www.muktobak.com

আনন্দ বাজারের খয়রাতি প্রসঙ্গে


 রাজীব আহাম্মদ    ২১ জুন ২০২০, রবিবার, ১০:৫৫    মতামত


নিয়মিত ভারতীয় নিউজ চ্যানেল দেখি। খবরের জন্য নয়, নির্মল বিনোদন পেতে। মেজাজ খারাপ হলে দীপক চৌরাশিয়া, অর্নব গোস্বামী, সুধির চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকত, নাবিকা কুমার, আমিষ দেবগন, অঞ্জনা ওম কাশ্যপদের 'রিপোর্টিং' দেখি। মন ভাল হয়। আনন্দবাজারের 'খয়রাতি' শব্ধে যারা ক্ষুব্ধ, তাদেরও দেখতে অনুরোধ করছি। আনন্দ না পেলে পয়সা ফেরত গ্যারান্টি।

ভারতীয় চ্যানেল 'টাইমস নাউ' গত শুক্রবার লাদাখে 'নিহত' ৩৫ চীনা সৈনিকের পরিচয় 'প্রকাশ করে'। দাবি করা হয়, তারা ভারতীয় পাল্টা হামলায় নিহত হয়েছেন। 'টাইমস নাউ'র দাবি চীনের গ্লোবাল টাইমস হতাহতদের পরিচয় প্রকাশ করেছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পরিষ্কার হয়, গ্লোবাল টাইমের বরাতে যে খবর চালানো হয়েছে, তা আদতে হোয়াটসঅ্যাপের 'মিম'। মজার ছলে কেউ বানিয়েছে। এ ঘটনা, ভারতীয় সংবাদমাধ্যামের দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার হাজার হাজার উদাহরণের একটি মাত্র।

গত ১৫ জুন চীনের হামলায় ২০ ভারতীয় সেনা নিহত ও ১০ জন আটক হন। কিন্তু ভারতীয় টিভি পত্রিকা খুললে, শোক নয় উচ্ছ্বাস দেখতে পাবেন। কারণ, গায়েবি সূত্রের দাবি অনুযায়ী ৪৩ জন চীনা সেনাকে মারতে সক্ষম হয়েছেন মোদী। ঠিক পড়েছেন, ভারতীয় সেনা নয়, মোদীর পরিকল্পনায় মরেছে ৪৩ চীনা সেনা। যদিও এখনো কোনো নিরপেক্ষ সূত্র নিশ্চিত করেননি, আদৌ কোনো সেনা নিহত হয়েছেন কী না। কিন্তু নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গের কল্পনায় পৈশাচিক আনন্দ ভোগ করছে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম।

নিহত সেনার বাবার মুখ দিয়ে বলানো হচ্ছে, খুনের বদলে খুন চাই। তবে সব মিডিয়া হাউজ এক রকম নয়। ভারতে 'নিউজলন্ড্রি', 'নিউজক্লিক', 'লাল্লানটপ', 'ধ্রুব রাঠী', 'দেশভক্ত'সহ বেশ কিছু বিকল্প মিডিয়া গড়ে উঠেছে। যারা সত্য খবর দেখায় ও শোনায়।

রিপাবলিক, নিউজ-১৮, জি নিউজ, আনন্দবাজার, এবিপি না দেখে; এসব বিকল্প মিডিয়া দেখলে সত্য খবর পাবেন। মূলধারার মধ্যে এনডিটিভি যথেষ্ট দায়িত্বশীল। তারা বরাবরই সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও ওয়ার হিস্টিরিয়া তৈরি থেকে দূরে রয়েছে। বিশেষ করে এনটিভির রাবিশ কুমার নির্ভিক সাংবাদিকতার উজ্জ্বলতম নাম। টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্যা হিন্দু, টেলিগ্রাফসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংবাদপত্রও একই রকম দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে।

হয়ত বাজার ধরার তাগিদ ও কথিত দেশপ্রেম তাদের চীন-ভারত উত্তেজনার সময় পদস্খলিত করেছে। নয়ত উগ্রজাতীয়তাবাদের যে ভয়াল স্রোত বইছে. তার বাইরে থেকে দেশপ্রেমকে ঝুঁকিতে ফেলার সাহস পাচ্ছে না তারা। মোদী সরকারের ছয় বছরে ভারতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, প্রশ্ন করার সুযোগ শেষ করে দেওয়া হয়েছে। যে প্রশ্ন করছে, তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে আরএসএস ও করপোরেট পৃষ্ঠপোষক মিডিয়া।

সরকারকে প্রশ্নকারীর দেশপ্রেম নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। শেষে তাকে জনগণের সামানে দেশোদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়া হচ্ছে। রাহুল গান্ধী প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাকে জোকার বানিয়ে দিয়েছে ভারতীয় মিডিয়া। ভারতে মিডিয়া একটি ন্যারেটিভ দাঁড় করিয়েছে, তা হলো সরকারকে প্রশ্ন করা দেশদ্রোহিতা। এবার আসি চীন-ভারতের সাম্প্রতিক সংঘাত প্রসঙ্গে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো গত মে মাসেই চীনের পরাজয় ঘোষণা করে।

১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীনের বিরুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছিল ভারত। এ স্মৃতি থেকে ভারতীয় সাংবাদিকরা বারবার চীনকে সতর্ক করছিল, আজকের ভারত বাষট্টির ভারত নয়। অনেক শক্তিশালী। চীন পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, গত ৫৮ বছরে ভারত ১০ কদম এগিয়ে থাকলে চীন হাজার কদম এগিয়েছে। কিন্তু মোদীর সামনে চীনকে নগন্য হিসেবেই তুলে ধরেছিল ভারতীয় মিডিয়া।

খেয়াল করুন, ভারতীয় সেনার সামনে নয়। সব কিছুই মোদীময়। মোদীকে যুদ্ধ দেবতার তকমা দিয়েছে। চীন পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইছে, এমন খবরও প্রচার করা হয়েছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে চালানো বিমান হামলাকে মোদীর মাস্ট্রারস্ট্রোক বলে আখ্যা দেওয়া হয়। বারবার প্রচার করা হয়, মোদী ঘরে ঢুকে মেরেছে। সেনার অর্জন মোদীর। কিন্তু সেনার বিপর্যয় সেনার। মোদী কোনো কিছুর জন্য দায়ী নয় মিডিয়ার চোখে। এ ন্যারেটিভ রাতদিন প্রচার করা হচ্ছে।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী রাজনৈতিক দল বিজেপির শাসনামলে, ভারত দারিদ্র, বেকারত্বে রেকর্ড গড়েছে। পন্ডিত নেহেরুর সবচেয়ে বড় অবদান; তিনি ভারতে কিছু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী তা ১৫ বছরেও ধ্বংস করতে পারেননি। নরসিমা রাওয়ের জামানায় স্বাধীনচেতা প্রধান নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশন ভারতের নির্বাচনকে একদম টাইট করে দিয়েছিলেন। ইন্দিরা যা পারেননি, মোদী তা পেরেছেন।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন এখন মোদীর সুরে কথা বলে। আদালতে রায় না দিয়ে ' কৌতুক' লেখে। প্রধান বিচারপতি অবসর নিয়ে রাজ্যসভায় এমপি হন। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক চলে সরকারের ইশারায়। বিরোধী দল প্রশ্ন তুললে মিডিয়া তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলে চুপ করিয়ে দেয়। ভারতের মিডিয়ার সকল প্রশ্ন বিরোধী দলগুলোর প্রতি। বিজেপির মাউথস্পিকার রিপাবলিক টিভির সম্পাদক অর্নব গোস্বামীর 'মাই কোশ্চেন ইজ টু অপজিশন' খুব বিখ্যাত ট্রল দেশটিতে।

সরকারের সকল কুকর্মের সহযোগী হয়েছে মিডিয়া। হিটলার, মুসেলিনির উত্থান পর্বে জার্মানি, ইতালির মিডিয়াকে একই ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। হিটলার জামানায় জার্মান মিডিয়া যেমন সব সমস্যার মূলে ইহুদিদের খুঁজে পেতো, ভারতীয় মিডিয়া এখন মুসলমানদের খুঁজে পায়। করোনা থেকে বেকারত্ব, চীনের হুমকি থেকে স্বচ্ছ ভারত অভিযানে ব্যর্থতা, সব কিছুর জন্য মুসলমানরা দায়ী। ঠিক এই কারণে ভারতীয় মিডিয়ার কাছে বাংলাদেশ একটি মুসলমান দেশ ছাড়া কিছুই নয়।

মোদীকে গত ছয় বছরে বিরোধীদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়নি 'গদি মিডিয়া'র রক্ষাকবজে। গদি মিডিয়া তাকে যেসব প্রশ্ন করেছে সেগুলোও নিরেট বিনোদন। মোদী ভোটের আগে ১০/১২টি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন। তাতে প্রশ্ন ছিল, মোদী কী করে এত বিপুল কাজ করেছেন পাঁচ বছরে! মোদী দিনে ১৯ ঘণ্টা কীভাবে কাজ করেন! মোদী কেনো পরিশ্রান্ত হন না! এসব তেলে ভরা সাক্ষাতকারের উদ্দেশ্য ছিল, মোদীকে লৌহমানব হিসেবে তুলে ধরা। মোদীর বিকল্প নেই বলে প্রচার করা।

এই যখন ভারতের অবস্থা, তখন কেনো আপনারা আনন্দবাজারের খয়রাতি শব্দে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। তারচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা কি অস্বীকার করতে পারব বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম একই পথের পথিক নয়? আমাদের গণমাধ্যম দায়িত্বশীল ও সত্যবাদী; এ দাবি কি করতে পারব? আমাদের সংবাদ মাধ্যম সাহসের সঙ্গে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করছে কি?

যারা প্রশ্ন করছে তাদের স্পেস দিচ্ছে? যারা প্রশ্ন করছে, তাদের টার্গেট করছে না? গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষায় সরব হয়েছে? আমাদের কথিত সিনিয়র সাংবাদিকরা তেলের বাটি নিয়ে বসে নেই? তাদের সব প্রশ্ন কি বিরোধীদলের প্রতি নয়? যদি সব উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে বুঝতে হবে ভারতের মিডিয়ার সঙ্গে আমাদের খুব একটা তফাৎ নেই।

(গত ২০ জুন ভারতের বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারের একটি রিপোর্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল সমালোচনা চলছে। এ বিষয়ে দৈনিক সমকালের স্টাফ রিপোর্টার রাজীব আহাম্মদের ফেসবুকে দেয়া প্রতিক্রিয়াটি মুক্তবাকের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।)




 আরও খবর