www.muktobak.com

অনবরত মিথ্যা প্রচারণায় আপনি কি ক্লান্ত?


 শহিদুল ইসলাম    ২ এপ্রিল ২০১৯, মঙ্গলবার, ১২:৫৫    মতামত


পৃথিবীর নামকরা সংবাদপত্র, রেডিও-টেলিভিশনের প্রচারিত খবরের ওপর আস্থা রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। বেশির ভাগ সংবাদ পরিবেশন করে পৃথিবীর তিনটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা। সে তিনটি নিউ ইয়র্ক, লন্ডন ও প্যারিসে অবস্থিত। মানুষ তাদের সম্পর্কে কমই জানে। পশ্চিমের এই তিন সংস্থা একই ঘটনার ওপর প্রায় একই ভাষায় খবর পরিবেশন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার, সেনাবাহিনী ও গুপ্তচর বাহিনী সেই খবর বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়।

ইউরোপের ৯টি প্রভাবশালী সংবাদপত্রের সাংবাদিক সিরিয়া যুদ্ধের খবর সংগ্রহের সময় যে বিষয়টি তাঁদের দৃষ্টিতে পড়ে, তা হলো ৭৮ শতাংশ সংবাদ তৈরি হয়। সম্পূর্ণ বা অংশত এই তিনটি সংবাদ সংস্থার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে, সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করে ওই সব সংবাদ সংস্থা কোনো খবর তৈরি করে না। যুদ্ধ সম্পর্কে সব মন্তব্য ও সাক্ষাৎকারের ৮২ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সমর্থনে প্রচারিত হয় এবং সিরিয়ার বিপক্ষে প্রপাগান্ডা সংবাদমাধ্যম জুড়ে থাকে।

গত ৩ মার্চ সুইচ প্রপাগান্ডা রিসার্চ সেন্টার এ বিষয়ে একটি বড় গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। নাম The Propaganda Multiplier: How Global News Agencies and Western Media Report on Geopolitics. গবেষণায় ২০টি বই বা গবেষণাপত্রের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। হীরক রাজার দেশের মগজ ধোলাইয়ের মতো এখানেও ‘সংবাদ ধোলাই ঘর’ আছে। ২০১৬ সালের জুন মাসে এই নামে এক রিপোর্টে হুনের একটি উদ্ধৃতি উদ্ধৃত করে। হুন প্রশ্ন তোলেন, সংবাদপত্র যা জানে, তা কিভাবে জানে? ‘এ প্রশ্নের উত্তর শুনে পাঠকের পিলে চমকে উঠবে।’ সেগুলো হলো ওই তিনটি সংবাদ সংস্থার সরবরাহকৃত গল্প। প্রায় ভূতুড়েভাবে পরিচালিত সংবাদ সংস্থাগুলো বিশ্বের সংবাদ পরিবেশনের প্রধান উৎস। সেই সংস্থাগুলোর নাম কী, কিভাবে তারা কাজ করে এবং কাদের অর্থে তারা পরিচালিত হয়? পূর্ব ও পশ্চিমে যেসব ঘটনা ঘটে, সেগুলো জানতে হলে এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে? (Hohne 1977, পৃ. ১১)এটা খুবই আশ্চর্য যে সংবাদ সংস্থাগুলোর এত প্রতাপ থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ মানুষই তাদের সম্পর্কে কিছু জানে না। ‘সমাজের বেশির ভাগ মানুষই তাদের সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নয়। সত্যি কথা বলতে, সংবাদ সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা অসীম। তবু অতীতে এদের সম্পর্কে মানুষ খুব কমই গুরুত্ব দিয়েছে।’ (Schulteu-Jaspers 2013, p.13)|দুই. ‘অনবরত মিথ্যা প্রচারণায় আপনি কি ক্লান্ত?’ কোনো বিজ্ঞাপন নয়, সরকারি কোনো অনুদান নয়, সেটাই স্বাধীন প্রচারমাধ্যম।

আমরা সেই তিনটি প্রচারমাধ্যমের পরিচয় জেনে নিই, যারা সব সময় সংবাদের নামে গল্প সরবরাহ করে—

এগুলো হলো : ১. আমেরিকার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP)—সমগ্র পৃথিবীতে এর চার হাজার কর্মী আছে। এটি আমেরিকার মিডিয়া কম্পানির অধীন একটি সংস্থা। এর প্রধান কার্যালয় নিউ ইয়র্কে। এপি ১২ হাজার আন্তর্জাতিক সংবাদকর্মীর বরাত দিয়ে সংবাদ সরবরাহ করে এবং প্রতিদিন পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষের কাছে সেই কল্পকাহিনি পৌঁছে দেয়। ২. প্যারিসের আধাসরকারি এএফপি—Agency Frace Presse। তারও কর্মিসংখ্যা চার হাজার। সারা বিশ্বে এএফপি প্রতিদিন তিন হাজার গল্প ও ছবি মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ৩. লন্ডন শহরে অবস্থিত রয়টার একটি ব্যক্তিগত সংস্থা। এর কর্মিসংখ্যা তিন হাজার। ২০০৮ সালে বিশ্বের ২৫ জন ধনীর একজন কানাডার মিডিয়া মালিক থমসন রয়টার কিনে নেন এবং বর্তমানে থমসন রয়টার্স নামে নিউ ইয়র্কে স্থাপিত।

এরাই হচ্ছে বিশ্বের মিডিয়াজগতের নার্ভ সেন্টার। তবে প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংবাদ সংস্থা আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংবাদের জন্য তারা এই তিনটি বৈশ্বিক সংস্থার ওপরই নির্ভর করে।

এত শক্তিশালী সংস্থার কথা সাধারণ মানুষ জানে না কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে সুইডেনের মিডিয়া প্রফেসর ব্লামের বই থেকে একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন, ‘রেডিও ও টেলিভিশন সাধারণত তাদের প্রচারিত খবরের উৎসের নাম করে না। বিশেষজ্ঞরা কাগজে তাদের নাম জানতে পারে (Blum 1995, p. 5)। এর কারণ অত্যন্ত পরিষ্কার। তারা পাঠক বা শ্রোতাদের জানাতে চায় না যে তারা যেসব খবর প্রচারের জন্য প্রেরণ করে, সে জন্যও তারা নিজেরা কোনো রকম গবেষণা করে না। ২০১১ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের Swiss Research lnstitute for the Public Sphere and Society

এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে শুধু সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে ওই তিনটি সংস্থা মুখ্য ভূমিকা পালন করে না। ব্যক্তিগত ও সরকারি প্রচারমাধ্যমেও তাদের প্রভাব প্রবল। সম্পাদকীয়র ওপরও তার প্রভাব প্রবল। ভলকার ব্রাইনটিকান, যিনি ১০ বছর জার্মান রেডিওতে সংবাদ পাঠ করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন, তিনি তা সমর্থন করেন।’ সংবাদকক্ষের প্রধান সমস্যা হলো এই যে ‘এআরডি’ থেকে যেসব সংবাদ জাতির উদ্দেশে প্রেরিত হতো, তার ওপর ওই তিনটি বিশ্ব সংস্থার প্রভাব অসামান্য।...সম্পাদক তাঁর টেবিলে বসে তাদের পাঠানো বার্তাগুলো থেকে কিছু অংশ বাছাই করেন। একটু-আধটু এদিক-ওদিক করে সম্পাদকীয় হিসেবে ছাপা হয়।’

তিন. বেশির ভাগ দেশের সংবাদ সংস্থায় কোনো বৈদেশিক সংবাদদাতা ছিল না। বিদেশি খবরের জন্য তাদের সম্পূর্ণ ওই তিন বৈশ্বিক সংবাদ সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হতো। যাদের আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা আছে, তাদের বেলায় কী হতো? ওই তিন বৈশ্বিক সংস্থার যেখানে হাজার হাজার সাংবাদিক বিশ্বে ছড়িয়ে ছিল, পরিবর্তে সুইস সংবাদপত্র NZZ-এ মাত্র ৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। চীন ও ভারতের মতো বিশাল দেশে মাত্র একজন করে সাংবাদিক কর্মরত ছিলেন। দক্ষিণ আমেরিকায় দুজন এবং আফ্রিকায় একজনও নয়।

কোনো যুদ্ধরত এলাকায় কর্মরত সাংবাদিক খুব কমই যুদ্ধক্ষেত্রে যেতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সিরিয়া যুদ্ধের খবর তাঁরা ইস্তাম্বুল, বৈরুত, কায়রো, এমনকি সাইপ্রাসের বিলাসবহুল হোটেলে বসে যুদ্ধের সরেজমিন রিপোর্ট লেখেন। এ ছাড়া স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে ভাষাগত সমস্যা তো ছিলই।

চার. ‘ওই তিন বিশ্ব সংবাদ সংস্থা যা রিপোর্ট করে না, সেগুলো ঘটে না।’

সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস—এক ব্যক্তিক এক অবজারভেটরি, যিনি লন্ডন অফিসে বসে সিরিয়া যুদ্ধের সর্বশেষ সংবাদ পরিবেশন করেন। মিডিয়া খুব কমই খোঁজ করে, কোথায় সে ‘অবজারভেটরি’, কে তার পরিচালক, কে লন্ডন অফিসের খবর জোগায়। সাংবাদিকদের সেখানে পৌঁছা অসম্ভব ব্যাপার। বৈশ্বিক সংস্থা প্রদত্ত সংবাদই সেই ‘অবজারভেটরি’ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়।

ওই তিন বিশ্ব সংবাদ সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতার কারণে বিশ্বময় যে খবর ছড়িয়ে পড়ে, তা যেমন অনির্ভরশীল, তেমনি অনৈতিহাসিক। বর্তমানে কী ঘটছে, সে খবর থাকলেও সে ঘটনা কেন ঘটছে, কে ঘটাচ্ছে, তার ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাস সেখানে থাকে অনুচ্চারিত। যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটোর পক্ষে প্রচারণা সাধারণ বিষয়। পশ্চিমা জগৎ সে খবর শুনতে চায় না, সংবাদ সংস্থা সেগুলো প্রচারে দেয় না। তাই উইলকে বলেন, What agency does not report, does not take plaec. ‘এজেন্সি যেগুলো রিপোর্ট করে না, সেগুলো ঘটে না।’

মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি, তা কতটা মেকি, আর কতটা সত্য। মিডিয়া আমাদের বাস্তব অবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আমরা এক কাল্পনিক পৃথিবীকেই সত্য বলে স্বীকার করে নিয়েছি। তবে আশার কথা, এমন রিসার্চের ফলে আমরা ক্রমান্বয়ে মাটির স্পর্শ পেতে শুরু করেছি।

পার্থ, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আজকের দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত। - মুক্তবাক




 আরও খবর