www.muktobak.com

সংবাদপত্রের চ্যালেঞ্জ


 সৈয়দ আবুল মকসুদ    ২৯ মার্চ ২০১৯, শুক্রবার, ১:১২    দেশ


গত ২০০ বছরে পুরো বিশ্বে যে অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটেছে, মানুষের মধ্যে যে গণতান্ত্রিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে, সাহিত্য-শিল্পকলার উন্নতি হয়েছে- এর পেছনে সংবাদপত্রের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। যেখানে গণতন্ত্র নেই, সেখানে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংবাদপত্র কাজ করে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র সুসংহত ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সংবাদপত্র ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে তথ্যপ্রযুক্তির অকল্পনীয় অগ্রগতি হওয়ায় সংবাদপত্র এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, সংবাদপত্র জগতে কোনো সংকট দেখা দিয়েছে। সংবাদপত্র তার জায়গায় ঠিকই আছে এবং থাকবে। তবে তাকে মোকাবিলা করতে হবে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে। ওই প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক প্রচারমাধ্যম যেমন- টেলিভিশন এবং আরেকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

দ্রুত তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টেলিভিশন পারবে না। কিন্তু গুণগত ও বস্তুগত দিক থেকে দুই মাধ্যমের পার্থক্যও প্রচুর। যে কোনো ঘটনা বা বিষয়ের সংবাদপত্রের বিশ্লেষণ অনেক গভীর ও বিস্তারিত। তা ছাড়া সংবাদপত্র শুধু তথ্য বিতরণ করে না, জ্ঞান বিতরণ করে। একটি সংবাদপত্র একজন শিক্ষকের কাজ করে, পাঠককে চিন্তার উপাদান সরবরাহ করে।

মূলধারার সংবাদপত্রের পাশাপাশি এখন অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কর্মব্যস্ত মানুষের কাছে শুধু নয়, সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেক দৈনিকেরও অনলাইন সংস্করণ বের হচ্ছে। এতে যে মূল সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা কমছে, তাও নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মূলধারার সম্পূরক হলে বরং ভালো। অগণতান্ত্রিক ও অসহিষ্ণু রাজনৈতিক অবস্থায় মূলধারার প্রচারমাধ্যমের পক্ষে এমন কিছু বিষয় প্রচার বা সম্প্রচার কঠিন বা অসম্ভব- এ রকম অনেক স্পর্শকাতর বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে অবগত করে। কেননা তাদের কোনো জবাবদিহি নেই। তারা সরকারি কর্তৃপক্ষ ও সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন।

আমাদের দেশেই বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ফৌজদারি অপরাধমূলক ঘটনা মূলধারার সাংবাদিকতা নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে উদ্ঘাটিত হয়েছে। অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা গেছে। কিশোরের পেটে পায়ুপথে হাওয়া ঢুকিয়ে হত্যার বিচার হতে পেরেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করলে মানুষের উপকার হওয়া সম্ভব। কিন্তু নষ্ট মানুষের হাতে পড়লে তা সমাজের, এমনকি রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবেশিত সত্য-মিথ্যা মুখরোচক প্রতিবেদন একশ্রেণির পাঠক উপভোগ করতে পারে। এর বেশি কোনো অভিঘাত বা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে অপারগ। সংবাদপত্রের দায়িত্ব বেশি। এর বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি। সাংবাদিক দশবার যাচাই না করে কোনো সংবাদই পরিবেশন করেন না। এর পরও তার ভুল হতে পারে। ওই ভুল তার চোখে পড়ামাত্র অথবা কেউ যদি ধরিয়ে দেন, তা হলে তিনি তা তৎক্ষণাৎ সংশোধন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওই বাধ্যবাধকতা নেই। তা নেই বলেই অমিতাভ বচ্চনের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার সংবাদ একজন ছবিসহ প্রচার করে আনন্দ পান। সংবাদপত্রের কোনো সাংবাদিক এমন বানোয়াট খবর লেখার কথা ভাবতেও পারেন না। যেসব দেশে কার্যকর গণতন্ত্র রয়েছে, সেখানকার সংবাদপত্র ঝুঁকিমুক্ত।

যেসব দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন, যে সমাজে নানা অসহিষ্ণু ও উগ্র গোষ্ঠী সক্রিয়- সেখানে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন অত্যন্ত কঠিন। নির্যাতিত ও নিপীড়িতের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে সাংবাদিক নিজেই নির্যাতনের শিকার হন। কখনো সরকার সংবাদপত্র বন্ধ পর্যন্ত করে দেয়। গত এক দশকে কয়েকশ সাংবাদিক বিভিন্ন দেশে নিহত হয়েছেন। কর্তৃত্ববাদী সরকারের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছেন অসংখ্য। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সংবাদপত্রকে টিকে থাকতে হবে। তবে সংবাদপত্র যেহেতু মানুষের স্বার্থে ও কল্যাণে কাজ করে, সেহেতু অন্যায়ভাবে যখন কোনো সংবাদপত্র বিপদে পড়ে, তার ওপর খড়গ নেমে আসে, তখন সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য ওই সংবাদপত্রের পাশে দাঁড়ানো। তা হলেই সংবাদপত্র সাহসের সঙ্গে যে কোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারবে।

সৈয়দ আবুল মকসুদ : লেখক ও গবেষক

১৫ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত। - মুক্তবাক




 আরও খবর