www.muktobak.com

গণমাধ্যমের সততা


 ড. মারুফ মল্লিক    ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার, ৭:৫০    দেশ


সংবাদমাধ্যম যে কোন গবেষণায় সেকেন্ডারি সোর্সের অন্যতম বড় সোর্স। কিছুদিন ধরে আগ্রহের জায়গা থেকে খোঁজ নিচ্ছিলাম কোন দল থেকে কতজন যুদ্ধাপরাধী মনোনয়ন পেয়েছে। অন্তর্জালে বিভিন্ন পত্রিকা ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে সমকালের একটি সংবাদে চোখ আটকে গেল। সংবাদটি আমি নিজে শেয়ারও দিয়েছিলাম। কোন দল থেকে কতজন যুদ্ধাপরাধী মনোনয়ন পেলেন; এ বিষয়ে বিশ্লেষনও প্রস্তুত করি পত্রিকায় প্রকাশের জন্য। এ নিয়ে আরো ঘাটাঘাটি করতেই দেখা গেল সমকালের সংবাদে ভয়ঙ্কর ভুল রয়েছে।

সমকালে ১২ ডিসেম্বর শেষের পাতায় প্রকাশিত এক সংবাদে দেখা যাচ্ছে নুরুল ইসলাম আনছার প্রামানিক নামে একজন বিএনপি থেকে কুষ্টিয়া-৪ আসনে মনোনয়ন পেয়েছের। যার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে এই লোক বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাননি। হয়ত বিএনপি থেকে মনোনয়ন পত্র ক্রয় করেছিল। ওই আসনে একাধিক মনোনয়ন পাওয়াদেরও একজন ছিলেন সম্ভবত। কিন্তু তিনি বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন পাননি। বিএনপি থেকে ওই আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি। ৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল। তাই ১২ ডিসেম্বর সমকাল ওই আসনে প্রামানিককে কিভাবে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশ করে? এই সংবাদ আমাকে বিভ্রান্ত করেছে। দেশের সবাইকে বিভ্রান্ত করেছে।

প্রতিবেদনটি তৈরির পর নিশ্চয়ই সম্পাদনা টেবিল ঘুরে প্রকাশিত হয়েছে। সমকালের একজনেরও কি মনে হয়নি যে তথ্যগুলো আরেকটু যাচাই করে নেই। সমকালের অনেকেই আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত। সম্পাদককেও খুব ভালো করে জানি। এরপরও বলছি এই প্রতিবেদনটি সমকালের চূড়ান্ত অদক্ষতা অথবা মিথ্যাচারের নমুনা। অদক্ষতা বা মিথ্যাচারের একটা সীমা থাকে। তথ্যের নামে বাংলাদেশের গণমাধ্যম আমাদের কি দিচ্ছে?

এখন যদি সমকালের উপর নির্ভর করে আমার ওই বিশ্লেষন প্রকাশিত হতো তবে এই ভুলের দায় কে নিত? আমি, সমকাল নাকি যেখানে আমার বিশ্লেষন প্রকাশিত হতো সেই পত্রিকা? মানুষ কেন অর্থ দিয়ে ভুল তথ্য নিবে? সমকাল দেশের প্রথম শ্রেণীর একটি দৈনিক। এর উপর যদি আমরা নির্ধিদ্বায় নির্ভর করতে না পারি তবে তথ্যের জন্য পাঠকরা, গবেষকরা যাবে কই? পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এ নিয়ে কোনো প্রতিবাদও হয়নি। সমকালও ভুল স্বীকার করেনি। ভুলতথ্যটিই যেন সবাই মেনে নিলাম।

সমকাল একটি নমুনা মাত্র। বাংলাদেশে গণমাধ্যম বলতে আর কিছু নাই। আছে চরম দলবাজী। সাংবাদিকতার এখন দাসযুগ চলছে। গণমাধ্যম কর্মীরা ভৃত্যের ন্যায় আচরণ করছে। সব পেশাতেই অসৎ লোকজন আছে। কিন্তু বাংলাদেশে সাংবাদিকতাই একমাত্র পেশা যারা অন্যকে নৈতিক, ন্যায় পরায়ন ও সৎ হওয়ার ছবক দিয়ে নিজেরা চরম অনৈতিক, অসততা ও দলবাজীতে নিমজ্জিত।

সততার দিক থেকে এখন গণমাধ্যম কর্মীদের গনিকাদের থেকেও নিচে রাখি। গনিকারা অর্থের বিনিময়ে খদ্দেরকে তৃপ্তি দিয়ে থাকে। সেখানে তারা কোনো সেক্সডল বা অন্য কিছু দিয়ে প্রতারণা করে না। কিন্তু এই গণমাধ্যম কর্মীরা নিয়মিতই প্রতারণা করে যাচ্ছে। ভুলভাল তথ্য ছড়ানোর জন্য সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দায়ী করে থাকি। প্রচলিত গণমাধ্যমও এর জন্য কম দায়ী না। বরং গণামাধ্যমের ব্যর্থতার কারণেই সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে অনেকে সুযোগ নিচ্ছে। গণমাধ্যম তার জায়গায় সঠিক থাকলে এত গুজবের ছড়াছড়ি থাকতো না।

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ভূমিকা খুবই ভয়ঙ্কর। হাতে গোনা কিছু বাদ দিলে বাংলাদেশে গণমাধ্যম এক মাফিয়ামাধ্যমে পরিনত হয়েছে। এটাও বাংলাদেশের গণতন্ত্রনায়নের পথে বিরাট এক বাধা।


ড. মারুফ মল্লিক: ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অব অরিয়েন্ট অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব বন। 

(১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া পোস্ট। লেখকের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত-মুক্তবাক)

আরও পড়ুন :  সম্পাদকীয় : সংবাদপত্রের দর্পণ

 




 আরও খবর