www.muktobak.com

মিডিয়া হাউসগুলোই গণমাধ্যমকর্মীদের গণশত্রু


 সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু    ১০ মে ২০১৯, শুক্রবার, ১২:৫৯    দেশ


১.

আমাদের দেশের গণমাধ্যমকর্মী (সম্পাদক থেকে জেলা উপজেলা স্তরের সাংবাদিক)দের বেতন-ভাতার বৈষম্যের খসড়া গ্রাফটি দেখে নিতে পারেন। 
রঙ এবং আকার দিয়ে বেতন-ভাতার স্বাস্থ্যের অবস্থা দেখানো হয়েছে। 
লাল রঙ দিয়ে শুরু করেছি,ক্রমশঃ ক্ষীণ এবং হালকা হয়ে এসেছে লাল রঙ এবং বক্সের আকার। শেষের ক্ষুদ্রতর বক্সটিতে লাল রঙ আর নেই।

এটি কোন গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে নেয়া নয়,নিজের সীমিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আঁকা। কারও দ্বিমত থাকলে শোভন বাক্যে লিখতে পারেন।

♦ প্রথম স্তর: বিশাল সাইজের টকটকে লাল স্তরটি হচ্ছে বেতন-ভাতার সিম্বল। এই রাজসিক আকারের বেতন-ভাতার আওতায় থাকেন একটি মিডিয়া হা্উসের শীর্ষস্থানীয় ৫ থেকে দশজন। 

♦ দ্বিতীয় স্তর: এ স্তরের বাসিন্দারা মূলত: মিডিয়ার হৃদযন্ত্র,বসেন মূল অফিসে।
♦ তৃতীয় স্তর : এ স্তরে থাকেন মূলত; স্টাফ রিপোর্টারা। তবে ৫০ শতাংশ হাউস প্রতিমাসের বেতন প্রতিমাসে দেন না।
♦ চতুর্থ স্তর : এ স্তরটি বিভাগীয় শহরের রিপোর্টার/ব্যুরোপ্রধানরা। ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মিডিয়া হাউস নিয়মিত বেতন দিলেও বাকিরা বেতন বাকি রাখেন নিয়মিতই। কোন  কোন হাউস ৪মাস থেকে ৬মাস পর্যন্তও বাকি রেখে চলছেন।
♦ পঞ্চম স্তর: এস্তরের বাসিন্দারা মূলত প্রতিটি মিডিয়া হাউসের মেইন অক্সিজেন(নিউজ)সরবরাহকারী। এরা টিভি কিংবা পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি / জেলা সংবাদদাতা/নিজস্ব প্রতিনিধি নামে পরিচিত। 

           আরো পড়ুন :  মে দিবস ও ঢাকার বাইরের সাংবাদিকতা


এদের মধ্যেও শতকরা ৫ শতাংশ মাত্র ডালভাত খেয়ে বাঁচবার মত নিয়মিত বেতন পান,বোনাস পান । এঁদের ডিউটি ২৪ঘণ্টা। বাকি ৯৫ শতাংশ যা পান তা দিয়ে তিরিশ দিনে ৯০টি রুটি কিনে খাবার মত আর্থিক সুবিধা পান না। 
এরা মূলত সাংবাদিকতা করতে এসে ফেঁসে যান, প্রতারিত হন । জীবনে মূল্যবান সময় হারিয়ে যায়,চতুর্দিকে শত্রু সৃষ্টি হয়,তখন ইচ্ছে থাকলেও সরে আসতে পারেন না। থাকেন সর্বোচ্চ নিরাপত্ত ঝুঁকির মুখে। নিউজ সংক্রান্ত বিষয়ে ক্ষুব্ধ গোষ্ঠি, ব্যক্তি,রাজনৈতিক সন্ত্রাসের মূল শিকার এরাই,হত্যার শিকার সাংবাদিকদের তালিকা ঘাঁটলে এঁরাই হবেন ৯৯শতাংশ। 
কোন পেনশন, প্রফিডেন্ট ফাণ্ড, ইনক্রিমেন্ট, বোনাস নাই। চাকরী চলে যায় চুন থেকে পান খসলেই। বেতন বকেয়া পড়ে থাকে ৯৫ শতাংশেরই । 
৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মিডিয়া হাউস এদের কোন বেতনই দেন না। ব্যবহার করেন মূলত বিজ্ঞাপন প্রতিনিধির মত।
♦ ষষ্ঠস্তর: এরা হলেন প্রিন্ট মিডিয়ার উপজেলা প্রতিনিধি। এদের শতকরা ৯৯.৯৯ ভাগ কোন বেতন-ভাতা পান না। বিজ্ঞাপন কালেকশন করে তার কমিশন থেকে কেউ কেউ চলেন।

২. 

মুক্ত গণমাধ্যমের শত্রু খোদ মালিকপক্ষ।
কালো টাকার মালিক,এই মালিকেরা নিজেদের অতীত এবং সম্পদের কৃষ্ণউত্থানের কারণে রাষ্ট্রক্ষমতাকে ভীষণভাবে ভয় পায়। এরা সবসময় রাষ্ট্রক্ষমতা তোষণে এবং চাটুকারিতায় ব্যস্ত থাকে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য বলবার পরিবর্তে নিজেরাই নিজ নিজ হাউসে সেলফ সেন্সরশীপ আরোপ করে নিজ সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

এরা মিডিয়া হাউস খুলেছে আদর্শিক কারনে নয়। সমাজে,প্রশাসনের উপর প্রভাব বিস্তার এবং নিজ ক্ষমতা প্রয়োগের প্রেশার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবার জন্য। এমন দেশে আবার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। আমাদের মিডিয়া হাউসগুলোই গণমাধ্যমকর্মীদের গণশত্রু।

৩.

উচ্চ বেতনে পোষা উচ্চ পদের সাংবাদিকরা ইচ্ছা/অনিচ্ছায় মুক্তগণমাধ্যমের শত্রুতে পরিণত 
হয়েছেন ।
এরা দুইযুগ আগের সমপদের ১৫ থেকে ২০গুণ বেতন ভাতা পান,বিলাসী জীবন নির্বাহ করেন।  ফলে এদের পক্ষে মালিকপক্ষের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকা ছাড়া কিচ্ছু করার নেই। 
এরা জানেন মুক্তগণমাধ্যমের চরিত্র, আদর্শ ধরে রাখতে গেলে চাকুরিচ্যুতি অনিবার্য । ফলশ্রুতিতে হারাতে হবে অস্বাভাবিক মোটা বেতন আর বিলাসী জীবন।

এরা বাধ্য হয়েই মোটা বেতন,বিলাসী জীবনটাকে বেছে নেন এবং মালিকপক্ষের রাজনৈতিক,ব্যবসায়িক স্বার্থ সমুন্নত রেখে চলাকেই উত্তম জ্ঞান করেন।

লেখক : কলেজ শিক্ষক ও সাবেক গণমাধ্যমকর্মী




 আরও খবর