www.muktobak.com

ভবিষ্যতের কাগজ হোক যুগান্তর


 সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম    ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, শুক্রবার, ৯:৩৪    দেশ


একুশ শতকের সঙ্গে সমান্তরাল যাত্রায় যুগান্তর উনিশ বছরের মাইলফলক অতিক্রম করে কুড়ি বছরে পা রাখছে, দৃশ্য মাধ্যমের প্রাবল্যের এই যুগে একটি দৈনিক সংবাদপত্রের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় একটি অর্জন। তবে যুগান্তর-এর অর্জন শুধু যাত্রাটা সচল রাখতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর আরও অর্জন কুড়ি শতকের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-প্রত্যয় এবং আকাঙ্ক্ষাকে তার প্রতিদিনের পাতাগুলোর ভেতর ধরে রাখায়, মানুষের জন্য সংবাদ এবং সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি ও অন্যান্য নানা সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে দাঁড়ানোয় এবং তরুণদের আস্থা ও নির্ভরতা অর্জন করায়। শুরু থেকেই পত্রিকাটি একটি লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছিল এবং তা ছিল সাহসের সঙ্গে সত্য কথাটি বলে যাবে; কারও মন জুগিয়ে চলবে না, বরং মানুষের মনটা যাতে জাগে, সে চেষ্টায় নিয়োজিত হবে। সে লক্ষ্য অনেকটাই যুগান্তর যে পূরণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

আমাদের দেশের সরকারগুলোর মুখে আমরা একটা কথা সবসময় শুনে এসেছি সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ এ সরকার করেনি, করবেও না। বাস্তবে অবশ্য চিত্রটা ভিন্ন। যুগান্তর-এর মতো একটি পরোক্ষ- কোনো কোনো সময় প্রত্যক্ষ- নানা চাপ, বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, এবং প্রভাবশালী মহলের বিরোধিতা। প্রথম দুটি বিষয় পাঠকরাও অনুভব করেন, তৃতীয় বিষয়টি সবসময় তাদের গোচরে আসে না। যেমন গত নির্বাচনে যুগান্তর-এর প্রকাশক একটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি সরকারি দলের প্রার্থী ছিলেন না। শুরু থেকেই তিনি প্রতিপক্ষের নানা হেনস্তার শিকার হন। তার সমর্থক ও কর্মীদের ওপর, তার নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা হয়। হামলা থেকে যুগান্তর-এর সহযোগী মাধ্যম যমুনা টিভিও রক্ষা পায়নি। এক সময় এই বিপন্ন প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। এ বিষয়টি একটি পুরনো সমীকরণকেই তুলে ধরে : জোর আছে যার, মুল্লুকটা তার। এই সমীকরণের আড়ালে গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য-আকাক্সক্ষা সবই আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।

প্রার্থীর ওপর না হয় হামলা হল, আমরা প্রশ্ন করতে পারি, কিন্তু যুগান্তর বা যমুনা টেলিভিশন কেন আক্রমণের লক্ষ্য হবে? হবে, অথবা হয়েছে, কারণ এ দুই প্রতিষ্ঠান নির্বাচন নিয়ে যেসব অনাচার হচ্ছিল, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছিল, তা নিয়ে প্রতিবেদন দিচ্ছিল। আমাদের রাজনীতির তথা রাজনীতিবিদদের একটি অবস্থান হল, সত্য পক্ষে গেলে তাকে প্রবল সমর্থন দেয়া, বিপক্ষে গেলে একে শুধু অস্বীকার করা নয়, এর টুঁটি চেপে ধরা। দীর্ঘদিনের রাজনীতি চর্চায় এটি সর্বজনীনতা পেয়েছে। যুগান্তর-কে আরও অনেক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হবে। তবে নির্বাচনকালীন প্রতিকূলতা থেকে একটি শিক্ষা পত্রিকাটি গ্রহণ করতে পারে, যুগান্তর পরিবারের বাইরের, এমনকি এ বৃহত্তর পরিবারের সঙ্গে আদর্শিক দ্বন্দ্ব আছে এমন ব্যক্তিদেরও নায্য অধিকার নিয়েও যেন তারা লড়াই করে। যুগান্তর-এর মালিকানায় যারা আছেন, তাদের কোনো কাজে সুনীতির ব্যত্যয় ঘটলেও যেন তা তদন্ত করে। কাজটি কঠিন, আমাদের দেশে প্রায় অশ্রুপূর্ব, কিন্তু যুগান্তর তা করে দেখালে মানুষের মনে এর অবস্থান শীর্ষে চলে যাবে।

প্রতিদিন যুগান্তর আমার জন্য যা নিয়ে আসে, তার একটি হ্রস্ব তালিকাও আমাকে তৃপ্ত করে। যেমন, প্রতি সকালের যুগান্তর-এ আমি একনজরে দেশের রাজনীতি ও সমাজের একটি চিত্র পাই; আমার প্রিয় ক্ষেত্র শিক্ষা, যেখানে আমি সক্রিয়- তারও একটা ছবি মোটামুটি পাই, সরকার ও বিরোধীদের উভয়ের কণ্ঠ শুনি, এবং শুরু থেকেই দেখে এসেছি, বিরোধী চিন্তার জন্য পত্রিকাটি যথেষ্ট পরিসর দিচ্ছে, নতুন নতুন পরিসর তৈরি করে দিচ্ছে। গ্রামবাংলার একটা বিশাল ছবিও চলমান হয় এর পাতায়, এবং আমি বুঝি যুগান্তর তরুণদের, নারীদের এবং সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য খুবই সক্রিয়। সংবাদ পরিবেশনে পত্রিকাটি যত্নশীল, এবং ঘটনার, ইস্যুর, বিষয়ের কার্যকরণ এবং ভেতরের যুক্তিগুলো মেনে তা করা হয় বলে একটা পূর্বাপরতাও তাতে আমরা পাই। তা ছাড়া কোন সংবাদটা মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা ভেবে নিয়েই শিরোনামগুলো সাজানো হয়, ফলে এর প্রথম পৃষ্ঠাটি একটি পুরো সংবাদ-দিনকে চমৎকারভাবে তুলে ধরে।

নদীদূষণ নিয়ে, সরকারি প্রকল্পে অথবা স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুর্নীতি নিয়ে অথবা শিক্ষাচিত্রের নানা দ্বীনতা নিয়ে যুগান্তর যখন সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করে, মনে হয় সবটাই যেন জানা হয়ে গেল। আমি দেখেছি ক্ষেত্রভিত্তিক কোনো সংবাদ (যেমন ব্যাংকিং খাতের লুটপাট অথবা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কোনো দুর্বলতা) বা প্রতিবেদন তৈরির আগে যে গবেষণা প্রয়োজন, সংবাদকর্মীরা তা নিষ্ঠার সঙ্গে করেন। শিক্ষা নিয়ে যুগান্তর অনেক যুগান্তকারী প্রতিবেদন ছেপেছে। অনেক সময় প্রতিবেদক আমার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, আমার কাছ থেকে তথ্য অথবা মন্তব্য নিয়েছেন। সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় প্রকাশেও যুগান্তর তথ্যনিষ্ঠ। এর উপসম্পাদকীয়গুলোতে বিরোধী কণ্ঠ বেশ স্পষ্ট। সরকার সমর্থক এবং বিরোধী দলগুলোর (বিশেষ করে বিএনপি) সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা এসব কলাম লেখেন। এতে বেশ একটা কথোপকথন বা বিতর্কেরও স্বাদ পাওয়া যায়।

পাঠকরা যুগান্তর-এর নিরপেক্ষতার পাশাপাশি একাত্তর, বঙ্গবন্ধু, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকারের ব্যাপারে এর অবিচল আস্থাকে সহজেই চিহ্নিত করতে পারেন। ২. যেহেতু একুশ শতকের সমান বয়সী যুগান্তর, এবং একুশ শতককে আমরা যেহেতু নানাভাবে বিশেষায়িত করেছি- ডিজিটাল; উত্তর মানবিক (যেহেতু মানব পরিবর্তিত হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্সের যুগে আমরা ঢুকে পড়েছি); অনলাইন বা ভার্চুয়াল; স্থিরতাহীন, নোঙ্গহীন; সত্যিকার অর্থে গোলকায়িত অথচ পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর গোলকায়নবিরোধী এবং উগ্রচিন্তার বিস্তারে খণ্ডিত হওয়া গণতন্ত্র ও সমাজচেতনার প্রভাবে ক্রমশ সংকীর্ণ হওয়া, এবং উত্তর-আণবিক মহাবিপর্যকারী মহাযুদ্ধের কালো ছায়ার নিচে দাঁড়ানো শতাব্দী- পত্রিকাটিকে এর নানা প্রকাশকে ধরতে হবে, এর সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে হবে। প্রথমত যুগান্তরকে মনে রাখতে হবে একটি দৈনিক পত্রিকা সত্যিকার অর্থে মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই পথে অনেকদূর এগিয়েছে পত্রিকাটি।

একে এখন জনজীবনে আরও গভীর দৃষ্টি দিতে হবে। নিত্যদিনের সমস্যাগুলো থেকে নিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের সংকট খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল, এবং শিক্ষাব্যবস্থায় শহরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে, অথচ রেলপথকে ঢেলে সাজিয়ে দ্রুতগতির ট্রেন চালুর মাধ্যমে বড় শহরগুলোকে শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই; আমাদের নদীগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে কিন্তু যারা তা করছে তারা ক্ষমতাশীল হওয়ার কারণে কোনো প্রতিকার নেই; আমাদের ব্যাংকিং খাতে এত দুর্ব্যবস্থা, অথচ সবই চলছে আগের মতোই, আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেমে দাঁড়িয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পোস্ট অফিসের ভূমিকায়। এসব নিয়ে আরও ঝড় তুলতে হবে এর পাতায়। হ্যাঁ ঝড়ই, কারণ ঝড়ই পারে পুরনোকে ভেঙে উড়িয়ে নতুনের জন্য জায়গা করে দিতে। দ্বিতীয়ত আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল প্রয়োজন, তা এখন নেই। বিরোধীদের নামে যারা থাকবেন সংসদে, তারা আগামী পাঁচটি বছর অস্তিত্ব সংকটেই ভুগবেন। সরকারের ভুলভ্রান্তি ধরিয়ে দিতে কতটা সফল তারা হবেন, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে। একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে মানুষ আস্থা রাখছে সংবাদপত্রের ওপর। গত পনেরো বছর ধরেই বস্তুত তা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যুগান্তরকে ওই গঠনমূলক ভূমিকায় নামতে হবে, ভুল ধরিয়ে, বিকল্প এগিয়ে দিতে হবে। পত্রিকাটি এমনিতেই কাজটা করছে, তবে আরও তীব্রতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

তৃতীয়ত যেখানেই অপচর্চা, অপ-আদর্শবাদিতা, উগ্রতা, ঘৃণা, বিভাজন, হিংসা এবং অসূয়ার প্রকাশ হবে, এসবের বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা হবে, সেখানেই প্রবলভাবে দাঁড়াতে হবে। মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগুলোকে মোকাবেলা করতে হবে, একটা সুন্দর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ সবের যে স্থান নেই, মানুষকে তা বোঝাতে হবে। মানুষ বোঝে, কিন্তু প্রতিবাদের পথ পায় না, পথ দেখিয়ে দিতে হবে। চতুর্থত সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে, আমরা অগ্রগতি অর্জন করছি বটে কিন্তু গরিব মানুষের সঙ্গে ধনীদের ফারাকটা জ্যামিতিক হারেই বাড়ছে। এ বৈষম্য মানবতার বিরোধী, এ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। সরকার যেন নানা দরিদ্রবান্ধনব কর্মসূচির মাধ্যমে, তাদের সব রকমের সাহায্য সহায়তা করে, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বেচ্ছা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে বৈষম্য কমায় সে লক্ষ্যে কণ্ঠস্বরটা তীব্র রাখতে হবে। এবং পঞ্চমত তরুণদের নিয়ে এগোতে হবে, তারাই ভবিষ্যৎ, তারাই ভবিষ্যতের কাণ্ডারি, ভবিষ্যতের দেশটাও তাদের।

যুগান্তর হোক সেই ভবিষ্যতের কাগজও। যুগান্তর পরিবারের সবাইকে এর কুড়ি বছরে পদার্পণের মুহূর্তে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

(১ ফেব্রুয়ারি যুগান্তরের বিশ বছরপূর্তিতে দেয়া বিশেষ সাময়িকিতেভবিষ্যতের কাগজ হোক যুগান্তর লেখাটি লেখেন কথা সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। মুক্তবাকের পাঠকদের জন্য লেখাটি দেয়া হলো। -মুক্তবাক)




 আরও খবর