www.muktobak.com

বন্ধুর পথে এক বছর


 অমিত হাবিব, দেশ রুপান্তর    ২০ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার, ৯:১১    দেশ


সংবাদপত্রের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে- এটা কিন্তু নতুন খবর নয়। নতুন খবর হচ্ছে, প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় বাংলাদেশের একটি দৈনিক প্রচারসংখ্যায় ছয় নম্বরে। দেশ রূপান্তরের প্রথম বর্ষপূর্তি আজ। দেশ রূপান্তর পরিবারের আমার সব সহকর্মীর পক্ষ থেকে প্রিয় পাঠক আপনাদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

ঠিক এক বছর আগে ‘দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’র প্রতিশ্রুতি রেখে দেশ রূপান্তরের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সম্পদের সীমাবদ্ধতা, শুদ্ধ সাংবাদিকতার পথে দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান নানা বাধা ও সর্বোপরি সংবাদপত্রশিল্পের এই সংকটের কালে একমাত্র পাঠকের আস্থাই আমাদের পত্রিকার সঞ্জীবনী। প্রথম বর্ষপূর্তির মাসে আমি বলতে পারছি পাঠকের আস্থাকে সাথী করে আমরা সফলভাবে বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এসেছি। বিনিয়োগকারীর অব্যাহত সহযোগিতা, হকার বন্ধুদের নিরলস পরিশ্রম, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের কল্যাণে প্রথম বছরেই দেশ রূপান্তর ভবিষ্যৎ পথযাত্রায় পায়ের নিচে শক্ত মাটি পেয়েছে। আজকে আমি তাদেরও জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

পত্রিকা প্রকাশের প্রথম দিনই আমি পাঠকের কাছে ‘দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমরা বলার চেষ্টা করেছিলাম, অনেক তথ্যের ভিড়ে আক্রান্ত পাঠকের হাতে সংবাদযোগ্য তথ্য আমরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বিন্যস্ত করব। সেই সাংবাদিকতা করার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু সফল হয়েছি সেই বিবেচনার ভার পাঠকের। আমি আমার সহকর্মীদের প্রায়ই বলি, সাংবাদিকের পরীক্ষা প্রতিদিনের। তার প্রতিদিনের জবাবদিহি পাঠকের কাছে। আমি আবার বলছি, পাঠকের কাছেই আমাদের একমাত্র জবাবদিহি।

এখন ইন্টারনেট সভ্যতার যুগ। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা চারদিক থেকে বলা হচ্ছে জোরেশোরে। সভ্যতার এই পর্যায়ে মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতিই যাচ্ছে বদলে। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য পরিমণ্ডলও বদলাচ্ছে দ্রুত। বিশ্ব রাজনীতিতেও চলছে আদর্শহীনতার উল্লম্ফন। নিকট ভবিষ্যতে আমাদের সমাজ ঠিক কী রূপ নেবে তা নিয়ে চলছে জল্পনাকল্পনা। সভ্যতার এই সন্ধিক্ষণে সংবাদপত্র, সংবাদপত্রশিল্প ও সাংবাদিকতা পেশা কী চেহারা ধারণ করতে পারে, তার প্রাথমিক নমুনা আমরা হয়তো দেখছি। পুরো দৃশ্যটা পরিষ্কার হতে সময় লাগবে আরও। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের কাতারে এসে বাংলাদেশে এই পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। গত এক দশকে সংবাদপত্রের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস বিজ্ঞাপন কমেছে অর্ধেকেরও বেশি। বেড়েছে উৎপাদন খরচ। সব মিলিয়ে সংবাদপত্র শিল্প ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা মোকাবিলা করছে। ফেইসবুক, গুগল ও ইউটিউবের মতো ইন্টারনেট জায়ান্ট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মুনাফার জাল বিস্তৃত হয়েছে আমাদের দেশেও। এর সবচেয়ে বড় শিকার আমার বিবেচনায় আমাদের গণমাধ্যম। বিশ্বজুড়েই গণমাধ্যম সামাজিক মাধ্যমগুলোর দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এ কথা স্বীকার করে নিতে দোষ নেই যে, বিশ্বের অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো যেমন এই নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিল না, তেমনি আমাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। সংবাদপত্র ইন্ডাস্ট্রির প্রস্তুতি নেই, প্রস্তুতি আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাপকদের আছে কি না আমরা জানি না। একে তো এই পরিস্থিতি, তার ওপর আছে আমাদের চারপাশের অসম প্রতিযোগিতা পরিস্থিতি। ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ সংকট ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা নীতির জাঁতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে সাংবাদিকতা। পেশা টিকিয়ে রাখার সংগ্রামই যখন সাংবাদিকদের ব্রত হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাতে আর গৌরব থাকে না। সমাজে যে কারণে সাংবাদিকতা তথা সামাজিক পর্যবেক্ষকের ধারণা তৈরি হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। সংবাদপত্র শিল্পের এই নাজুক পরিস্থিতিতে অগ্নিতে ঘৃতাহুতির মতো অবস্থা তৈরি করেছে সাংবাদিকদের জন্য ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো। একজন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক হিসেবে আমার জন্য বিষয়টি শাঁখের করাতের মতো। দুদিক থেকেই কাটছে। আমার সহকর্মীদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার তাগাদা যেমন সার্বক্ষণিক বিচলিত করে, তেমনি বিনিয়োগকারীর খরচের ফাঁড়াও বিপন্ন করে তোলে আমাকে। সকল বিবেচনা মাথায় রেখেও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অনুগত নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় সকল আইনকানুন ও বিধিকে সম্মান করা আমার কর্তব্যজ্ঞান করি। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত একটু বলতে চাই। পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির জন্য মার্জনা চাই।

বাংলাদেশের সংবাদকর্মীদের জীবনমান মোটেও উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের এই পেশায় কর্মরতদের জীবনমানের সমান নয়। তারপরও সরকার ও সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা সংবাদপত্রশিল্পে কর্মরতদের জন্য একটি ন্যূনতম বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে। এই রেওয়াজ আমরা মেনে চলছি। তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু অন্যান্য মাধ্যম যেমন ইলেকট্রনিক ও ইন্টারনেট মিডিয়ায় কর্মরত আমার অন্য সহকর্মীরা এই কাঠামোর বাইরে কেন? আর শুধু সংবাদপত্রশিল্পের জন্য যদি তা প্রযোজ্য হয়, তবে এ খাতে সরকারের নীতি প্রণোদনা থাকা উচিত। সেটি কীভাবে? সোজা কথায় সরকারি বিজ্ঞাপনের দাম বাড়িয়ে। বাংলাদেশের মতো একটি সমাজে সরকারের সঙ্গে জনগণের সরাসরি যোগাযোগের বিশ্বস্ত মাধ্যম এখনো সংবাদপত্র। তাই সরকারি বিজ্ঞাপন শুধু নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা নয়। এটি সরকারের গণমাধ্যম নীতির অন্যতম উপজীব্য। পত্রিকার উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার খরচ অতীতের চেয়ে বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু সেই অনুপাতে সরকারি বিজ্ঞাপনের দাম বাড়েনি। আমি আশা করব সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন। সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় কাঁচামাল কাগজ আমদানিতে আরও কর অব্যাহতিসহ সরকারের নীতি-প্রণোদনায় বিবেচনার দাবি রাখে। সরকার নির্ধারিত বেতন কাঠামো নিয়েও আরেকটু কথা বলতে চাই। সংবাদপত্রশিল্পে আমার তিন দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতা থেকে দাবি নিয়েই বলতে পারি, এই শিল্পে নানা বয়সী ও নানা মাত্রার দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবী কাজ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বেতন কাঠামোয় পদ বিন্যাস যেটা আছে তা সবসময় কর্মীদের বয়স ও যোগ্যতার মাত্রাগত দক্ষতার সঙ্গে খাপ খায় না। একটি উদাহরণ দিয়ে বলি, সাংবাদিকরা পেশাজীবনের শুরু থেকে অবসর পর্যন্ত মোট চারটি গ্রেডে বেতন পান। সম্পাদক বেতন পান বিশেষ গ্রেডে। এখন ৩০/৪০/৫০ বছরের পেশাজীবনে একজন সাংবাদিকের পদোন্নতি সর্বোচ্চ চারবারের বেশি সম্ভব নয়। বেতন স্তর বিন্যাসেও রয়েছে গ্রেডভেদে বড় ব্যবধান। এই ব্যবধান কমিয়ে গ্রেডের সংখ্যা বাড়িয়ে বেতন স্তর বিন্যাসে আরও পদ সৃষ্টি করলে বা গ্রেডের সংখ্যা বাড়ালে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আরও মসৃণ হয়। এতে বেতন কাঠামোর চাপও কিছুটা লাঘব হয়। কর্মীদের দক্ষতা বিবেচনা করে বেতন বিন্যাসে বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়। আমাদের এই উদ্বেগ ও বিবেচনা নীতিনির্ধারকরা খোলা মন নিয়ে দেখবেন বলে প্রত্যাশা করছি।

লেখার শুরুতে আমি সংবাদপত্রের মৃত্যুঘণ্টাকে পুরনো খবর বলেছি। আমার বিশ্বাসের কথা আমি বলব না। সাম্প্রতিক অনেক গবেষণা বলছে, সংবাদপত্রের মৃত্যুঘণ্টাটা আসলে ফলস অ্যালার্ম বা সতর্ক বার্তা। তাহলে মুদ্রিত সংবাদপত্রের কি ভবিষ্যৎ আছে? অবশ্যই আছে এবং আরও বহু দশক থাকবে। সংবাদপত্রের আবির্ভাবের সময় থেকে এই মাধ্যমের শক্তি এতটাই হয়ে উঠেছে যে, সব ধরনের সামাজিক বদল ও উন্নয়নে রয়ে গেছে এর প্রভাব। গবেষণাগুলো বলছে দূর ভবিষ্যতেও সামাজিক মাধ্যমগুলোর এই শক্তি অর্জনের সম্ভাবনা নেই। ইন্টারনেটে দেখবেন, ফেইসবুকে বিনামূল্যে নানা খবর ও মতামত পেলেও মানুষ টাকা খরচ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস বা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের গ্রাহক হচ্ছেন। তাদের পে ওয়ালে দেখবেন মিলিয়নের ওপর পাঠক।

যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের সংবাদপত্র নিয়ে একটি কথা বহুল উদ্ধৃত। সরকারের কার্যক্রমের ওপর সংবাদপত্রের পর্যবেক্ষকের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি বেছে নিতে বলা হয়, সংবাদপত্রবিহীন সরকার না সরকারবিহীন সংবাদপত্র। আমি পরেরটিই বেছে নেব।’ ইন্টারনেটে প্রতিমুহূর্তের খবর প্রচারের ক্ষেত্রে কন্টেন্ট নির্মাণ ও তাকে নিখুঁত করে তোলার জন্য যে সময়ের দরকার হয় তা সম্ভব হয় না। চটজলদি সাংবাদিকতার বিপরীতে অনুসন্ধানী ও ব্যাখ্যামূলক কন্টেন্টের চাহিদা পাঠকের কাছে রয়েই গেছে। আর মিডিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা। এই বিশ্বাসযোগ্যতার শক্তি দিয়ে মিডিয়া মূলত সমাজ ও রাষ্ট্রে তার প্রভাব তৈরি করে। এক্ষেত্রে সংবাদপত্রের বিকল্প এখনো দেখা যাচ্ছে না। নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র এখনো অনন্য। বস্তুনিষ্ঠ তথ্য বিন্যাস বা পেশাদার সাংবাদিকতা এবং ভালো কন্টেন্ট যে বাংলাদেশের পাঠকরাও সাদরে গ্রহণ করে তার প্রমাণ দেশ রূপান্তরের এক বছরের পথচলা। আমাদের কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যেমন পাঠক মহলে আলোড়ন তুলেছে, তেমনি সরকারের নীতিনির্ধারকরাও বিষয়টি আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছেন। কদিন আগে দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদন ধরে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পিইসির পরীক্ষায় বহিষ্কৃত শিশুদের আবার পরীক্ষা নেওয়ার আদেশ দিয়েছে। আমাদের কয়েকটি বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনেও সাড়া দিয়েছে পাঠক।

যাত্রার শুরুতে আমরা বলেছিলাম, সময় কঠিন হলেও সাংবাদিকতার উর্বর সময় এটি। আমার সহকর্মীদের আন্তরিক ও সৎ প্রচেষ্টার সঙ্গে পাঠকের বিপুল সমর্থন সেই বক্তব্যেরই প্রতিফলন। তার মানে ভালো কন্টেন্টের জন্য মানুষ অর্থ খরচ করছে। পাঠকের আগ্রহ ও রুচির বিবেচনাই কন্টেন্টের একমাত্র নিয়ামক নয়। এটি নির্মাণে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার দক্ষতা শিল্পীর নিপুণতায় কেবল সাংবাদিকই ফুটিয়ে তোলেন। কিন্তু তার জন্য দরকার সুসাংবাদিকতা। পেশাদার সাংবাদিকতা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সামনে রেখে আমরা বলেছি, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। প্রিয় পাঠক, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে এক বছরের উত্তীর্ণ যাত্রায় আপনাকে অভিনন্দন এবং সামনের বছরগুলোতে স্বাগত।

সম্পাদক
দেশ রূপান্তর

১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২০ ডিসেম্বর দৈনিক দেশ রুপান্তরে প্রকাশিত। - মুক্তবাক




 আরও খবর