www.muktobak.com

সচেতন-শুভ্র-সুন্দর মানুষ ছিলেন তিনি


 সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, সারা বাংলা ডট নেট    ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ৯:৫৭    দেশ


২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান প্রেস ইন্সটিটিউট বাংলাদেশের মহাপরিচালক শাহ আলমগীর। তার মৃত্যুতে মুক্তবাকের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা। তার স্মরণে সারাবাংলা ডটনেটে প্রকাশিত লেখাটি মুক্তবাকের পাঠকদের জন্য উপস্থাপিত হলো।  

সকালে বৃষ্টি থামার পর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের খোঁজ খবর করছিলাম। এই নিরুত্তাপ নির্বাচনি খবরাখবরের মাঝেই আমার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিল একটি খবর। জানতে পালাম পিআইবি’র মহাপরিচালক, বিশিষ্ট সাংবাদিক শাহ আলমগীর লাইফ সাপোর্টে। একটু পরই ছোট বোন সুমি ফোন করে বলল, ‘তিনি আর নেই।’ সকাল সোয়া ১০টায় রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচে) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শাহ আলমগীর।

শাহ আলমগীর ভাইকে চিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে। তিনি এবং তার স্ত্রী মায়া আপা, সদা হাসিতে স্নেহে আমাদের আগলে রাখতেন সবসময়। মধ্য আশির দশকে সাংবাদিকতায় প্রথমবর্ষে পড়ার সময় আমি যখন বাংলাদেশ অবজারভারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, আলমগীর ভাই তখন দৈনিক সংবাদের ডেস্কে কাজ করেন।

৩৫ বছরের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি একাধিক ইলেক্ট্রনিক ও প্রিণ্ট মিডিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে শাহ আলমগীরের সাংবাদিকতা জীবন শুরু। এরপর তিনি কাজ করেন দৈনিক জনতা, বাংলার বাণী, আজাদ ও সংবাদ-এ। প্রথম আলো প্রকাশের সময় থেকেই তিনি পত্রিকাটির সাথে জড়িত ছিলেন এবং ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাস থেকে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত যুগ্ম বার্তা-সম্পাদক-এর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি টেলিভিশন মিডিয়ায় কাজ শুরু করেন। চ্যানেল আই-এর প্রধান বার্তা সম্পাদক, একুশে টেলিভিশনে হেড অব নিউজ, যমুনা টেলিভিশনে পরিচালক (বার্তা) এবং মাছরাঙা টেলিভিশনে বার্তা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শাহ আলমগীর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

শাহ আলমগীর ভাল সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট ছিলেন। তার আমলেই প্রেস ইন্সটিটিউট একটি সক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ইউনিয়ন নেতাদের সম্পর্কে সাধারণ ধারণা, ‘এরা অসৎ হয়, এরা সাংবাদিকতাকে পুঁজি করে আর্থিক ও বৈষয়িক ধান্দায় ব্যস্ত থাকে’। সেই ধারণা ভেঙ্গে দিতে যে কয়জন সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতা হতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাদের অন্যতম শাহ আলমগীর। তিনি ইউনিয়ন নেতা হয়েও পেশাদারিত্বের জায়গায় সক্রিয় থেকেছেন আজীবন।

তিনি সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের কল্যাণ এবং সার্বিক উন্নতিতে কাজ করার অভীপ্সায় ছিলেন সবসময়। যখনই দেখা হতো, জানতে চাইতে কিভাবে আরও ভাল করা যায় সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, কিভাবে গণমাধ্যমকে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ নানাভাবে কাতর জীবন যাপন করেন। শাহ আলমগীর সবসময় চেয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াতে। তার চিন্তার সবটাই জুড়ে ছিল সাংবাদিকদের কথা। গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীদের কল্যাণ ও উত্থানের প্রসঙ্গ এবং প্রাধান্য ছিল তার সব আলোচনায়।

তার ভেতর আত্মবোধ ও আত্মবিশ্বাসের জাগরণ ছিল। এই আত্মবিশ্বাসের কারণেই তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই প্রেস ইন্সটিটিউট হয়ে উঠে সর্বস্তরের সাংবাদিকদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের সর্বোচ্চ স্থান। শুধু ঢাকা নয়, তিনি চেয়েছিলেন তার পদধূলি পৌঁছে যাক প্রান্তিক পর্যায়েও। প্রকৃত সাংবাদিকতা ঠিক কোথায় হয়, সেই অন্বেষণ করেছেন তিনি। বারবার তিনি এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটেছেন সাংবাদিককতা ও সাংবাদিকদের উত্থানের উপায় খুঁজতে।

শাহ আলমগীর বড় সাংবাদিক ছিলেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় মানুষ ছিলেন তিনি। ছোট-বড় সব পত্রিকা ও তাদের কর্মীদের সাথে সমান আচরণের চেষ্টা করতে দেখেছি তাকে। এই পেশার তাবৎ মানুষের সঙ্গে তার আত্মিক যোগ সংস্থাপিত হয়েছিল বলেই তার মৃত্যুতে আজ বহু মানুষ বেদনায় ছটফট করছেন। তিনি মানুষ ছিলেন, যথার্থ মানুষ, ভাল মানুষ, সচেতন-শুভ্র-সুন্দর মানুষ।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা,  এডিটর ইন চিফ, সারাবাংলা ও জিটিভি

 




 আরও খবর