www.muktobak.com

মিডিয়াবাহিত মনোরোগ


 তুষার আব্দুল্লাহ    ২৮ মার্চ ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ১১:৪৫    দেশ


আমরা যখন গণমাধ্যম বা মিডিয়াবাহিত ব্যাধির কথা বলছি তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবপোর্টাল এবং সংবাদপত্রে মি-টু নিয়ে হই চই চলছে। নিজ কাজের জায়গায় বা সমাজে যারা প্রতিষ্ঠিত, পরিচিত, জনপ্রিয় তাদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠছে। মত তৈরি হচ্ছে এই অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং যিনি অভিযোগ করছেন, তাদের কাছে মানুষরা হয়তো সত্য-মিথ্যার এক প্রকার পরিমাপ করতে পারবেন।

কিন্তু যারা অভিযুক্তকে দূর থেকে জানেন। অভিযোগকারীকে চেনেন না বা দুজনকেই দূর থেকে চেনেন? তারা এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন? দেখতে পেলাম জনপ্রিয় বা পরিচিত মানুষের বিরুদ্ধে যখন এই অভিযোগ উঠল, তখন প্রথমে সাধারণ মানুষ দ্বিধায় পড়ে গেল। বিস্মিত হলো। মানুষটিকে যেমন করে জানতেন, আনা অভিযোগের সঙ্গে সেই মিল খুঁজে পেল না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবপোর্টাল এবং সংবাদপত্রে যেভাবে কথা হচ্ছে, তাতে দুই পক্ষই নানা তথ্য দিচ্ছে। এই তথ্যগুলো সত্য কী মিথ্যা তা যাচাই করতে পারছেন না সাধারণ মানুষ।

কিন্তু যেহেতু অভিযোগ উঠেছে, কথা হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে, অতএব মানুষটি এমনটা হতেই পারেন। এই দিকটি হয়তো আড়ালে ছিল। মুখোশ চরিত্র নিয়ে তিনি প্রকাশ্য ছিলেন। অতএব মানুষটির সাহিত্য, অভিনয় বা পেশাগত প্রতিভায় এতদিন যে মুগ্ধতা ছিল, তা পানসে হয়ে গেল। মিডিয়ার সাধারণ ভোক্তাদের কেউ কেউ সিদ্ধান্তই নিয়ে নিলেন, অভিযুক্ত মানুষটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই রয়েছে। পরিমাণে বেশ কম থাকতে পারে। এই যে এশদিন মানুষটিকে ঘিরে যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা তার আলোটি নিভে গেল মুহূর্তেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অথবা সংবাদমাধ্যমে যে অভিযোগটি এলো, তা কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অমীমাংসিত রয়ে গেল। অভিযোগটি রয়ে গেল সংশয়ের মোড়কে। এমনও হতে পারে, অভিযুক্ত এবং অভিযোগকারী উভয়ের মধ্যে স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল স্বল্পমেয়াদের জন্য। সেই সম্পর্কের লেনদেনে অভিযোগকারীকে লোকসান গুনতে হয়েছে বলেই দীর্ঘ বিরতির পর অভিযোগ আনা।

মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে। আবার মানুষটি প্রকৃত অর্থেই যৌন নিপীড়ক। পরিবার, সমাজ তাকে জানে ভুলভাবে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত দোষী এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া কি ঠিক? আবার উভয় মাধ্যমেই আমরা দেখতে পেলাম অভিযোগকারী কেন ওই অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে গিয়েছিলেন, এতদিন কেন প্রকাশ করেননি? এই প্রশ্ন তুলে অভিযুক্তকারী সম্পর্কে যে সমাজের এক প্রকার ধারণা আছে, সেখানেও সংশয় প্রবেশ করানো হচ্ছে। একজন ভোক্তাকে কোনো একজন মানুষ সম্পর্কে দ্বিধার দিকে ঠেলে দিচ্ছে গণমাধ্যম। ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেওয়ারও এক প্রকার প্ররোচনা থাকে। কারণ গণমাধ্যম যখন কাউকে সমাজের কাছে হেয় করতে চায়, তখন একযোগে মাঠে নেমে পড়ে।
একযোগে মাঠে নামতে গিয়েও গণমাধ্যমের মধ্যেও আমরা একাধিক পক্ষ তৈরি হতে দেখেছি। আমরা চলচ্চিত্র অভিনেতা শাকিব খান ও অপু বিশ্বাসের সম্পর্কের টানাপড়েনের সময়ে দেখেছি একটি পক্ষ শাকিব খানকে নির্দোষ ও দায়িত্ববান স্বামী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ঠিকাদারি নিয়েছিল। আরেক পক্ষ শাকিব খানকে দোষী, প্রতারকের পর্যায়ে নেমে সহানুভতি দেখাচ্ছিল অপু বিশ্বাসের প্রতি। তখন আমরা দেখছিলাম গণমাধ্যমের ভোক্তারাও একবার অপুর দিকে, আরেকবার শাকিব খানের দিকে হেলছেন। অর্থাৎ অপু বিশ্বাস ঠিক করছেন নাকি শাকিব খান, এই সিদ্ধান্তের প্রবল প্রভাবক ছিল উভয়ধারার গণমাধ্যম।

২০১৩ সালে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে আট বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন আশরাফুল। আশরাফুলকে নিয়েও গণমাধ্যম বিভক্ত হয়ে পড়ে । কোনো কোনো গণমাধ্যম আশরাফুলকে পারলে শূলে চড়াবে। আবার গণমাধ্যমের একটি অংশ আশরাফুলকে নির্দোষ প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে পাঠক, দর্শকরা বিপদে পড়ে যান। যখন যে পক্ষের বয়ান শোনেন বা পড়েন, তখন সেই মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। অর্থাৎ ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঙ্গে সত্যি যুক্ত ছিল আশরাফুল। পরে অন্য গণমাধ্যম যখন বলছে ফিক্সিংয়ের সঙ্গে আশরাফুলের কোনো যোগাযোগ নেই। তখন আবার দর্শক-পাঠকরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, আশরাফুলের প্রতি অবিচার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভের অর্থ চুরি, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে যখন সংবাদ আসছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মূল গণমাধ্যমে, তখনো কিন্তু মিডিয়ার সাধারণ ভোক্তাদের ধাঁধায় ঘুরপাক খেতে দেখেছি। সরকারঘনিষ্ঠ নয় এমন গণমাধ্যম বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলা, উদাসীনতা, অদক্ষতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসাধুতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংবাদ তৈরি করেছে। কোনো গণমাধ্যমের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বার্থ জড়িত থাকায় তারা, এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের উদাসীনতা ও কারিগরি ত্রুটিকে দায়ী করে রিপোর্ট তৈরি করতে থাকে। সরকারঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমও এই পন্থি ছিল।

সাধারণ পাঠক-দর্শকদের পরিশ্রম করে মূল বা প্রকৃত তথ্য বের করতে হয়েছে। আদৌ কতটুকু সত্য বের হয়েছে তা নিয়েও সংশয় রয়ে গেছে। একই কথা বলতে হয় পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও। বলা হয়ে থাকে কোনো গণমাধ্যম পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে মিথ্যা গল্প তৈরি করেছে। সেই গল্প এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল যে, সেতুমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেতু সচিব কারাগারে যান। পরবর্তীকালে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হয়। কারাগার থেকে বেরিয়ে অন্য বিভাগের দায়িত্ব পান অভিযুক্ত সচিব। কিন্তু পরিবেশিত সেই গল্প কি সত্যিই গল্প ছিল? মিডিয়ার ভোক্তাদের মধ্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলা কিন্তু এখনো চলছে।

আমরা যদি সাগর-রুনি হত্যাকা--পরবর্তী গণমাধ্যমের ভূমিকা দেখি, দেখব এই হত্যাকা- নিয়েও গণমাধ্যম পাঠক, দর্শক, শ্রোতাদের নিজেদের মতো গল্প বলে গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে কোনো একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের যুক্ত থাকার অভিযোগও তোলা হয়। সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে বিরোধ ও বিভক্তি দেখা দেয়। তার প্রভাব পড়ে মামলার তদন্তে এবং অবশ্যই গণমাধ্যম প্রচারিত খবরে। পাঠক, দর্শকদের কখনো জানানো হয়, ওই সাংবাদিক দম্পতির কাছে রাষ্ট্রের গোপন দলিল ছিল তেল-গ্যাস সম্পর্কিত। একটি পক্ষে এই হত্যাকা-ের উপকরণ হিসেবে পরকীয়া যুক্ত করে দেয়। মূল রহস্য কী?

২০১২ সালের সেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য তদন্তের মাধ্যমে ২০১৯ সালেও বেরিয়ে আসেনি। ভোক্তাদের মস্তিষ্কে শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে মিডিয়া পরিবেশিত কতিপয় আখ্যান। আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনুকে। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে পাওয়ার হাউস এলাকার একটি জঙ্গলে পাওয়া যায় তনুর মরদেহ। মূলধারার গণমাধ্যম প্রথমে এই খবর প্রচারের সাহস দেখাতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম খবরটি আসে। পরে মূলধারার গণমাধ্যমে খবরটি এলেও পরিবেশন করতে হয়েছে প্রেসনোট অনুসরণ করে।

মূলধারার দাবিদার গণমাধ্যমকে যেভাবে গল্প বলতে হয়েছে, তারা তেমন করেই গল্প বলে গেছেন। তনুর বাবা-মাকে দিয়েও কোনো কোনো গণমাধ্যম ফরমায়েশমতো গল্প বলিয়ে নিয়েছেন। পাঠক-দর্শকদের বিভ্রান্ত করার এই চেষ্টা কিংবা তাকে মিথ্যা রহস্যের মধ্যে রাখার ফাঁদ পাতা হয়েছিল পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মিতু হত্যাকা-ের সময়ও। ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম মহানগরীর জিইসি মোড় এলাকায় মাহমুদা খানম মিতুকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রথমে এই হত্যাকা- জঙ্গিরা ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে খবর পরিবেশিত হয়। কারণ সহকারী পুলিশ কমিশনার বাবুল আক্তার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযান চালিয়েছেন। তাই প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তার স্ত্রীকে হত্যা করতে পারে তারা। এই খবর স্বল্প সময়ের মধ্যেই পাল্টে যায়, পাল্টানো খবর হলো বাবুল আক্তারই পেশাদার খুনিদের দিয়ে নিজ স্ত্রীকে খুন করিয়েছেন। তার মোবাইলে পরকীয়াবিষয়ক অনেক ক্ষুদ্র বার্তা পাওয়ার খবরও আসে।

দিন যত গড়ায় গণমাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে খবর পরিবেশনার নানা রকম মতলব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বোঝা যায় কোন উৎস থেকে গল্প তৈরি হচ্ছে। গণমাধ্যম সেই গল্পের বাহকমাত্র। অর্থাৎ এ বিষয়টিও অসত্য নয় যে, সাধারণ মানুষকে কোনো ঘটনা বা ইস্যুতে সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে কোনো কোনো পক্ষ। অর্থাৎ স্বার্থগোষ্ঠী মতলবের বাহক গণমাধ্যম।

আমরা এর আরও দৃষ্টান্ত দেখতে পাই সুন্দরবনের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে। সরকারঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো পাঠক-দর্শকদের এ কথা বোঝাতে বেপরোয়া ছিল যে, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলে ওই এলাকার জীববৈচিত্র্য মোটেও নষ্ট হবে না। মূল সুন্দরবন থেকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিরাপদ দূরত্বে রয়েছে। সুন্দরবনের ভেতরের নদী-খাল দিয়ে কয়লা আনা-নেয়া করলে সেখানে কোনো দূষণ হবে না। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় চলছিল রামপাল কোনোভাবেই সুন্দরবনবান্ধব নয়। কোনো কোনো মূলধারার গণমাধ্যমও রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। আমরা দেখতে পাই রামপাল বিষয়ে ইউনেসকোর একটি রিপোর্টকেও গণমাধ্যমগুলো নিজেদের উদ্দেশ্যমতো প্রচার করেছে।

ইউনেসকোর রিপোর্টকে সরকার যেভাবে দেখেছে, কোনো কোনো গণমাধ্যম সেভাবেই পাঠক-দর্শকের কাছে উপস্থাপন করেছে। অর্থাৎ গণমাধ্যম নিজেদের বা কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ উপযোগী তথ্যই শুধু তার গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়। এতে করে গ্রাহক অসম্পূর্ণ তথ্য পেয়ে, কোনো ঘটনা বা ইস্যুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। এবং পরে যখন সে অন্য উৎস থেকে বাড়তি তথ্য পান, তখন বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন। আগের সিদ্ধান্ত থেকে তাকে সরে আসতে হয়।

২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সমাবেশে বোমা হামলা। রমনা বটমূল, উদীচীর সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায়ও আমরা বিভক্ত গণমাধ্যম দেখেছি। তখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রাহক হইনি আমরা। দৃশ্যমাধ্যমও সংখ্যায় দশ পেরোয়নি। ছিল সংবাদপত্রের দাপট। সেই সময় আমরা দেখেছি গণমাধ্যমগুলো নিজেরা কেমন করে অবস্থান নিয়ে নিচ্ছে। ঘটনার পেছনের খবরগুলো তৈরি করছে নিজেদের মতলবমতো। গণমাধ্যমের একাধিক মতলবের তথ্য বা গল্প বাজারে ছাড়া হলে পাঠক, দর্শকের মতো প্রভাবিত হয় তদন্তও। তদন্ত কোন পথে এগিয়ে যাবে বা চার্জশিট কেমন করে লেখা হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াতেও প্রভাব রাখে গণমাধ্যম।

একই ঘটনা আমরা গাজীপুরে আওয়ামী লীগ নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যার পরও দেখা গেছে। খুব দূর-অতীতে যদি আমরা যাই দেখব রীমা হত্যার পরও গণমাধ্যম দেখিয়েছে একই আচরণ। ১৯৮৯ সালের ৯ এপ্রিল স্ত্রী শারমিন রীমাকে হত্যা করেন মনির হোসেন। তদন্তে জানা যায়, এই হত্যার পেছনে ছিল মধ্যবয়সী নারী খুকুর সঙ্গে মনিরের পরকীয়া। সেই সময়কার দৈনিক, সাপ্তাহিকসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রের পাতা ওল্টালে আমরা দেখতে পাব; যার যেমন খুশি গল্প ফেঁদে ছিল এই হত্যাকা- নিয়ে। বেশিরভাগ সংবাদপত্রের মূল লক্ষ্য ছিল কাটতি বাড়ানো। খবরের পেছনের কতটা সত্যি খবর বের করা যায় তা নয়।

আমরা স্মৃতির পাতা ওল্টালে দেখতে পাব সেই সময়ের পাঠকরা কীভাবে এই হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে নিজ নিজ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এবং পরে নিজেকে কতবার পাল্টেছেন। পাঠক বললাম এ জন্য যে, সেই সময়ে বেসরকারি টেলিভিশন ও বেতার ছিল না। সরকারি মাধ্যমে এই প্রকার খবর প্রচারিত হতো না। কাছাকাছি সময়ে চলে এলে পর্যালোচনা করতে হবে জামাআতে মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) উত্থান পর্ব। রাজশাহীর বাগমারা এলাকাকে কেন্দ্র করে যখন সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, শায়খ আবদুর রহমানদের তৎপরতা বাড়ছিল, তখন একদিকে সরকার থেকে বলা হচ্ছিল বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি। অন্যদিকে কোনো কোনো গণমাধ্যম বাংলাভাইকে দর্শক, পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল ওই অঞ্চলের নিপীড়িত মানুষের ত্রাতা হিসেবে। পরবর্তীকালে আমরা দেখত পাই সরকার তার অবস্থান থেকে সরে আসে। সরে আসতে হয় ওই গণমাধ্যমগুলোকে। মাঝে সাধারণ মানুষদের কেউ যে বাংলাভাইকে সত্যিই নেতার আসন দেননি, তা অস্বীকার করা যাবে না।

পরবর্তী সময়ে দেশে জঙ্গি সংগঠনগুলো নানা নামে ফিরে এসেছে। সংগঠিত হয়েছে। জঙ্গি সংগঠনগুলোর সংগঠিত হওয়া, তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েও গণমাধ্যমে নানা উপাখ্যান পরিবেশিত হয়েছে। রাজনীতির নানা পক্ষ জঙ্গি সংগঠনের উত্থানকে ব্যবহার করেছে আপন স্বার্থমতো। এই ব্যবহার করতে গিয়ে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে জঙ্গিবাদ ও কার্যক্রম বিষয়ে রকমারি গল্পও বাজারে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গিবাদ দমন কাজেও এমন গল্পের ব্যবহার করেছে গণমাধ্যম। এই গল্পগুলোর সব যে গণমাধ্যম রচিত তা বলা যাবে না। বেশিরভাগ গল্পই কেবল পাঠ বা পরিবেশন করে যেতে বলা হয়েছে গণমাধ্যমকে। সাধারণ পাঠক, দর্শক গণমাধ্যমের প্রতি বিশ্বাস রেখে প্রতারিত হয়েছেন। ততোদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জঙ্গিবাদের উৎস, সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে সাইবার লড়াই শুরু হয়ে গেছে। সেই লড়াইয়ে নিহত গণমাধ্যম ভোক্তাদের বিশ্বাস।

আমরা স্মৃতির আরও নিকটবর্তী হলে ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের হলি আর্টিজান বেকারি ট্র্যাজেডির কথা বলতে পারি। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তৈরি করা ওই ঘটনায় জঙ্গিরা ওই রাতে ২০ জনকে হত্যা করে যাদের ৯ জন ইতালি, ৭ জন জাপান, ৩ জন বাংলাদেশি এবং ১ জন ভারতীয় নাগরিক। এই জঙ্গি হামলার নকশা কার বা কাদের আঁকা? কারা নেতৃত্ব দিয়েছিল এই হামলায়? এই রহস্য উন্মোচনেও আমরা দেখেছি গণমাধ্যম কীভাবে নিজের মতো করে গল্প নির্মাণ করে। যেহেতু হলি আর্টিজান বেকারিতে সমাজে উঁচুতলার মানুষ বা পরিবারের ওপর আঘাত আসে এবং পুঁজিরও দখলদার তারা। গণমাধ্যম আবার পুঁজির পাহারাদার। সুতরাং এই ঘটনায় গল্প তৈরি করতে হয় সতর্কতার সঙ্গে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার পরদিন সকাল থেকেই হামলাকারীর ছবি চলে আসে। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়, হামলাকারীরা সবাই উচ্চশিক্ষিত তরুণ এবং ধনী পরিবারের সন্তান। ইসলামিক স্টেট বা আইএসের সঙ্গেও তাদের সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত স্থির ছবিতে যাদের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে, যারা পরিবার নিয়ে নিরাপদে বেরিয়ে গেছেন; তারা সবাই উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য এবং একজন শিক্ষকও ছিলেন। আমরা দেখতে পাই আইএসের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া এবং হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় অভিযুক্তদের কাউকে কাউকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য গণমাধ্যম পাঠক, দর্শক হৃদয় স্পর্শ করা কেমন উপাখ্যান তৈরি করেছে। যারা ওই হামলায় নিহত হন। তাদের যেন সন্দেহ না করা হয়, সে জন্যও গণমাধ্যম তাদের অতিমানবীয় করার ব্রত নিয়ে কাজ শুরু করে দেয়। আইএসে যোগ দেওয়া শিক্ষার্থীরা কোন পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেই বিষয়টিকে ঘিরেও আমরা গণমাধ্যমের ভিন্ন অবস্থান দেখেছি, যা পাঠক, দর্শক এবং শ্রোতাদের বঞ্চিত করেছে সঠিক তথ্য থেকে।

আরও কাছে চলে এলে নজর রাখতে হবে ২০১৮ সালের ঘটনাকালকে। কোটা সংস্কার আন্দোলন, কিশোর-কিশোরীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা খবর পরিবেশিত হয়েছে বানের জলের মতো। ফেসবুক ছাড়াও নাম না জানা ওয়েব পোর্টালগুলো ছিল নকল ও মিথ্যা খবর তৈরির কারখানা। এ কারখানাগুলোর মাধ্যমেই কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের আন্দোলন ঘিরে গুজব উড়ে বেড়িয়েছে। পাঠক-দর্শক ওই গুজব বা মিথ্যা খবরে আস্থা আনেনি; তা বলা যাবে না। বরং মিথ্যা, গুজব খবরে প্ররোচিত হয়ে সংঘর্ষ ঘটেছে অহেতুক।

অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ভুগেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মিথ্যা খবরের উৎপাদক নাম না জানা ওয়েব পোর্টালগুলোর মতোই ওই সময় আমরা মূলধারার গণমাধ্যমকেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর উৎপাদন করতে দেখি। যতটা না অদৃশ্য সূত্রের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে, এর চেয়েও বেশি স্বপ্রণোদিত হয়ে আন্দোলন ঘিরে, আন্দোলন সমর্থন করেছেন; এমন ব্যক্তিত্বদের বিষয়ে সংশয়যুক্ত প্রশ্ন পাঠক-দর্শকের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজ করেছে গণমাধ্যম। আন্দোলনের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে, আইনসম্মত নয়, আন্দোলনে বহিরগতদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, নিজেদের মনগড়া বহিরাগত তালিকা তৈরি করে দেওয়া, জনগণ এসব আন্দোলনের সঙ্গে নেই; এমন প্রচারণাও চালিয়েছে কোনো কোনো গণমাধ্যম। আর আন্দোলন সমর্থনকারী বিশিষ্টজনদের ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পাঁয়তারাও করেছে গণমাধ্যমগুলো।

২০১৮ সাল ছিল ভোটের বছর। বছরজুড়েই ছিল ভোট নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও প্রস্তুতি। ভোটে কেমন হবে, ভোট অংশগ্রহণমূলক হবে কি হবে না, সব দল কি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে? এর সঙ্গে ছিল মামলা ও রাজনৈতিক মামলার বিচার প্রক্রিয়া। এই ঘটনাগুলোর খবর পরিবেশন করতে গিয়ে মূলধারার গণমাধ্যম রঙ মিশিয়েছে নিজেদের মতো করে। বিশেষ বিশেষ গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়ায় পাঠক-দর্শক যেন নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে; সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছে গণমাধ্যম। ভোক্তারা এক চোখে দেখুক সেটিই ছিল গণমাধ্যমের উদ্দেশ্য। তবে গণমাধ্যমগুলো এসব ঘটনা নিজেরাই এক চোখে দেখতে পারেনি। ফলে পাঠক, দর্শক বরাবরের মতোই সংশয়ে নিমজ্জিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের মস্তিকে পীড়ার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখানে সাইবার লড়াই ও নিজ নিজ দলীয় প্রচার চলেছে সমানতালে।

শহরে ও শহরের বাইরের গণমাধ্যম ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি; তারা গণমাধ্যমের পীড়ন থেকে মুক্তি পেতে টেলিভিশন, পত্রিকা তো বটেই, অনলাইন ওয়েব পোর্টাল থেকেও চোখ সরিয়ে নিয়েছে। গণমাধ্যমের প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাসে চিড় ধরেছে। ভোট সামনে রেখে আমরা দেখতে পেলাম কোনো কোনো গণমাধ্যম উন্নয়নের গল্প বলে ভোটারদের বিশেষ কোনো প্রতীকের প্রতি অনুরক্ত বা জাগরিত করার চেষ্টা করে। ওই প্রতীকের বিপরীত প্রতীক বিষয়ের গল্পগুলো ছিল রাক্ষস-খোক্ষসের গল্প। এর বিপরীতকা- অন্য গণমাধ্যমগুলো বিপরীত প্রতীকের সুদিনের বেলাতেও করেছে। কোনো কোনো সংকট বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সাধারণ মানুষের মনোযোগ স্থূল দিকে সরিয়ে নেওয়ার কাজও করে গণমাধ্যম।

আমরা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে উদাহরণ হিসেবে আনতে পারি। দেশে যখন যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সময় বিবেচনায় তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল সব সময়ই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাস্তবতা ছিল; আওয়ামী লীগ পর পর দুই দফা ক্ষমতায় থাকার পর তৃতীয় দফার জন্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছিল, বিএনপি পাঁচ বছর সংসদের বাইরে। তাদের চেয়ারপারসন কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন দেশের বাইরে। বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হয়েছে জাতীয় ঐক্য নামক জোটের ছায়াতলে। এর সঙ্গে ছিল নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে নানা সংশয়। এদিকে যখন ভোটার বা সাধারণ মানুষের মনোযোগ থাকার কথা, তখন গণমাধ্যম পাঠক-দর্শকের চোখ একজন ইউটিউবতারকার প্রার্থী হওয়ার ঘটনায় নিয়ে স্থির করে। ওই ইউটিউবতারকার প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা আছে কিনা, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের যেন এটিই মুখ্য প্রশ্ন। এই প্রশ্ন পাঠক-দর্শকের মস্তিকে ঢুকিয়ে দিতে গিয়ে গণমাধ্যম নিজেই বর্ণবৈষম্যের আচরণ করে বসে। সামনে নিয়ে আসে সমাজের আশরাফ-আতরাফ সমস্যাকে। তারা জনগণকে বোঝাতে চায়, নির্বাচন করার অধিকার সমাজের ব্রাত্যশ্রেণিরই আছে। বাকিরা সেখানে অচ্ছুৎ।

আমরা গণমাধ্যমে দেখি ওই ইউটিউবতারকাকে তাচ্ছিল্য করে সরাসরি টক শোতে প্রশ্ন করতে। এ প্রক্রিয়াটিকে দর্শক মনোজগতে বর্ণ ও শ্রেণিবিদ্বেষ প্রবেশ করিয়ে দেওয়ার একপ্রকার কৌশল বলা যায়। টক শো প্রসঙ্গ যখন চলেই এলো, তখন এ জীবাণু সম্পর্কে কথা বলে নেওয়া দরকার একটু। নির্দ্বিধায় বলা যায়, টেলিভিশন চ্যানেলের টক শো দর্শক-শ্রোতার মধ্যে সকাল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত জীবাণু ছড়িয়ে যাচ্ছে। এক থেকে তিনের অধিক টক শো প্রচার হচ্ছে বিভিন্ন টেলিভিশনে। টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট জোগাড়ের তাড়নায় রাজনৈতিক টক শোর আধিক্যই বেশি।
টক শোর আয়োজন ও উপস্থাপন বেশ সস্তা। হাজারদশেক টাকা খরচ করে এক ঘণ্টা পার করে দেওয়া যায়; যেখানে অন্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, নাটক প্রচারে কম করে হলেও লাখ টাকা খরচ করতে হতো। টক শোর হাল এখন সস্তার তিন অবস্থার মতো। এখানে রাজনৈতিক আলোচনার করতে যারা আসেন, তাদের বেশিরভাগেরই নিজ দলে কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। বরং তারা আসেন দলের শীর্ষ নেতাদের নজরে পড়তে। নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রতি প্রভাব ফেলতে। আর আসেন দলকানা পেশাজীবীরা। এই পেশাজীবীরাও আসেন নিজেদের নানাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে। এ বাস্তবতায় টক শোতে এসে প্রত্যেকেই নিজ নিজ দলের তোষণ করে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের যে বিষয়গুলো টক শোর প্রতিপাদ্য হিসেবে উঠে আসে; ওই বিষয়ের কোনো সমাধান খুঁজে পায় না দর্শক। উপরন্তু টক শোর আলোচকরা সরাসরি অনুষ্ঠানে নিজেরা যেমন ঝগড়া, এমনকি হাতাহাতি করতে থাকেন; তেমনি টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা দর্শকের মধ্যেও ক্ষোভ ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেন। টক শোতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দর্শকের বিভ্রান্ত করারও অভিযোগ রয়েছে আলোচকদের বিরুদ্ধে।

কোনো ঘটনা সম্পর্কে অর্ধসত্য জেনে বা একেবারেই না জেনে কথা বলার কারণে একদিকে দর্শকের সামনে নিজের দেউলিয়াপনা ধরা পড়ছে, অন্যদিকে দর্শককে ঘটনা সম্পর্কে দেওয়া হচ্ছে ভুল ধারণা। এই ভুল ধারণা শুনে বা জেনে দর্শক নিজের মতো করে ঘটনার সঙ্গে নিজের চিন্তাকে যুক্ত করছে। দুই ভুল এক হয়ে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে মানসিক বিপর্যয় ঘটছে। সমাজ, রাষ্ট্রও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। সাধারণ দর্শকের অনেকে আমাকে বলেছেন; টক শো শুধু ব্যক্তিমানুষকে অস্থির করে তোলে না, রাষ্ট্রকেও অহেতুক অস্থির করে তোলে। সাধারণ দর্শকের ওই মতামতের উদাহরণ আমরা দেখতে পাই, একাত্তর টেলিভিশনের টক শোতে অংশ নিয়ে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের অন্যচালক মাসুদা ভাট্টিকে চরিত্রহীন বলা কেন্দ্র করে দেশব্যাপী রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোড়ন এবং সেনাবাহিনীর প্রধানকে উদ্দেশ করে সময় টেলিভিশনের টক শোতে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় ওঠা। ওই দুইজনের বক্তব্য ঘিরে আমরা পাঠক ও দর্শকের বিভক্ত হয়ে পড়তে দেখি। অনেক দর্শক সরাসরি কোনো আদর্শের কট্টর সমর্থক না হলেও এ দুইজনের বক্তব্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন প্রবলভাবে। এটা আমরা পারিবারিক, সামাজিক আড্ডা ও সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি।

মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়ে মানসিক অসুস্থতা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখানকার বাসিন্দাদের বড় রোগ হচ্ছে অসহিষ্ণুতা। কেউ কারো মতকে সইতে পারেন না। সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা বৈশ্বিক কোনো বিষয়ে কেউ একজন কোনো মতামত তুলে দিলেন ফেসবুকে ব্যস, সারাদুনিয়ার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ল ওই মতামতের ওপর। পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক তো চলেই। এর সঙ্গে চলে ভিন্নমত পোষণকারীদের চরিত্র হনন, ব্যক্তি আক্রমণ। এ আচরণে ফেসবুক বাসিন্দাদের মানসিক ভারসাম্যহীনতারই প্রকাশ ঘটে। আবার ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাগরিকরা একেকজন বিচারক হয়ে ওঠেন। খুন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, দুর্নীতি; যে কোনো অপরাধের তাৎক্ষণিক তদন্ত এবং তদন্ত শেষে রায় দিয়ে দেন ফেসবুকের নাগরিকরা। বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি মামলা বা বিচারপ্রার্থী হওয়ার আগেই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় ফেসবুকে। এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও একপ্রকার অসুস্থ লড়াই চলতে থাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই অনুশীলনকেও মানসিক বিকারগ্রস্ততা বলা যায়।

লেখক : বার্তাপ্রধান, সময় টেলিভিশন

১৫ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত। - মুক্তবাক




 আরও খবর