www.muktobak.com

চকবাজার ট্র্যাজেডি: সংবাদকর্মীর অভিজ্ঞতা


 নুরুজ্জামান লাবু    ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রবিবার, ১:০৩    দেশ


রাতের মধ্যেই একশ ট্রাকে লাশ গুম করছে!

শুক্রবার বিকেলে চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ের উত্তর কোনায় দাঁড়ায়ে আছি। কিছুটা বিরক্ত । কৌতুহলী আর উৎসুক মানুষের প্রচন্ড ভীর। আশেপাশের তো আছেই, দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ আসছে আগুনে পোড়া জায়গাটা দেখতে। নারী ও শিশুদেরও নিয়া আসছে। যেন বা পর্যটন এলাকায় পরিণত হইছে চুড়িহাট্টার মোড় কিংবা হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন।

মসজিদের উত্তর কোনায় একটা মুদি দোকান ছিল। পুইড়া গেছে। আমি দাঁড়ায়ে আছি তার কিনারে। আরো অনেকেই আছেন। কেউ কেউ চলে যাইতেছেন তো তার কয়েকগুন আসতেছেন, এইরকম একটা অবস্থা ।

হঠাৎই কথাটা কানে আসলো।
"রাতের বেলা একশটা ট্রাকে কইরা লাশ গুম করছে। কোথাও নিয়া ফালায়ে দিছে।"

আগুনের ফলোআপ কাভার করতে গেছি। সাংবাদিক হিসেবে এই তথ্য তো আমার কাছে বিশাল ব্যাপার। কথাটা শুইনা আমি ডানে তাকাইলাম, আড়চোখে।

বছর ত্রিশের এক যুবক। তার সঙ্গে বোরকা পড়া এক নারী। তীব্র কৌতুহল নিয়া তারা পুইড়া যাওয়া ওয়াহেদ ম্যানশন দেখেতেছে। চেহারায় শোকাতুর কোনো ছাপ নাই। আগুনে পুইড়া যাওয়া ধ্বংসাবশেষ দেখতে সুযোগ পাওয়ায় কিঞ্চিত আনন্দ আছে তাদের মুখচ্ছবিতে।

আমি কানটা খাড়া কইরা রাখলাম।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

: "এই বিল্ডিংয়েই তো পাঁচ শ' মানুষ থাকে।" ওয়াহেদ ম্যানশনের দিকে আঙুল দিয়া দেখাইলো।
: "আশেপাশে আরো কতগুলা বিল্ডিং পুড়ছে। তাইলে হিসাব করেন।" বইলা তাকাইলো সঙ্গের নারীর দিকে । আপনি করে বলায় বুঝলাম তারা স্বামী-স্ত্রী না। দেবর-ভাবী বা প্রতিবেশী পরিচিত হইতে পারে।

: "হ, তা তো হবোই।" নারীর চোখে বিস্ময়। ঠিক উত্তর নয়, যুবকের কথায় সায় দিলেন তিনি । এইবার আরো বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুবকটি বলতে থাকলো-
: "যে কয়টা লাশ দেখাইছে, ওগুলা সব রাস্তার। সত্তুর-আশিটা। রাস্তায়ও তো আরো লাশ আছিল।"

ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার ধ্বংসস্তুপে দাঁড়ায়ে তখন পিটিসি দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেছিলেন সময় টিভির একজন রিপোর্টার। চারতলার ছাদে পত্রিকার একজন ফটোগ্রাফার।আর ভীরের মধ্যে মসজিদের সামনে কয়কজন টিভি ক্যামেরাম্যানকে দাঁড়ায়ে থাকতে দেখা যাইতেছে, পাশাপাশি।

ত্রিশ সেকেন্ড বিরতি দিয়া সেই যুবক আবার বলতে থাকলো-
: "দেখেন, দেখেন সাংবাদিক কই উঠছে, মরবো তোওওও। আর ছবি তুইলা বা ভিডিও কইরা কি করবো, দেখায় তো না। দেখায় তো দুই-তিন মিনিট।"

আবারো ত্রিশ সেকেন্ডের বিরতি। তারপর বললো-
: "এই যে এইখানে কম কইরা হইলেও পাঁচ শ' সাংবাদিক আছে। ভিডিও করবো কিন্তু দেখাবো না। দেখাবো ক্যামনে সরকারের নিষেধ আছে না।"

আমি আর নিতে পারলাম না। ধৈর্য্য হারা হইলাম একটু। দ্রুত হাঁটা ধরলাম। মোটরসাইকেলের কাছে আইসা তালা খুইলা স্টার্ট করলাম। একটানে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে।

সরকারি হিসাবে মর্গে লাশ আসছে সাতষট্টিটা। সরকারি হিসাবের কথা বললাম কারন এর মধ্যে পরিচিত কেউ কেউ আমার কাছে বেসরকারি হিসাবে লাশের সংখ্যা জানতে চাইছিলেন। আমি বলছি, লাশের আবার সরকারি-বেসরকারি হিসাব আছে নাকি? লাশ তো লাশই। সনাক্ত হইলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করবো।

তারা মনে মনে বিরক্ত হইছেন। আমারে হয়তো গাধা ভাবছেন। তাদের ধারনা, সরকার এইখানে লাশের সংখ্যা নিয়া লুকোচুরি করতেছে। আগুনে আসলে মারা গেছে আরো অনেক বেশি।

এই প্রশ্ন আমি সাংবাদিক সহকর্মীদের কারো কারো কাছেও শুনছি। তারা ভালো ভালো গণমাধ্যমের সঙ্গেও সম্পৃক্ত!

তো এখন এত বেশি গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ক্যামেরাওয়ালা ফোনের যুগে লাশ গুম কইরা সংখ্যায় কম দেখানো সম্ভব কি না? এতে সরকারের কি এমন লাভ হইতে পারে? সাতষট্টিটা দেখানো গেলে বাকিদের দেখাইতে সমস্যা কোথায়? আর বাকিদের স্বজনেরাই বা কোথায়? তারা নিখোঁজের কমপ্লেইনও বা করেন না কেন?

চুড়িহাট্টার সেই যুবকরে আমার ততটা শিক্ষিত মনে হয় নাই। কিন্তু যখন দেখি শিক্ষিত একেকটা মানুষ এইরকম কথা বলেন। তখন বিস্মিত হই। খালি এইবার না, প্রত্যেকটা ঘটনা-দুর্ঘটনার পর এইরকম প্রশ্নের মুখোমুখি হইতে হয়। মাঝেমধ্যে ভাবি, আমিই কি তবে ভুলের মধ্যে আছি? আমি এইসব বিশ্বাস করি না কেন?

তবে চুড়িহাট্টার সেই যুবকের একটা কথা আমার কানে খুব কইরা বাজছে। কথাটা হইলো- "দেখাবো ক্যামন কইরা, সরকারের নিষেধ আছে না।" এইটা কঠিন একটা কথা। এইটা অর্ধেক মিথ্যা কথা, অর্ধেক সত্য। এই ঘটনায় না হোক, অন্যান্য নানা ঘটনার কারনে ধীরে ধীরে সমাজে এই কথাটা প্রতিষ্ঠিত হইতেছে। যা একাধারে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যেও।

অবশ্য রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোরও যাচ্ছেতাই অবস্থা। সমন্বয়হীনতা ছিল তীব্র। কারন লাশের সংখ্যা নিয়া ফায়ার ও পুলিশ বলেছিল প্রথমে সত্তুর, শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি জানাইছিল আটাত্তর, পরে জেলা প্রশাসন ও মর্গ কইলেন সাতষট্টি। যদিও এইসব কারনেই মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বপন হইয়া যায়, যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

সন্ধ্যায় অফিসে ঢুইকা দেশি-বিদেশি পত্রিকা-অনলাইনে ঢু মারলাম। কেউ কেউ আটাত্তর লিখছে। ঠিকাছে, কিন্তু টাশকি খাইলাম বিশ্বখ্যাত নিউইয়র্ক টাইমসের সংখ্যা দেইখা, তারা ছাপছে এক শ' দশ।

তো, ক্যামনে কি?

লেখক: বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক। লেখাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থেকে নেয়া।




 আরও খবর