www.muktobak.com

সংবাদেরও জীবন আছে, তারও মৃত্যু হয়


 রফিকুজজামান রুমান    ১০ মে ২০১৯, শুক্রবার, ১২:৩১    মতামত


সাংবাদিকতার ক্লাশে আমার সবচেয়ে ভালো লাগার টপিক’টির নাম হলো ‘নিউজ’। অনার্সের একেবারে শুরুর দিকের শিক্ষার্থীদের সামনে ‘নিউজ কী’ বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে অনেকসময় নিজেই আপ্লুত হয়ে পড়ি। শিক্ষার্থীদেরকে একধরনের গোলক ধাঁধাঁয় ফেলতে পেরে ভালো লাগে! আমার ধারণা- এই গোলক ধাঁধাঁয় পড়াটা ওরা নিজেরাও উপভোগ করে।

ওরা প্রথমেই অবাক হয়, যখন বলি- নিউজ মানে ‘নর্থ, ইস্ট, ওয়েস্ট, সাউথ’ নয়। ‘চারদিকের’ ইংরেজি আদ্যাক্ষরের সঙ্গে ‘নিউজ’ এর বুৎপত্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু ওরা বিভিন্ন জায়গায় শুনে এসছে নিউজ মানে ‘নর্থ, ইস্ট, ওয়েস্ট, সাউথ’! দু:খজনক হলো আমি বাংলাদেশের কোনো কোনো বইয়েও দেখেছি নিউজ মানে ‘নর্থ, ইস্ট, ওয়েস্ট, সাউথ’। ওদের আর দোষ কী! এরপরে বলি- নিউজ এসছে ইংরেজি ‘নিউ’ থেকে, যার মানে দাঁড়ায় নতুন কোনো কিছু (নিউজ ইজ সামথিং নিউ)। এবার ওরা আমার সঙ্গে একমত হয়। কিন্তু যখনই বলি- এই ডেফিনিশন পুরোপুরি ঠিক নয়; কারণ পুরনো কোনোকিছুও নিউজ হতে পারে এবং হরদম হয়, তখন ওদের বিস্ময়ের শেষ থাকে না। তাহলে নিউজ কী?

           পড়ুন : অন্ধকারে বাঁচে না গণতন্ত্র


বলি- নিউজ হচ্ছে স্বাভাবিকতার ব্যত্যয় (ডিসরাপশন অব স্ট্যাটাস ক্যু)। মানে হলো- কোনোকিছুর স্বাভাবিক অবস্থা ব্যাহত হলে সেটি খবর হয়। যেমন: আমরা এখানে ক্লাশ নিচ্ছি, এটি খবর নয়। কিন্তু এ অবস্থায় যদি ফ্যান খুলে পড়ে কিংবা ছাদ ধ্বসে পড়ে কেউ আহত হয়, তাহলে তা খবর। কারণ এটি স্বাভাবিক নয়। এবার শিক্ষার্থীরা খুব খুশি! নিউজ বুঝে ফেলছে! ওদের হাসি-হাসি মুখগুলো আবার ‘উদ্বিঘœ’ করে দিই একথা বলে যে, এই ডেফিনিশনও পুরোপুরি সত্য নয়। স্বাভাবিক কোনো ঘটনাও খবর হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন বক্তব্য দেন, প্রতিদিনই তা খবর হয়। এর মধ্যে ‘অস্বাভাবিকতার’ কী আছে!


এরপরে বোর্ডে লিখি মার্কিন সাংবাদিক জন বোগার্ট এর সেই ঐতিহাসিক উক্তি- “কুকুর মানুষকে কামড়ালে খবর হবে না, কিন্তু মানুষ কুকুরকে কামড়ালে খবর হবে।” ছেলেমেয়েরা ‘জি স্যার’ বলে মাথা নাড়ে। আমার সন্দেহমাখা হাসি-হাসি মুখ দেখে ওরা আবার চিন্তিত হয়। বলেই ফেলি- এই ডেফিনিশনেও সমস্যা আছে। প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্পকে কুকুরে কামড় দিবে আর তা ‘খবর’ হবে না, এটা কি কল্পনাও করা যায়! বাদ দিন ট্র্যাম্প, ঢাকা শহরের কোনো পথচারীকে কুকুরে কামড়ালেও তো মনে হয় খবর হয়ে যেতে পারে! এক ইংরেজি বইয়ের লেখক কোনো রকমের তর্কের মারপ্যাচে যেতে রাজি হননি। তিনি সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছেন, “নিউজ ইজ এডিটর’স উইস”, সংবাদ হলো সম্পাদকের ইচ্ছা। অর্থাৎ সম্পাদক যা চাইবেন, তা-ই পত্রিকায় ছাপা হবে এবং তা-ই নিউজ। ব্যবহারিকভাবে সংজ্ঞাটি ঠিক আছে। কিন্তু সাংবাদিকতার ব্যাকরণ অনুযায়ী এটি প্রশ্নবিদ্ধ। একজন সম্পাদকের ব্যক্তিগত ভালো লাগা না-লাগার বিষয় থাকতে পারে, তার নিজস্ব কোনো মতামত/পক্ষপাত থাকতে পারে। সুতরাং, সংবাদকে সম্পাদকের ইচ্ছাধীন করলে সংবাদ তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারায়।


কী সেই বৈশিষ্ট্য? একেবারে সহজ করে বলতে গেলে, সংবাদ হলো কোনো ঘটনার সত্য বিবরণী, এমন ঘটনা যা অধিকাংশ মানুষ জানতে চায়। অধিকাংশ মানুষের জানতে চাওয়ার বিষয়টি অবশ্য খুব স্পষ্ট নয়। অধিকাংশ মানুষ কখনোই জানতে চায় না (অর্থাৎ কামনা করে না)- আগামিকাল সড়ক দুর্ঘটনায় একশ’ মানুষ মারা যাক। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় একশ’ মানুষ মারা গেলে সেটি মস্তবড় খবর। তাই বলা ভালো- যে ঘটনার সংবাদ-উপযোগিতা রয়েছে, সেটিই খবর। গোলকধাঁধাঁ থেকে বের হওয়া গেল কি? শিক্ষার্থীরা ‘কনফিউস্ড!’


আসলেই তাই। নিউজকে ডিফাইন করা সহজ নয়। যেমন সহজ নয় ‘সত্য’ অথবা ‘শিল্প’কে ডিফাইন করা। তাই অনেকেই বলেন, “নিউজ ইজ ইজি টু রিয়েলাইজ, বাট ডিফিকাল্ট টু ডিফাইন”। এই যে ‘সংবাদ-উপযোগিতা’ (নিউজওরদিনেস) এর কথা বললাম, তারও তো অনেক আপেক্ষিকতা রয়েছে। কোনো সম্পাদকের/পত্রিকা-মালিকের দূর-সম্পর্কের কোনো আত্মীয় (যিনি এমনিতে কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন) মারা গেলেও সেই ঘটনা ঐ পত্রিকায় খবর হয়। । অন্য পত্রিকা সেটি ছাপবে না, কারণ তার ‘নিউজওরদিনেস’ নেই। তাহলে ‘নিউজওরদিনেস’ কী? বিষয়টা জটিলই বটে! সে যতো কঠিনই হোক, ছেড়ে দেওয়া যাবে না।


আসুন চেষ্টা করি। ‘ডেফিনিশন’ বাদ দিয়ে নিউজ এর ‘কমন’ বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে আলোচনা করি। তাতে যদি কিছু ‘রিয়েলাইজ’ হয়! নিউজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- ঘটনাটি সত্য হতে হবে। পাঠক সত্য তথ্য জানার জন্য পত্রিকা পড়ে। পয়সা দিয়ে কেউ ‘মিথ্যা’ কিনতে চায় না। কিন্তু শুধু ‘সত্য’ হলেই চলবে না। বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে, যেটিকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘অবজেকটিভিটি’। কোনো একটি ঘটনা ঘটেছে- এটি সত্য। আর সেই ঘটনাটি ঠিক যেভাবে ঘটেছে, সেভাবেই উপস্থাপন করা হলো বস্তুনিষ্ঠতা। এই ‘অবজেকটিভিটি’ নিয়ে অবশ্য সারাবিশ্বেই অন্তহীন বিতর্ক আছে- মানুষের পক্ষে আসলেই ‘অবজেকটিভ’ হওয়া সম্ভব কিনা। সে যা-ই হোক। সত্য ঘটনা বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করতে হবে। এখানে একজন সাংবাদিককে অবশ্যই মনে রাখতে হবে- ঘটনার সঙ্গে নিজের কোনো মতামত দেওয়া যাবে না। রিপোর্টারের কাজ ঘটনার বিবরণী তুলে ধরা, সেই ঘটনা যত ভালো বা যত খারাপই হোক, সেটি বলা তার কাজ না। কোনো মন্তব্য করা যাবে না। অহেতুক বিশেষণ যোগ করাও এক ধরনের মতামত প্রকাশ।

আমরা প্রায়ই সংবাদপত্রে দেখি- ‘মর্মান্তিক’ মৃত্যু, ‘দুর্ধর্ষ’ ডাকাতি, ‘ভয়াবহ’ অগ্নিকা-- এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যায় যেগুলো মতামতের পর্যায়ে পড়ে। রিপোর্টার কোনো মৃত্যু-ঘটনার বর্ণনাটি দিবেন। বর্ণনা পড়ে পাঠকই ঠিক করে নিবে সেটি ‘মর্মান্তিক’ কিনা। অগ্নিকা-ে কেউ হতাহত হয়ে থাকলে রিপোর্টার তার বিবরণ দিবেন। পাঠক নিশ্চয়ই বুঝে নিবে সেটি ‘ভয়াবহ’ না ‘আরামদায়ক’। ইদানিং প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যায়, ‘চোরাগুপ্তা’ হামলা, ‘নাশকতার’ চেষ্টা ইত্যাদি শব্দ। সাংবাদিকতার ন্যূনতম ব্যাকরণবোধ থাকলেও একজন রিপোর্টার এ ধরনের শব্দ সরাসরি ব্যবহার করতে পারেন না। কোনো একটি ঘটনাকে আপনি কীভাবে ধরে নিয়েছেন যে এটি ‘নাশকতা’! আপনি তো আইন-শৃক্সক্ষলা রক্ষাবাহিনীর সদস্য না।

আপনার দায়িত্ব হলো কী হয়েছে তা বলা। এর পেছনে নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখবে পুলিশ। পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায়- এটি নাশকতা। কিন্তু কোনোভাবেই আপনি নিজের থেকে বলতে পারেন না। ‘ঢিলেঢালা’ হরতাল কিংবা ‘সর্বাত্মক’ হরতাল- এগুলো বলাও রিপোর্টারের কাজ না। রিপোর্টার বলবেন- দোকানপাট খোলা ছিল বা ছিল না, গাড়িঘোড়া চলেছে বা চলেনি। এই অবস্থাকে ‘ঢিলেঢালা’ বলা উচিৎ নাকি ‘সর্বাত্মক’ বলা উচিৎ সে ব্যাপারে আপনার ‘ওকালতি’ করার কোনো কারণ নেই। যদি তা করতেই হয়, তাহলে সম্পাদকীয় পাতা আছে, সেখানে কলাম লিখুন, কিন্তু কখনোই নিউজে নয়।


সত্য ঘটনার নিজস্ব-মতামতহীন বস্তুনিষ্ঠ উপস্থ্াপনা- নিউজ এর অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো- কারো বিরুদ্ধে কোনো খবর প্রকাশিত হলে সেটি খবরই না যদি সেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তির কোনো বক্তব্য না থাকে। একজন যদি ১০টা খুনও করে, সেই রিপোর্ট করতে হলে আপনাকে অবশ্যই তার (‘খুনির’) বক্তব্য নিতে হবে। (এখানে বলে রাখা ভালো যে, রিপোর্টার কাউকে ‘খুনি’ বলতে পারেন না। ‘খুনি অমুককে গ্রেফতার করা হয়েছে’ না বলে বলতে হবে ‘খুনের অভিযোগে অমুককে গ্রেফতার করা হয়েছে’)। পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যায়, যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন করা হয়েছে। অথচ অভিযুক্ত স্বামীর কোনো বক্তব্য নেই। মাঝে মধ্যে খবর আসে, কয়েকজন লোক মিলে কিংবা কোনো গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল ‘নাশকতার’ উদ্দেশে মিটিং করছিল, পুলিশ খবর পেয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করেছে। এ ধরনের যতগুলো রিপোর্ট আমি দেখেছি, কোথাও ‘নাশকতার পরিকল্পনাকারীদের’ কোনো বক্তব্য চোখে পড়েনি। এটা হতেই পারে না। সাংবাদিকতার ব্যাকরণ অনুযায়ী এটি কোনো রিপোর্ট হয় না। একজন ব্যক্তিকে আপনি ‘নাশকতাকারী’ বলে ফেলবেন, অথচ এ ব্যাপারে তার কোনো বক্তব্যের ধার ধারবেন না, এটি আর যা-ই হোক, সাংবাদিকতা হয় না। আপনাকে অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার। একাধিকবার চেষ্টা করেও না পাওয়া গেলে পাঠককে জানাতে হবে যে তাকে পাওয়া যায়নি বা তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


সবশেষে যেটি বলা দরকার, মূলত এই প্রসঙ্গটি বলার জন্যই এতো ভূমিকা-বয়ান, সেটি হলো সংবাদেরও জীবন আছে, তারও মৃত্যু হয়। কখনো সাংবাদিক, কখনো সম্পাদক, আবার কখনো কখনো পত্রিকার মালিক একটি জীবন্ত সংবাদের হন্তারক হয়ে ওঠেন। একজন সাংবাদিকের পেশাগত জীবনে এরচেয়ে দু:খের আর কিছু থাকতেই পারে না যে, একটি খবর, যার সংবাদ-মূল্য রয়েছে, সেটি সে ছাপাতে পারে না। পত্রিকার তথাকথিত ‘পলিসি’র অনুগামী না হলে, সম্পাদকের রাজনৈতিক আদর্শের সমার্থক না হলে, মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধির অনুকূল না হলে পত্রিকায় খবর ছাপানো যাবে না! এভাবে খবরকে হত্যা করা হয়।

পত্রিকার মালিক/সম্পাদক যদি আওয়ামীপন্থী হয়, তাহলে বিএনপি/জামায়াতপন্থী কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো খবর সেখানে ছাপা হবে না। আবার মালিক/সম্পাদক বিএনপি/জামায়াতপন্থী হলেও একই ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অরাজনৈতিক সেমিনার কভার করার ক্ষেত্রেও বিবেচনা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক কোন পন্থী। একটি একাডেমিক সেমিনার কভার করার মতো উদারতা যে সাংবাদিক/সম্পাদক/মালিকের মধ্যে নেই, সাংবাদিকতার মতো একটি পেশায় তার থাকা না-থাকা নিয়ে আরেকবার ভাবা উচিৎ। এই ঠুনকো ‘আদর্শ’ আবার নিমিষেই গলে যায় যদি সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের পত্রিকায় নিয়মিত বিজ্ঞাপন দেয়!


সম্প্রতি এক সম্পাদক এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এখন অনেক খবর ছাপা যায় না। নানা কারণে অনেক খবরের ‘অপমৃত্যু’ ঘটানো হয়। তাতে শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত হয় পাঠক। জানানোর মধ্য দিয়েই সংবাদমাধ্যম বেঁচে থাকে। বলা হয়, চৎবংং ষরাবং নু ফরংপষড়ংঁৎব. প্রকাশ তরতে না পারলে সংবাদমাধ্যম টিকে না। সংবাদের মৃত্যু মানে তো সাংবাদিকেরও মৃত্যু, সংবাদপত্রের মৃত্যু।
সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। রাজনীতি আর অর্থনীতির ‘হাতুরি’ দিয়ে সেই স্তম্ভকে আর না ভাঙ্গি। সংবাদ বেঁচে থাক। বেঁচে থাক সাংবাদিকতা।

লেখক:  বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কলাম লেখক




 আরও খবর