www.muktobak.com

সাংবাদিকতায় সততা ও বস্তুনিষ্ঠতা


 মো. শাহ আলমগীর, মহাপরিচালক, পিআইবি    ৪ মার্চ ২০১৯, সোমবার, ৫:২১    দেশ


২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান প্রেস ইন্সটিটিউট বাংলাদেশের মহাপরিচালক শাহ আলমগীর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি- জাবিসাস কর্তৃক আয়োজিত সাংবাদিকতা ও ক্যারিয়ার বিষয়ক কর্মশালার সার্টিফিকেট বিতরণের দিন প্রধান অতিথি হিসেবে শাহ মো. আলমগীর এর বক্তব্য দেন। অনুলিখন: আদীব আরিফ।


গণমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বা ভিত্তি।আর সংবাদকর্মীরা হলেন এই ভিত্তি বা স্তম্ভের এক একটি ঈট বা ক্ষুদ্র একক যাদের সাষ্টিকতায় এই স্তম্ভ দাড়িয়ে আছে। শুধু দাড়িয়ে নেই বরং একটি রাষ্ট্রের অন্যান্য তিনটি ভিত্তি বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সামঞ্জ্যতা বা যোগসূত্র বিধান করে সংবাদমাধ্যম আজ এক নম্বর ভূমিকা পালন করছে।একটি রাষ্ট্র ও সমাজে জনগন ও সরকারের কি দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং রাষ্ট্রের কোথায় কি হচ্ছে ইত্যাদি সবার সামনে তুলে ধরে গণমাধ্যম এক মহান দায়িত্ব পালন করছে।সে হিসেবে গণমাধ্যম বর্তমানে সমাজের গণআদালত, বিবেক ও মূল্যবোধের মানদন্ড।

একজন সংবাদকর্মী এ আদালতের ও মূল্যবোধের একজন সেবক হিসেবে রয়েছে তার মহান দায়িত্ব। একজন ডাক্তার যেভাবে অসুস্থ রোগীর উপর চাকু, কেচি ও মেডিসিন প্রয়োগ করে তাকে সুস্ত করে দ্বিতীয় ঈশ্বরের ভূমিকা পালন করে ঠিক তেমনি একজন সংবাদকর্মী তার কলম অস্ত্র ব্যবহার করে সমাজের দুর্নীতি, অবক্ষয় দূর করে অসুস্থ সমাজকে সুস্থ করে তুলে। তাই সংবাদকর্মীরা হলেন সমাজের দ্বিতীয় দেবতা। আর তাই এই দেবতারা যখন তাদের দুটি বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ঠ “সততা ও বস্তুনিষ্ঠতা” ভুলে যায় তখন এই দেবতারাই হয় সমাজের অনিষ্ঠ বা শয়তান।


সাংবাদিকতার জগতে সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার দুটি বড় উদাহরণ হল জেনিন কুক ও মোনাজাত উদ্দিন।প্রথমেই আসি জেনিন কুক এর বিষয়ে।জেনিন কুকই বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি যাকে “পুলিৎজার পুরস্কার’ দিয়ে আবার ফিরিয়ে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ তার সততার অভাবে।জেনিন কুক ছিলেন “ওয়াশিংটন পোষ্ট’ এর একজন রিপোর্টার। তিনি মাদকতা নিয়ে একটি রিপোর্ট করেন এবং সেখানে তিনি বার বছরের “জিমি” নামের একটি শিশুর সাক্ষাৎকার তুলে ধরেন। 

এই রিপোর্টের জন্য পুলিৎজার কর্তৃপক্ষ ১৯৮২ সালে তাকে পুরস্কার ঘোষণা করে। তার এই পুরস্কারের জন্য ওয়াশিংট পোস্ট এর সম্পাদক তাকে ডেকে রিপোর্টটি সম্পর্কে জানতে চান কিভাবে এই ১২ বছরের বালকটির সাক্ষাৎকার গ্রহন করলো। তখন জেনিন কুক স্বীকার করেন যে জিমি নামে আসলে কোন বালকের অস্তিত্ব নেই এবং তিনি যে সাক্ষাৎকারটি লিখেছেন তা ছিল তার কল্পনার ফসল। একথা শুনে পত্রিকাটির সম্পাদক তাকে বললেন তমি কি মনে করো এই অসৎ কাজ করার পরেও তোমার সাংবাদিকতা করার অধিকার আছে। অবশেষে তাকে চাকরি থেকে বহিস্কার করা হয়। এবং পুলিৎজার কর্তৃপক্ষ যখন জানতে পারে যে জেনিন কুকের এই রিপোর্টটির জন্য তার চাকরি চলে গেছে তখন পুলিৎজার কর্তৃপক্ষও তার কাছ থেকে “পুলিৎজার পুরস্কার” ফিরিয়ে নেয়। অবশেষে জেনিন কুক ইতিহাসে সাংবাদিকতায় অসততার জন্য ঘৃণীত ব্যক্তি হিসেবে জায়গা পায়।

আরেকজন ব্যক্তি হলেন মোনাজাত উদ্দিন।যিনি বাংলাদেশর সাংবাদিকতার জগতে এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।মোনাজত উদ্দিন একবার তার প্রথম জীবনে একটি রিপোর্ট করতে মফস্বল এলাকায় যান। তখন তিনি খবর সংগ্রহের জন্য গ্রামের একটি চায়ের দোকানে বসেন।আগের দিনে তখন গ্রামের চায়ের দোকানগুলো ছিল সংবাদের জন্য উপযুক্ত জায়গা।অর মোনাজাত উদ্দিন তাই চায়ের দোকানে বসে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে লাগলেন। তখন

চায়ের দোকানদার তার কানেকানে বললো শুনছেন একটা ঘটনা,
মোনাজাত বললো কি বলুন
শোনেন অমুক গ্রামে এক লোকের দাড়িতে মৌমাছি বাসা বেধেছে
-বলেন কি কিভাবে?
-লোকটি বললো মৌমাছিরা তাদের বাসা পাল্টানোর জন্য বিলের উপর দিয়ে উড়ে যচ্ছিল আর তখন লোকটি মৌমাছির সামনে পড়লে মৌমাছিরা তার দাড়িঁতে বসে পড়ে।এখন ঐ লোকটিকে একবার দেখার জন্য এলাকার সব মানুষ তার বাড়িতে ভিড় করছে।
-মোনাজাত বললো ভালো।শোন তুমি আর কাউকে এই বিষয় বলবা না্ আমি নিউজ করি তারপর।
মোনাজাত দ্রুত নিউজ করে পাঠিয়ে দেয় একটি স্মনামধন্য জাতীয় দৈনিক “দৈনিক আজাদ” এ ।

তারপরের দিন পত্রিকাটি নিউজটি বক্স করে প্রথম পেজে ছাপায়( দাড়িতে মৌমাির চাক)। এবং মোনাজাত উদ্দিন এদিক উদিক ঘুরতে থাক খুশিতে একটি ভালো নিউজ করেছে সেই আনন্দে।এবার ইত্তিফাক পত্রিকা তার ঐ এলাকার প্রতিনিদিকে পাঠায় ঐ নিউজটির আরো তথ্য জানার জন্য কিন্তু প্রতিনিধি সরেজমিনে গিয়ে জানতে পারে যে “মৌমাছি লোক” নামে কারো অস্তিত্ব নেই এবং মোনাজাত যে নিউজটি করেছে তা ভূয়া খবর।

তার পরেরদিন ইত্তেফাক পত্রিকা প্রথম পেজে খবর ছাপায় “হলুদ সাংবাদিকতার প্রকৃষ্ট উদাহণ”। এরপর মোনাজাত উদ্দিনের চাকরি চলে গেলে তিনি সেই চায়ের দোকানদারকে ধরে বলেন, ‘চল আমার সাথে, কেন ভূঁয়া খবর দিলি’ তখন ঐ চায়ের দোকানদার বললো “আরে মিয়া ‍তুমি কত বড় সাংবাদিক হইছো তা বুঝার জন্যইতো ভূঁয়া খবর দিয়া তোমারে পরীক্ষা করলাম”।
এরপর থেকে মোনাজাত উদ্দিন আর কখনো খবর শুনেই নিউজ করেনি। যতক্ষণ না সরেজমিনে গিয়ে সত্যতা যাচাই করতো। একেই বলে খবরের বস্তুনিষ্ঠতা সরাসরি মাঠে গিয়ে তারপর নিউজ করা।তাই আজকাল যারা সাংবাদিকতা করে তাদের জন্য সততা ও বস্তুনিষ্ঠতা খুবই প্রয়োজন। তা না হলে সাংবাদের নামে প্রতিদিন শুধু কতগুলো আবর্জনা তৈরা করে জাতিকে বিভ্রান্ত করা ‍উচিৎ না।






 আরও খবর