www.muktobak.com

গণমাধ্যম যেভাবে সংকট মোকাবিলা করতে পারে


 জুয়েল দাশ    ২ জুলাই ২০২০, বৃহস্পতিবার, ৯:০৬    মতামত


আমি অর্থনীতি বা ব্যবস্থাপনা বিষয়ের ছাত্র বা বিশেষজ্ঞ নই। তাই এসকল বিষয়ে পাঠ্য ব্যবস্থাপনা কলা-কৌশল কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার হিসাবনিকাশগুলো তেমন একটা বুঝি না। সাধারণ মানুষ আমি, সাধারণ বিবেচনা দিয়েই চিন্তা করি। বুঝতে পারি ভয়াবহ এই করোনা মাহামারি কালে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী কিংবা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়ে চাকরি হারানো একজন ব্যক্তি কি ধরনের মানসিক অস্থিরতার মধ্যে আছেন, কি ধরনের দুর্বিষহ জীবন তিনি যাপন করছেন।

গার্মেন্টসসহ পণ্য উৎপাদনমুখী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মী এই ধরনের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যেই লাভ করেছেন। আর নতুন করে এখন যোগ হচ্ছে গণমাধ্যম কর্মীদের দুর্ভাগ্য। অথচ করোনা মহামারির এই সময়ে ডাক্তার, পুলিশসহ প্রশাসনিক নানান ব্যক্তিদের মতো গণমাধ্যম কর্মীরাও নিজেদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে মানুষকে প্রয়োজনীয় সংবাদ সরবরাহ করে যাচ্ছেন। এই কাজ করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন কেউ কেউ। নিজেদের পরিবারকেও করছেন ঝুঁকিগ্রস্ত। আর এই সংকটের মধ্যেই নতুন করে যোগ হলো তাদের চাকরি হারানোর ভয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি।

পাঁচ বছর সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করেছি, দেড় বছরের মতো কাজ করেছি গণমাধ্যমে এবং সাড়ে পাঁচ বছর ধরে সাংবদিকতা বিষয়ে পাঠদান করছি । পেশাদার সাংবাদিকরা প্রতিষ্ঠান থেকে কি-ই বা সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন তা ভালোভাবেই জানি। কয়টি প্রতিষ্ঠান ওয়েজ বোর্ড মেনে তাদের কর্মীদের বেতন-ভাতা দিয়ে থাকে, আর কয় পয়সায় বা সাংবাদিকরা সঞ্চয় করতে পারেন তাও বেশ বুঝি।

গণমাধ্যম কর্মীরা সারা বছর অন্যদের অধিকারের জন্য লেখেন-বলেন। কিন্তু কয়জনই নিজেদের সমস্যার কথা প্রকাশ করতে পারেন। অন্য প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য ভয়েস তোলেন, দুর্নীতির খবর প্রকাশ করেন। আর নিজের প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের সঠিক খবরটাই তারা জানতে পারেন না, বা তাদেরকে জানানো হয় না কিংবা জানলেও বলতে পারেন না। পাছে মালিকপক্ষ রুষ্ট হন।

প্রাতিষ্ঠানিক এতসব চাপের মাঝে থেকেও তারা পেশাদারি দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে যান। তাই গণমাধ্যমের মতো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান যখন করোনার কারণে আয় হচ্ছে না অজুহাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় তখন স্বভাবতই কষ্ট লাগে। কষ্ট লাগে আমার প্রিয় সাংবাদিক ভাই-বোনদের ভীতসন্ত্রস্ত ভগ্নহৃদয়ের ব্যথা চিন্তা করে। কষ্ট পাই এই শিল্পের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ চিন্তা করে। আচ্ছা করোনা সংকটে কর্মী ছাঁটাই কি একমাত্র সমাধান?

ধরা যাক ‘ক’ নামক একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করলো ৩০০ টাকা মূলধন নিয়ে (৩০০ এর পরে লাখ বা কোটি বসিয়েও পড়তে পারেন)। এই মূলধনের ১০০ টাকা প্রতিষ্ঠান মালিকের নিজের, ১০০ টাকা ধার বা ঋণ করা, বাকি ১০০ টাকা প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পত্তি।

ব্যবসা শুরুর প্রথম মাসে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যয় ধরলাম ১০০ টাকা, ঋণের সুদ ধরলাম মাসিক ভিত্তিতে পাঁচ টাকা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা বাবদ ২০ টাকা, কর্মীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৬০ টাকা এবং বিবিধ ১৫ টাকা ব্যয়। এই হিসাবে প্রথম মাসে সর্বমোট ব্যয় হয় ২০০ টাকা। অর্থ্যাৎ মূলধন ৩০০ টাকার ২০০ টাকা ব্যয় হলো প্রথম মাসে। ধরলাম প্রতিষ্ঠানটি প্রথম মাসে ১০০ ইউনিট পণ্য প্রতিটি দুই টাকায় বিক্রয় করে আয় করলো ২০০ টাকা। সাথে আছে বিজ্ঞাপন বাবদ আয়। সে আয় ধরলাম ন্যূনতম ৫০ টাকা। সর্বমোট আয় ২৫০ টাকা।

এই আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে নিট আয় থাকে ৫০ টাকা। হিসাবের খাতিরে ধরে নিলাম এভাবে বারো মাসে আয় হয় ৬০০ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ বছর ধরে কাজ করলে আয় হয় ৬০০*৫=৩০০০ টাকা। এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি তার ১০০ টাকা ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছে। তাই সুদ বাবদ খরচ নেই। স্থায়ী সম্পত্তি ১০০ টাকাসহ প্রতিষ্ঠানের মোট ব্যালেন্স এখন ৩১০০ টাকা। এই টাকা ব্যাংকে রেখে প্রাপ্ত সুদ, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানটির সুনাম এবং মালিকের অন্য ব্যবসায়ের রক্ষণ করার মাধ্যমে অর্জিত পরোক্ষ আয়ের কথা বাদই দিলাম।

এভাবেই বছর বছর পুঞ্জিভূত হয় বিপুল পরিমান অর্থ। যা থেকে কিছু পাওয়া তো দূরের কথা, একজন কর্মী সে অর্থের হিসাবও পান না। তিন-চার মাস হলো দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হয়েছে ।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির অন্য সেক্টরের মতো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানও যে সংকটে পড়েছে তা দৃশ্যমান। অর্থনৈতিক এই সংকট বৈশ্বিক। এরমধ্যেই মালিকরা বলতে লাগলেন আয় বন্ধ। আসলে আয় যে একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে তা নয়। কিছুটা কমেছে কিংবা ধীরগতির হচ্ছে। আর এতেই মালিকরা তাদের সব গেলো গেলো বলে শোরগোল তোলা শুরু করে দিয়েছেন।

প্রশাসনিক কর্তাদের বলে দিলেন খরচ কমাতে হবে। আর এজন্য তারা বেছে নিয়েছেন কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো সহজ পথ। একটুও ভাবছেন না যেসব কর্মীদেরকে ছাঁটাই করছেন তাদেরই শ্রমে-মেধায় এরমধ্যেই জমা করেছেন হাজার কোটি টাকার ব্যালেন্স। আসলে মালিকরা চান না তাদের জমা ব্যালেন্সে হাত দিতে। বরং কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ব্যয় কমাতে।

চিন্তাও করেন না যে আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের সবার অংশগ্রহণেও ব্যয় হ্রাস করা যেতে পারে। আসলে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সবাইকে নিয়ে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলার পথে অনেকটাই প্রতিবন্ধক। এই ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি শুধু নিজেরটাই চিন্তা করেন। ভাবেন না অন্যদের কথা। এই বিপদে তাই আজ আমরা ভেঙে পড়ছি। হারাচ্ছি আমাদের মানবিকতা।

কারোনা মহামারিতে গণমাধ্যম শিল্পে সৃষ্ট এই সংকট উত্তরণে সম্মিলিতভাবে কিছু প্রচেষ্টা চালানো যেতে পারে। এর জন্য মালিকপক্ষের মানবিক হওয়ার বিকল্প নেই। কর্মীদের প্রতি একটু মানবিক, একটু সহানুভূতিশীল হয়ে, ভালো ব্যবহার দিয়ে একসাথে সংকট মোকাবিলা করা যায়। আলোচনা করে নিলে অবশ্যই দুর্যোগ কেটে গেলে কর্মীরা করোনার সাময়িক এই ক্ষতি টিমওয়ার্কের মাধ্যেমে আবার পুষিয়ে দেবেন। এখন প্রতিষ্ঠানের অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হবে। এক টুকরো কাগজ কিংবা এক ফোঁটা কালিও যেন নষ্ট না হয়। খুঁটিনাটি সব খরচ হিসাব করে চালাতে হবে।

শীর্ষ কর্মকর্তাদেরকে দেওয়া বাড়তি সুবিধা আপাতত বন্ধ রেখে তা সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি, সঠিক সংবাদ পরিবেশনে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। গুজব, মিথ্যা কিংবা আংশিক সত্য সংবাদ পরিবেশন করলে দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের আস্থা নষ্ট হয়। এতে সুনাম কমে গিয়ে প্রতিষ্ঠান পড়বে মহাসংকটে।

বলা হয়, বর্তমান সরকার মিডিয়াবান্ধব। সংকট মোকাবিলায় অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাই সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ও পরামর্শ নেয়া যেতে পারে । কর্মীদের বেতন-ভাতা-বোনাস আপাতত কিছু কমিয়ে হলেও সবার চাকরির স্থায়ীত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এই দুর্যোগে চাকরি হারানোর অর্থ একজন ব্যক্তির জন্য নানা সমস্যা।

মনে রাখতে হবে একটি চাকরি মানে একটি পরিবারের মুখের হাসি। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মুনাফা একটু কম হলেও মালিকপক্ষকে তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে কর্মীদের শ্রমে ও মেধায় গড়ে ওঠে একটি প্রতিষ্ঠান। দুর্দিনে তাদেরকে ছুঁড়ে ফেলা একজন ভালো মানুষের গুণ হতে পারে না। সেই সাথে আরেকটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে কর্মীদের শ্রমে ও মেধায় ভর করে এতোদিনে বিশাল অর্থ পুঞ্জিভূত হয়েছে।

সংকটকালে সেই অর্থ থেকে কিছু অংশ ভর্তুকি হিসেবে তাদের জন্য ব্যয় করা আপনার নৈতিক দায়িত্ব। পরিশেষে বলবো, সাংবাদিক ইউনিয়নসহ নিজেদের পেশাদারি সংগঠনসমূহকে শক্তিশালী করে সাংবাদিকদেরকে তাদের অধিকারের জন্য একসাথে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি ভাবতে হবে গণমাধ্যম শিল্পকে কিভাবে টেকসই করা যায়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক




 আরও খবর