www.muktobak.com

একজন আয়শা আকাশীর গল্প


 সাগর হোসেন তামিম    ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, শনিবার, ১২:৪৮    দেশ


একজন আয়শা সিদ্দিকী আকাশী, যিনি গ্রামীণ সাংবাদিকতার একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তৃণমূলে সাংবাদিকতায় অবদান রাখায় তিনি এবছর বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল পদক লাভ করেছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার হাতে পদক তুলে দেন। আয়শা আকাশী এই সম্মানকে দেখছেন নারী সাংবাদিকতার এক আলোক বর্তিকা হিসেবে। তিনি মনে করেন,লক্ষ্য অটুট থাকলে সাফল্য নিশ্চিত। তার ছুটে চলার পিছনে রয়েছে এক নিরন্তর সংগ্রাম।

অজানা সেই গল্প জানতে ছুটে গেলাম মাদারীপুর শহরের কলেজ গেটের পাশে দৈনিক সুবর্ণগ্রাম অফিসে। কম্পিউটার টেবিলে বসে শ্যামবর্ণের অল্পবয়স এক নারী সংবাদ সম্পাদনা করছেন। অবাক হলাম। এতটুকুন মেয়ের এতো পরিচিতি! কৌতুহল বেড়ে যায়। ভেতরে পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক এবিএম বজলুর রহমান মন্টু খান বসে আছেন। সংবাদকর্মী হিসেবে তার সাথে চেনা জানা আগে থেকেই। কুশল বিনিময় করে জানতে চাইলাম বার্তা সম্পাদক আয়শা সিদ্দিকা আকাশীর কথা।

তিনি জানালেন আয়শা সিদ্দিকা আকাশীর অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা। কবিতা লিখতে এসেই “দৈনিক সুবর্ণগ্রাম” এর সাথে পরিচয় আয়শা সিদ্দিকার। একজন কবি থেকে আজকের সাংবাদিক আয়শা সিদ্দিকা। সাংবাদিকতাই যেনো তার নেশা ও পেশায় পরিণত হয়েছে। সেই ২০০১ সাল থেকে “দৈনিক সুবর্ণগ্রাম” এর সাথে তিনি জড়িত হন তার কবিতার মাধ্যমে, জানালেন মন্টু ভাই। কবিতা লেখার পাশাপাশি ২০০২ সালের দিকে “দৈনিক সুবর্ণগ্রাম” এর নারী পাতায় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে ফিচার লেখা শুরু করেন। একের পর এক ফিচার করে মাদারীপুরের নারী সমাজকে জাগিয়ে তোলার যে কাজ তিনি হাতে নিয়েছেন,তাতে তিনি অনেকটা সফল।

কথা হয় আত্মপ্রত্যয়ী আয়শা সিদ্দিকা আকাশীর সাথে। জানা যায়,একজন নারী একেবারে শূণ্য থেকে কিভাবে পরিশ্রমের মাধ্যমে হতে পারে; প্রেরণাদায়ক সেই গল্প। বাবার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা হয়েছে। বাবার অবসরের পর স্বপরিবারে জেলা সদর মাদারীপুরে বাস। আয়শা আকাশীর নানাবাড়ি শহরতলি হাজির হাওলা গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম তার। মাদারীপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাস করেন আয়শা সিদ্দিকা আকাশী। পৈত্রিক নিবাস বগুড়ার সারিয়াকান্দি গ্রামে হলেও যমুনা নদীতে ঘরবাড়ি ভাঙ্গার কারণে তেমন যোগাযোগ নেই।

এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন স্থানীয় চরমুগরিয়া মহাবিদ্যালয় কলেজে। লেখাপড়ার পাশাপাশি শুরু করে কবিতা চর্চা। পরিচয় হয় কয়েকটি সামাজিক সংগঠনের কর্মীদের সাথে। তাদের মধ্যে ছিলেন মাদারীপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা ‘সুবর্ণগ্রাম’ এর প্রকাশক ও সম্পাদক এবিএম বজলুর রহমান মন্টু খান। তিনি সুযোগ করে দেন দৈনিকটিতে কাজ করার। আয়শা আকাশী লুফে নেন সেই সুযোগ। ইতিমধ্যে এইচএসসি পাস করেন। কবিতার পাশাপাশি লেখা শুরু হয় প্রবন্ধ-ফিচার। পরিচয় ঘটে মাদারীপুরের প্রবীণ সাংবাদিক শাহজাহান খানের সাথে। তার আন্তরিক সহচর্যে লেখালেখির স্পৃহা আরো বেড়ে যায়।  সুযোগ আসে একটি জাতীয় দৈনিকে মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি হিসেব কাজ করার। সরকারী নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। পরে এমএ পাস করেন তিনি। সর্বশেষ তিনি বঙ্গবন্ধু ল’ কলেজ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেন। জানতে চাইলাম, সাংবাদিকতা করা এমনিতেই কঠিন। তারপরও একটি জেলা শহরে একজন নারীর সাংবাদিক হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জগুলো কেমন? বললেন, সাংবাদিকদের বাধা অনেক। আর নারী সাংবাদিক হলে তো কথাই নেই।  একটু স্বার্থে আঘাত লাগলেই কর্তাব্যক্তিদের টেলিফোন। কখনো হুমকি-ধামকি। কোনো কিছুই তাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। আয়শা পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবিচল।

জেলা সদর মাদারীপুরসহ উপজেলাগুলোতে বার্তা সম্পাদক ও সাংবাদিক হিসেবে আয়শা আকাশীর নাম ছড়িয়ে পড়ে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান নারী সাংবাদিক হিসেবে। ২০০৮ সালে ২১ শে বই মেলায় কর্ণেল খলিলুর রহমানের সহযোগিতায় ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশন থেকে ‘এক জলকন্যার রির্পোটের শিরানাম’ নামে একটি কবিতার বই বের হয়। বইয়ের জন্য গাংচিল সাহিত্য পরিষদ থেকে পান পদক, গল্প লেখার জন্য পান সুনীল সাহিত্য বিশেষ পুরস্কার ও মাদারীপুর জেলায় প্রথম নারী সাংবাদিক হবার জন্য আবৃত্তি সংগঠন ‘মাত্রা’ তাকে দেয় বিশেষ সম্মমনা পুরস্কার। ২০১১ সালে জেলায় সফল নারী হিসেবেও তাকে সম্মাননা ক্রেস্ট দেয়া হয়। এছাড়াও তিনি স্কয়ার গ্রুপ থেকে ২০১৬ সালে কীর্তিমতী সম্মননা পান। অনেকের মধ্যে পরিচয় হয় পরিবেশবাদী সংগঠন ফ্রেন্ডস অভ নেচারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাজন মাহমুদের সাথে। শুরু হয় পরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন কাজ। একজন সক্রিয় সদস্য হয়ে উঠে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ‘আমরাই পারি’ এর। কাজের পরিধি বেড়ে গেলে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার কনা’র সহযোগিতায় নিজেই প্রতিষ্ঠিত করে নকশি কাঁথা নামের একটি নারীদের সংগঠন।

২০০৯ সালের শেষের দিকে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে একটি প্রথম শ্রেণীর দৈনিকে মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন করেন। এসময় একজন নারী হিসেবে তার পক্ষে জাতীয় দৈনিকে কাজ করা সম্ভব না-এমন কথা শুনতে হয়েছে বহুবার। এসব কথা শুনে আয়শা আকাশীর মনে আরো উৎসাহ উদ্দীপনা বেড়ে যায়। তার দৃঢ় প্রত্যয় ছিলো পুরুষরা পারলে একজন নারী হয়ে তিনি কেন পারবেননা। তাকে পারতেই হবে। দমে যাননি। প্রত্যয়ী আয়শা আবেদন করেন এবং নিয়োগও পান। এখনও কাজ করছেন দারুণ পেশাগত দক্ষতায়।

আয়শা বলেন, আমি এখন সিড়ির নিচের ধাপে। আমাকে সিড়ির শেষ ধাপে যেতে হবে। প্রচেষ্টা, আর প্রত্যয়ের পাশাপাশি এজন্য প্রয়োজন সকলের উদার মনের সহযোগিতা।

বৃহত্তম ফরিদপুরসহ দক্ষিণ-পচিশ্চমাঞ্চলের স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার একমাত্র নারী বার্তা সম্পাদক তিনি। যা মাদারীপুরবাসীর জন্য গর্বের বিষয়। তাকে দেখে এই চ্যালেঞ্জিং পেশায় আরো নারীরা এগিয়ে আসবে। আয়শা আকাশীর মতোই নারীই আমাদের দিন বদলের উদাহরণ।

সাগর হোসেন তামিম : সাংবাদিক,  চ্যানেল টুয়েন্টিফোর, মাদারীপুর।




 আরও খবর