদের নেতারা। তাঁরা অনেকেই গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আটক ছিলেন। ১৯৭৯-৮০ সালে তাঁরা একে একে মুক্ত হতে থাকেন। সবার শেষে ছাড়া পান সিরাজুল আলম খান, ১৯৮০ সালের মে মাসে। আবারও গণকণ্ঠ বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। টিপু সুলতান রোডের ওই বাড়িতেই শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন বাহাউদ্দিন চৌধুরী। তবে সিরাজুল আলম খান চারতলার একটা কামরায় বসে দেখভাল করতেন। ওই সময় আরও দু'জন কবি যোগ দিয়েছিলেন গণকণ্ঠে। সোহরাব হাসান আর মোরশেদ শফিউল হাসান। আহমদ ছফা তখনও আছেন। সিরাজুল আলম খান যেখানে, আহমদ ছফা সেখানে।

একদিন দেখা হয়ে গেল সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে। বললেন, 'এখন তো আমি বসি। তুমি আবার কাজ শুরু কর।' বললাম, 'পার্টটাইম করতে পারি। রোজ রোজ অফিসে আসতে পারব না। '

ঠিক হলো, আমি সপ্তাহে দুটি সম্পাদকীয়, একটি উপসম্পাদকীয় আর অর্থনীতিবিষয়ক একটি সাপ্তাহিক পাতার দায়িত্ব নেব। এভাবেই শুরু হলো আমার দ্বিতীয় মেয়াদ, ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে।

বার্তা বিভাগে পুরনো মুখ আছেন তখনও কয়েকজন। মোস্তাফা জব্বার, আতিয়ার রহমান আতিক, মোহাম্মদ জালাল, মাশুক চৌধুরী। সম্পাদকীয় বিভাগে পুরনো মুখের মধ্যে আছেন নজরুল হক, মো. আলাউদ্দিন আর রমেণ দত্ত। কাজে-আড্ডায় সময় কাটে ভালো।

সম্পাদক বাহাউদ্দিন চৌধুরীর মতো সজ্জন ভদ্রলোক খুব কম দেখেছি। তার সঙ্গে সখ্য হতে দেরি হলো না। কয়েকদিন পর তিনি ধরে আনলেন আরেকজনকে। তিনি আরও বেশি সজ্জন, ভদ্রলোক। ওয়াহিদুল হক। তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। তখন তাঁর পরীবাগের মোতালেব কলোনির বাসা ছিল আত্মগোপনে থাকা জাসদ নেতাদের একটি শেল্টার। যদিও ওয়াহিদ ভাই কখনো জাসদের রাজনীতির ধারে-কাছেও ছিলেন না।

গণকণ্ঠে নির্বাহী সম্পাদকের পদ ছিল না। বাহাউদ্দিন ভাই বেশি সময় দেন না। সম্পাদকীয় পাতাটির দেখভালের দায়িত্ব দিলেন তিনি ওয়াহিদ ভাইকে। ওয়াহিদ ভাই প্রায় প্রতিদিনই আসেন।

আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট দেন। তবে খুব বেশি চাপাচাপি করেন না। এটি তাঁর ধাতে নেই। তাঁর কাছে শিখেছি অনেক। বিশেষ করে বাংলা বানান। 'কী' আর 'কি'-এর মধ্যে কী তফাৎ, তিনি সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, যেটি আমি এখনও ব্যবহার করি।

ওই সময় এক বিকেলে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে গেলাম। জাসদের জনসভা হচ্ছে। স্টেডিয়ামের টিকিট কাউন্টারের ছাদটি নিখরচায় ব্যবহার করে প্রায়ই জনসভা হতো। আ স ম আবদুর রব বক্তৃতা দিচ্ছেন। রব ভাইয়ের ভাষণ সব সময়ই গরম। তখন সরকারে বিএনপি। জিয়াউর রহমানের হাতে সব ক্ষমতা। রব ভাই বক্তৃতার এক ফাঁকে আওয়ামী লীগকে ধোলাই শুরু করলেন। তার কথার মর্মার্থ হলো, যতদিন শেখ মুজিব ভালো ছিলেন, ততদিন আমরা তাঁকে সমর্থন করেছি। স্বাধীনতার পর তিনি খারাপ হয়ে গেছেন। তাই আমরা সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছি। কথাগুলো মন দিয়ে শুনলাম। ঠিক করলাম, এ নিয়ে লিখব। রব ভাইকে একটু হালকা ধোলাই দিতে হবে।

পরদিন গেলাম গণকণ্ঠ অফিসে। বসে বসে লিখে ফেললাম একটা উপসম্পাদকীয়। শিরোনাম দিলাম 'শেখ মুজিবের মূল্যায়ন প্রসঙ্গ'। লেখা শেষ করে ওয়াহিদ ভাইকে দিলাম। আমার লেখার মূল বক্তব্য ছিল, শেখ মুজিব স্বাধীনতার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দুর্বল ছিলেন, সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি অনেক বদলে গিয়েছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা ছিল স্পষ্ট, প্রকাশ্য। এজন্য তাঁকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল।

ওয়াহিদ ভাই লেখাটি পড়ে বললেন, 'ভালো, আমার পছন্দ হয়েছে। কিন্তু এ লেখা তো গণকণ্ঠ ছাপবে না।' আমি বললাম, 'ছাপতেই হবে। আমি এখন বিষয়টা এভাবেই দেখি।' কী করা যায়? তখন ওয়াহিদ ভাই আর আমি একটা ষড়যন্ত্র করলাম। ওয়াহিদ ভাই বললেন, 'কাল রোববার। আমি আসব না। লেখাটা তুমি প্রেস ম্যানেজারকে দিয়ে দিও কম্পোজ করতে। তুমি দিলেই সে এটা কম্পোজ করবে, ছাপা হয়ে যাবে। আমি বলতে পারব, আমি এটা দেখে দিইনি।'

প্রেস ম্যানেজার আমাকে চেনেন। আমি তাঁকে যা দিই, তা সব সময়ই ছাপা হয়। সুতরাং সে বিনা বাক্যব্যয়ে পরদিন আমার লেখাটা হাতে নিল। তার পরদিন অর্থাৎ, সোমবার আমার লেখাটা প্রধান উপসম্পাদকীয় হিসেবে ছাপা হলো।

সোমবার আমি হেলেদুলে অফিসে গেলাম। বেলা ১০টা-১১টা হবে। ওয়াহিদ ভাই বসে আছেন। আমাকে দেখেই বললেন, 'সর্বনাশ হয়ে গেছে। প্রচণ্ড রিঅ্যাকশন হয়েছে জাসদে।' তাঁর কাছ থেকে আনুপূর্বিক সব শুনলাম।

ওয়াহিদ ভাই সকালেই বাহাউদ্দিন ভাইয়ের ফোন পান। শুরুতেই প্রশ্ন, এ লেখা গেল কীভাবে? ওয়াহিদ ভাই সাজানো জবাব দিলেন, আমি তো রোববার যাইনি। এর আগে বাহাউদ্দিন ভাই ফোন পেয়েছেন সিরাজুল আলম খানের কাছ থেকে। সিরাজ ভাই জানতে চেয়েছেন, এ লেখা কীভাবে ছাপা হলো?

দুপুরে আমাকে ডেকে নিলেন সিরাজ ভাই। অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলাপ করলেন। কিন্তু উপসম্পাদকীয় কথা এড়িয়ে গেলেন। এর মধ্যে তিনি কী করলেন? আহমদ ছফাকে ফরমায়েশ দিলেন একটা পাল্টা উপসম্পাদকীয় লিখতে। ফরমায়েশি লেখায় ছফা ভাইয়ের জুড়ি পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে জাসদ নেতাদের তিনি খুবই তোয়াজ করে চলতেন। সিরাজ ভাই, মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রব সবাই তাকে পছন্দ করতেন। তো আহমদ ছফা লিখলেন 'শেখ মুজিব প্রসঙ্গ'। এটি ছাপা হলো পরদিন। লেখাটা মানসম্মত ছিল না। অর্ডারি মাল হলে যা হয়। আমি তাঁকে বললাম, 'ছফা ভাই আর কত দালালি করবেন?'

ওইদিন গণকণ্ঠে একটি চিঠি ছাপানো হয়েছিল আমার লেখার সমালোচনা করে। চিঠিতে নোয়াখালীর একটা ঠিকানা। নোয়াখালীতে পত্রিকা যায় একদিন পরে। দিনে দিনে গেলেও পাঠক সেটি সন্ধ্যার আগে পান না।

এত দ্রুত রকেটগতিতে কী করে চিঠিটি ঢাকায় এলো, কম্পোজ হলো, ছাপাও হলো। ভাবতে গিয়ে আমি গলদঘর্ম হলাম। পরে বুঝলাম, চিঠিটি অফিসেই লেখানো হয়েছিল।

ওই পর্বে আমি গণকণ্ঠে ছিলাম তিন মাস। নভেম্বরেই জাসদ ভেঙে বাসদ হয়। এতদিন দুঃখে-কষ্টে একসঙ্গে রাজনীতি করা মানুষগুলো রাতারাতি হয়ে গেল পরস্পরের পরম শত্রু। বিরক্ত হয়ে আমি গণকণ্ঠ ছাড়লাম।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

'গণকণ্ঠ' এর কিছু স্মৃতি লেখাটি দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত। - মুক্তবাক




 আরও খবর