www.muktobak.com

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পাঠকের হাতেও


 সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, দেশ রুপান্তর    ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, রবিবার, ৯:০৬    দেশ


নিজে আমি সংবাদপত্রের লোক নই, এই অর্থে যে পেশাগতভাবে আমি সংবাদপত্রে কখনো কাজ করিনি; ইচ্ছে ছিল সাংবাদিক হওয়ার, হওয়াটা হয়ে ওঠেনি; কিন্তু আমি সংবাদপত্রের জগতের লোক বৈকি। পাঠক হিসেবে এবং লেখক হিসেবে। লেখক হিসেবে যুক্ত থাকাটা একটি অতিরিক্ত পাওনা, কিন্তু শুধু যদি পাঠকই হতাম ও থাকতাম, তাহলেও নিজেকে সংবাদপত্রের জগতের লোক মনে করতাম। আমি একা নই, ব্যতিক্রম নই, সংবাদপত্রের অগুনতি পাঠকও নিজেদের সে-ভাবেই দেখেন। ছেলেবেলায় আমরা থাকতাম এক মফস্বল শহরে, দিনের খবরের কাগজ সেখানে সন্ধ্যার আগে পৌঁছাত না, কিন্তু বিকেল হলেই প্রতীক্ষা শুরু হতো তার আগমনের জন্য। আমার স্ত্রীর সঙ্গে তার ছোটভাইয়ের ‘সারা জীবনে’র আড়ি হয়ে গিয়েছিল খবরের কাগজ এলে কে আগে দখলে নেবে সেটা নিয়ে। এসব ঘটনা প্রায় সব মধ্যবিত্ত পরিবারেই ঘটত, কোনো না কোনো ভাবে।

এখন শুনি ওসব নেই। সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা না করলেও চলে, কাড়াকাড়ি করবার দরকার পড়ে না, বোতাম টিপলেই খবর পাওয়া যায়। ইন্টারনেট আছে, রয়েছে অনলাইন, খবর আসে মোবাইলেও। কিন্তু এসব তো পড়া নয়, এসব হচ্ছে দেখা। দেখা ও পড়ার ভেতর বিস্তর ফারাক। দেখার জন্য দু’চোখই যথেষ্ট, পড়ার জন্য চোখ অবশ্যই দরকার, কিন্তু সঙ্গে প্রয়োজন মনোযোগের, সর্বোপরি চিন্তার। চিন্তা ছাড়া পড়া সম্ভব নয়। সংবাদপত্রের দর্শক খবর চায়, গুজব পেলে খুশি হয়, অতিনাটকীয়তার অপেক্ষায় থাকে; ওদিকে পাঠক পড়তে পড়তে ভাবে, ভাবতে ভাবতে পড়ে, খবরের ভেতরে খবরের খোঁজ করে। বুঝতে চায়। এটা খুবই স্বাভাবিক যে সব সময়েই দর্শক বেশি পাওয়া যাবে পাঠকের তুলনায়। আগেও তাই ছিল, এখনো তেমনি রয়েছে। তাই সংবাদপত্রের পাঠক অনাপেক্ষিক ভাবে কমেছে এমনটা নয়, সংবাদপত্রের দর্শক বেড়েছে এটাই সত্য। জনসংখ্যার অনুপাতে পাঠক সব সময়েই কম ছিল, এমনকি যারা পড়ত বলে মনে হয় তারাও সবাই যে পড়ত তা নয়, কেউ কেউ দর্শক ছিল বৈকি।

আমার বাবা বলতেন একবার লেখা দশবার পড়ার সমান। মিথ্যা বলতেন না। এখন লেখার চলও কমেছে। লোকে চিঠি লিখতে চায় না, এসএমএস করে। কাগজের ব্যবহার কমছে। কেউ কেউ মনে করেন কাগজ উঠেই যাবে, চলে যাবে জাদুঘরে। আমি তা মনে করি না। কাগজ উঠে গেলে সভ্যতাও বদলে যাবে, এবং ধারণা করি নতুন সেই সভ্যতা মানবিক থাকবে না, যান্ত্রিক হয়ে পড়বে। মানুষ নেই, যন্ত্রই শুধু আছে, এমন ব্যবস্থায় কাগজ কেন থাকবে? কাগজ থাকবে না; কিন্তু সেদিন তো আমরা, মানুষরাও থাকব না। আমরা মানুষরা নিশ্চয়ই সেটা হতে দেব না, জানপ্রাণ দিয়ে ঠেকাব।

লেখার প্রতি চ্যালেঞ্জটাও নতুন ঘটনা নয়। লিখতে না-জানা ব্যাপারটা তো ছিলই, ছিল টেলিগ্রাম, পরে এসেছে টেলিফোন। এখন এসেছে ইন্টারনেট ও মোবাইল। কিন্তু তবু লেখা রয়ে গেছে, রয়েছে পড়াও। লোকে চিঠিও লেখে। আগামীতেও লিখবে, কেননা চিঠি তো কানে কানে কথা-বলা নয়, চোখে ইশারা-করাও নয়; চিঠিতে লোকে নিজেকে ব্যক্ত করে, ব্যক্ত করে হাল্কা হয়, লিখতে লিখতে সমৃদ্ধ হয়, নিজেকে পৌঁছে দেয় অন্যের কাছে, অন্যকেও নিয়ে আসতে পারে নিজের কাছে। এই যে সমাজে এখন নানাবিধ মানসিক বৈকল্য দেখা যাচ্ছে; লোকে বিপন্ন থাকছে, আত্মহত্যা করছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে হিংস্রতা ও বিচ্ছিন্নতা, বাড়ছে মাদকাসক্তি, প্রবল হয়ে উঠছে রক্তপাত, এসবের বড় কারণ আত্মপ্রকাশের বিঘœ এবং পারস্পরিক সহানুভূতি ও মৈত্রীর অসদ্ভাব।

লেখা তাই থাকবে। পড়াটাও থাকবে। থাকবে সংবাদপত্র। থাকবে সে খবরের কাগজ হিসেবেই। অর্থাৎ মুদ্রিত আকারে খবর থাকবে। হাল্কা খবর নয় শুধু, আঁতের খবরও। ব্যাখ্যা থাকবে, থাকবে মন্তব্য। খবর আর গুজব যে এক জিনিস নয়, বোঝা যাবে সেটা খবরের কাগজ পড়ে। এবং খবরের কাগজ পড়বার বস্তু হবে, দেখবার নয়। ইন্টারনেটে, অনলাইনে তো আমরা দেখিই, পড়ি না। পড়া মানে মুদ্রিত-অবস্থায় পড়া, হাতে-ধরে পড়া। বই পড়ার মতো করে। সংবাদপত্র পড়ার জিনিস হিসেবে আমাদের হাতে থাকবে, থাকবে পাশে, টেবিলে, বিছানায়। পড়া হবে পথে, ট্রেনে-বাসে, অফিসে, চায়ের দোকানে, অবসরের আলোচনার ফাঁকে। প্রয়োজনে একাধিকবার পড়া যাবে। কাচের আড়াল থাকবে না পাঠক ও পঠিতের ভেতর। খবর নিয়ে তর্কবিতর্ক চলবে, চলবে মতামতের আদান-প্রদান। বই যেমন বই হয় না যদি না ছাপা ও বাঁধাই হয়ে হাতে আসে, সংবাদপত্রও তেমনি সংবাদপত্র হয় না কাগজে মুদ্রিত না হলে।

সংবাদপত্রের কাছে পাঠকের প্রত্যাশাটা এমনিতে খুবই সাধারণ। পাঠক সংবাদ চায়। কিন্তু সংবাদ তো নানা ধরনের হয়। কোন সংবাদ চায় সে? পাঠক চায় তার নিজের পক্ষের সংবাদ। সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতার কথাটা খুব চালু আছে। নিরপেক্ষতা কিন্তু মোটেই সম্ভব নয়। ন্যায় অন্যায়ের যুদ্ধটা প্রতিনিয়ত চলছে, সেখানে কেউ যদি বলেন তিনি কোনো পক্ষে নেই, তিনি নিরপেক্ষ; তাহলে বুঝতে হবে জ্ঞাতে হোক কি অজ্ঞাতেই হোক তিনি প্রতারণা করছেন, অপরের সঙ্গে তো অবশ্যই, নিজের সঙ্গেও হয়তো। পাঠক চায় সংবাদপত্র থাকবে ন্যায়ের পক্ষে; এবং পাঠক মনে করে যে সে নিজেও ন্যায়ের পক্ষেই রয়েছে।

কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে যাওয়াটা তো সহজ নয়। কারণ অন্যায় অত্যন্ত শক্তিশালী। রাষ্ট্র ও সমাজ অন্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতা করে। কেবল তাই নয়, ওই দুই ব্যবস্থা নিজেরাও অন্যায় করে। আর সংবাদপত্র নিজেও জানে এবং মানে যে সে এসেছে ব্যবসা করতে। ব্যবসা করতে গেলে সামাজিক শাসন মান্য করাটা ভালো, আর রাষ্ট্রকে চটানো তো কোনো মতেই উচিত নয়। চটানো আসলে সম্ভবও নয়। কারণ রাষ্ট্র উত্ত্যক্ত হওয়া পছন্দ করে না; ইশারায় নিষেধ করে, না শুনলে গলা চেপে ধরে। সংবাদপত্র পাঠকের কাছে যেতে চায়, পাঠকের জন্যই তো তার আত্মপ্রকাশ, কিন্তু সংবাদপত্রকে চোখ রাখতে হয় রাষ্ট্রের দিকে। রাষ্ট্র আবার সমাজেরও রক্ষক। রাষ্ট্র প্রকাশ পায় সরকারের মধ্য দিয়ে, সংবাদপত্র তাই সরকারকে মেনে চলে।

সংবাদপত্র জনপ্রিয় হতে চায়, কিন্তু ভয় পায় সরকারের অপ্রিয় হতে। পাঠকের কাছে যাওয়া প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে। সাহিত্যের ইতিহাসে এটা বেশ আলোচিত। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজি সাহিত্যের একজন প্রধান লেখক হচ্ছেন স্যামুয়েল জনসন; তিনি ঠিক করেছিলেন ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য একটি অভিধান প্রণয়ন করবেন। অত্যন্ত কঠিন পরিশ্রমের কাজ। পরিশ্রমে তার ভয় ছিল না, শঙ্কা ছিল প্রয়োজনীয় অর্থসংগ্রহ নিয়ে। তখন পর্যন্ত লেখকেরা বড় লোকদের পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভর করতে বেশ অভ্যস্ত ছিলেন। সে সময়ে সাহিত্য সংস্কৃতির ভালো একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন লর্ড চেস্টারফিল্ড। জনসন চেস্টারফিল্ডের কাছে তার পরিকল্পনাটি পেশ করেন। যে কারণেই হোক চেস্টারফিল্ড সাড়া দেননি। জনসনের ছিল অদম্য উৎসাহ; তিনি দমলেন না; বিজ্ঞাপন দিয়ে পাঠকের কাছে অভিধানের জন্য অগ্রিম গ্রাহক চাঁদা চাইলেন। সাড়া তিনি পেয়েছিলেনও। অভিধানটি প্রকাশিত হওয়ার পর ওটির গুণপনার প্রশংসা করে লর্ড চেস্টারফিল্ড পর পর দু’টি প্রবন্ধ লিখেছিলেন পত্রিকায়। প্রতিক্রিয়ায় জনসন একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। তাতে চেস্টারফিল্ডকে সম্বোধন করে তিনি বলেন, সমর্থনটা একটু দেরিতে এলো। এটা তখন পাইনি যখন একাকী ছিলাম। এখন পাচ্ছি যখন দরকার নেই। এই চিঠিতে ইংরেজি সাহিত্যের জন্য বিত্তবানদের পৃষ্ঠপোষকতা খোঁজার রীতির শেষ বিদায়ের ঘণ্টা ধ্বনিত হয়েছিল বলে প্রসিদ্ধি আছে। মুষ্টিমেয়কে ছেড়ে সাহিত্য চলে গেল অজানা অচেনা পাঠকদের কাছে। তারপর থেকে পাঠকই প্রধান ভরসা। জনসন পাঠক পেয়েছিলেন। সময়টা ছিল পুঁজিবাদের বিকাশের। সামন্তবাদের সীমা পার হয়ে প্রকাশনা চলে যাচ্ছিল মধ্যবিত্ত পাঠকের কাছে, বাজারের ভেতর দিয়ে।

পুঁজিবাদ এখন আর তখনকার অবস্থায় নেই, এখন সে রীতিমতো নৃশংস। বাজার এখন জবরদস্ত। কিন্তু তবু বাজার মোটেই স্থিতিশীল নয়। বিশেষ করে সংবাদপত্র প্রকাশনার ক্ষেত্রে এখন পাঠকের চেয়ে বেশি দরকার বিজ্ঞাপনের। বিজ্ঞাপন বাড়াবার জন্য পাঠকপ্রিয়তার প্রয়োজন হয় বৈকি; কিন্তু বিজ্ঞাপনই হচ্ছে লক্ষ্য, পাঠক-প্রাপ্তি বিজ্ঞাপন বৃদ্ধির উপায়। বিজ্ঞাপন যদিও লক্ষ্য, তবু পাঠক না থাকলে বিজ্ঞাপন আসবে না; আর বিজ্ঞাপন না এলে সংবাদপত্রও চলবে না। ব্যবস্থা এটাই। পাঠককে তাই উপেক্ষা করার উপায় নেই। পাঠকের জন্যও ওই উপেক্ষণীয় না-হওয়াটাই একমাত্র ভরসা। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সরকার ও ব্যবসায়ীদের হাতে, তবে কিছুটা হলেও পাঠকের হাতেও।

জানা যায় পাঠক পছন্দ করে অপরাধের খবর। ফৌজদারি অপরাধ হলে পাঠকের রসনাতৃপ্ত হয়; রাজনৈতিক অপরাধও কম সুস্বাদু নয়। এর ভেতরের রহস্যটা অবশ্য এই যে পাঠকের রুচি তৈরিতে সংবাদপত্রের বড় একটা ভূমিকা থাকে। পাঠক আসলে অপরাধের খবর চায় না, তাকে ওই খবর সরবরাহ করে আসক্তি তৈরি করা হয়, যার ফলে সে পছন্দের আর ওই বৃত্তের বাইরে যেতে পারে না। অপরাধের খবরই তার খোরাক হয়ে দাঁড়ায়। খোরাক না-পেলে ভেতরে ভেতরে সে হতাশ হয়।

প্রকৃত খবর হলো এই যে, সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যবস্থাটা এখন ভয়ংকরভাবে অসুস্থ। এরা উভয়েই অপরাধী। অপরাধী তারা প্রত্যেকটি নাগরিকের কাছে। রাষ্ট্র ও সমাজের অসুখের কারণেই নাগরিকরা অসুস্থ। এই নাগরিকরাই তো সংবাদপত্রের পাঠক। তারা আশার খবর চায়। আশার খবর মানে কী? সেটা হলো অপরাধীর শাস্তির খবর। হ্যাঁ, তাই। এবং অপরাধ যে নির্মূল হবে পাঠক চায় এরকম আশ্বাসও। কিন্তু অপরাধীর শাস্তির খবর তো পাওয়া যায় না। অপরাধের খবর পাওয়া যায়, কিন্তু অপরাধীর কী শাস্তি হলো সেটা জানা যায় না। নতুন অপরাধের খবর এসে অপরাধের পুরাতন খবরকে মøান করে দেয়। আর মূল যে অপরাধী, রাষ্ট্র ও সমাজÑ তারা তো চিহ্নিতই হয় না। রাষ্ট্র ও সমাজের শাস্তিটা অন্য কিছু নয়, রাষ্ট্র ও সমাজে পরিবর্তন আনা ভিন্ন। পরিবর্তন আসবার চেষ্টা যে চলে না তা নয়। চলে। ওই চেষ্টাতেই আশা থাকবার কথা, এমন আশ্বাস থাকবার কথা যে মানুষ লড়ছে ব্যবস্থা বদলাবার জন্য, এবং ব্যবস্থা বদলাবে বৈকি। কিন্তু সেসব খবর পত্রিকায় আসে না। ওই বিষয়ে খবরকে উপেক্ষা করা হয়, কখনো কখনো বিকৃতও করা হয়। কারণ কী? কারণ হচ্ছে সংবাদপত্রের যারা মালিক তারা ব্যবস্থার পক্ষে থাকেন। ব্যবস্থা তাদের সুবিধা দেয়। ব্যবস্থাটা বদলে গেলে তাদের ভীষণ অসুবিধা; আম ও ছালা একসঙ্গে লোপাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। সেটা তারা চাইবেন কেন? কোন দুঃখে? পরিবর্তন আসুক এটা তারা মোটেই চান না।

এমনকি সাধারণ যে অপরাধগুলো, যাদের রমরমা বর্ণনা পাঠককে আমোদ আরাম ইত্যাদি দিতে চায় সেগুলোর অভ্যন্তরে যে রহস্য রয়েছে, যেসব কার্যকারণে তারা সংঘটিত, তাদেরও উন্মোচন ঘটে না। অন্ধকার অন্ধকারেই রয়ে যায়; অপরাধ বাড়তে থাকে সংখ্যায় যেমন, মাত্রাতেও তেমনি। ভেতরে অনুসন্ধানের ব্যাপারে অনাগ্রহটা চমৎকারভাবে প্রকাশ পায় পত্রিকার সম্পাদকীয়তে। সম্পাদকীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; সেখানে থাকবার কথা পত্রিকাটির অবস্থানের হদিস। গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কেবল খবর দেওয়ার দক্ষতার কারণে নয়; সঙ্গে থাকে খবরের ব্যাখ্যাও। সেটা খবরে থাকবে, থাকবে সম্পাদকীয়তে। ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য গভীরে যেতে হয়; প্রয়োজন হয় জ্ঞানের ও গবেষণার; এবং স্থির থাকতে হয় দেখবার দৃষ্টিভঙ্গিতে।

সমসাময়িক বিশ্বে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে চরম ফ্যাসিবাদী ভীতির সঞ্চার করছেন তাতে রক্ষণশীলরা পর্যন্ত প্রমাদ গুনছেন, আশঙ্কা করছেন ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়বে, নৈরাজ্য দেখা দেবে। রক্ষণশীল পত্রিকাগুলোও তাই ট্রাম্পের সমালোচনা করছে। সেই সমালোচনা বিশেষভাবে প্রকাশ পাচ্ছে সম্পাদকীয় মন্তব্যে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের সবচেয়ে কম পঠিত অংশ হলো সম্পাদকীয়; দায়সারাভাবে লেখা হয়, রাখতে হয় তাই যেন রাখা; সত্য উন্মোচন থাকে না, ব্যাখ্যা আসে না ঘটনাবলির, দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ পাওয়া যায় না। বক্তব্য থাকে নিষ্প্রাণ, লেখার ধরন যান্ত্রিক। অনেক কথা বলা হয়, কোনো কথা না-বলে। ফলে পড়ার আগেই পাঠক অনুমান করতে পারেন ভেতরে কী আছে। সে-অনুমান যে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয় এমন নয়। উপসম্পাদকীয়ের ব্যাপারেও একই কথা। পাঠক লেখকের নাম দেখে, এবং বুঝে নেয় ভেতরে কী আছে। চোখ বুলায়; পড়তে আগ্রহী হয় না। সম্পাদকীয় পাতাতে জনমতের প্রতিফলন থাকবার কথা; চিঠিপত্রের মধ্য দিয়ে। চিঠিপত্রও আসে না, চিঠিপত্রকে যে উৎসাহ দেওয়া হয় এমনও নয়।

পাঠকের জন্য সংবাদপত্রের একটা বড় আকর্ষণ হচ্ছে ব্যঙ্গচিত্র। ব্যঙ্গচিত্র সমসমায়িক ঘটনাপ্রবাহের ওপর কৌতুককর মন্তব্য থাকে। সেখানে পত্রিকার দৃষ্টিভঙ্গিও প্রকাশ পায়। ব্যঙ্গচিত্র তখনই সার্থক হয়, যখন ভেতরে থাকে কী ঘটা উচিত ছিল সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা। যা ঘটছে তাকে মাপা দরকার ওই মানদ-ে। ওসব মাপাটাপা এখন অনুপস্থিত। পত্রিকা থেকে ব্যঙ্গচিত্র উঠেই গেছে। কৌতুক দেওয়ার জন্য নানারকম ইয়ার্কি ফাজলামি থাকে, সেগুলো আড্ডাবাজির মতোই অর্থহীন। দাগ কাটে না, কৌতুকের সৃষ্টি করে না। আর আছে রং ঢং। মানুষের জীবনে রঙের অভাব, পত্রিকাগুলো আসে রঙিন হয়ে। হ্যাঁ, ফটো জার্নালিজম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দক্ষ ফটোগ্রাফাররা আছেন, তারা ছবি তোলেনও, কিন্তু অনেক ছবিই ছাপা হয় না বলে ধারণা করা যায়, নইলে ছবিগুলো এমন গতানুগতিক হবে কেন? যেমন, হরতালের সময় কিছু কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে, সেগুলোর ছবি কাগজে আসে না। অলিখিত নিষেধাজ্ঞা কাজ করে।

ওদিকে সংবাদপত্রের পাতাতে সংবাদের জন্য বরাদ্দ জায়গা তো কেবলি সঙ্কুচিত হচ্ছে, বিজ্ঞাপনের ধাক্কায়। বিজ্ঞাপন প্রথম পাতাকে পর্যন্ত গ্রাস করে ফেলছে। মনে হচ্ছে খবর যা দেওয়া হয় তা হচ্ছে বিজ্ঞাপন প্রচারের অজুহাত। মালিকের চোখ বিজ্ঞাপনের দিকে, সংবাদের দিকে নয়। এখানে রয়েছে পুঁজিবাদের চরম প্রকাশ। বিজ্ঞাপন পাঠকের রুচি তৈরিতেও কাজ করছে।

খবরের কাগজের কাছে পাঠকের এত সব প্রত্যাশার কারণটা কী? কারণ হচ্ছে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার, অর্থাৎ সরকারের ওপর সামাজিক নজরদারিত্বের অভাব। নজরদারিত্ব দরকার জবাবদিহিতা তৈরি করার জন্য। কাজটা আইন পরিষদের করবার কথা। আইনপরিষদ সেটা করতে পারে না। কারণ সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে সরকারি দলের; কাজেই যতই সমালোচনা হোক, সরকার তার ইচ্ছা অনুযায়ী এগিয়ে যায়। নজরদারিত্ব করতে পারে বিচার বিভাগ। কিন্তু বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে অসমর্থ হয়। এজন্যই সংবাদপত্রের কাজে প্রত্যাশা থাকে যে তারা খবর দেবে, খবরের পেছনের খবর বের করে আনবে, সরকারের কাজের সমালোচনা করবে, জনমতের প্রতিফলন ঘটাবে, এবং সহায়তা দেবে জনমত সংগঠনে।

বড় প্রত্যাশাটা অবশ্য দাঁড়ায় এই যে, সংবাদপত্র পুঁজিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। ব্যক্তিমালিকনার জায়গায় সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলবে। নদীতে ঢেউ থাকে, বালিও থাকে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষকে বালুতে পরিণত করতে চায়, ঢেউকে বাদ দিয়ে। কারণ বালুকে পণ্য করা যায়, ঢেউকে তা করা যায় না। মানুষের প্রত্যাশা হলো সংবাদপত্র ঢেউয়ের পক্ষে দাঁড়াবে। প্রত্যাশাটা বিশেষভাবে এই কারণে যে, বালুর দৌরাত্ম্য এখন সর্বপ্লাবী হয়ে উঠছে; ঢেউগুলো কেবলি মার খাচ্ছে, বালুর হাতে, অর্থাৎ বালুর ব্যবসায়ীদের হাতে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




 আরও খবর