গণমাধ্যম কি ভিউজের পেছনে ছুটবে, নাকি নিউজের?

বিশ্ব

শাহানা হুদা রঞ্জনা

(২ মাস আগে) ৫ মার্চ ২০২৪, মঙ্গলবার, ৮:৩০ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৮:৪৬ অপরাহ্ন

talktrain

শাহানা হুদা রঞ্জনা

ইদানীং সবখানে শুধু ভাইরালের ছড়াছড়ি। দেখে মনে হয় ভাইরাল না হলে, ফেইসবুকে লাইক না পেলে, ইউটিউবে ভিউজ না পেলে কোনো ঘটনাই ঘটনা নয়, কোনো খবরই খবর না। যেকোনো পেশার মানুষ, গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম কেউই বাদ যাচ্ছেন না এই মানসিকতা থেকে। সবারই ইচ্ছা ভাইরাল করা বা ভাইরাল হওয়া। কিন্তু এই ভাইরাল করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেললেই বাধে যত বিপত্তি। সস্তা জনপ্রিয়তা, লাখ লাখ ভিউজ পাওয়ার জন্য যখন নিম্নমানের, অসত্য, অর্ধসত্য, রুচিহীন, দৃষ্টিকটু ও আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন সেটা ভয়াবহ ফলাফল বয়ে আনে ব্যক্তির জীবনে ও সমাজে। এর চেয়েও বাজে কাজ হচ্ছে গুজব ছড়িয়ে কোনো ব্যক্তির ও প্রতিষ্ঠানের সম্মান নষ্ট করা, তাকে হেনস্তা করা।  

বাজারে এসেছে ট্রল। শিল্পী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, কবি-সাহিত্যিক কেউ বাদ যাচ্ছেন না ট্রলের হাত থেকে। বিশেষ করে নায়ক-নায়িকারা বেশি শিকার হচ্ছেন ট্রলের। শুধু কি তা-ই, নারীকে যৌন হয়রানি, মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধকে আঘাত করা, রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থির করা ও অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করার মতো জঘন্য অপরাধও ঘটিয়ে থাকে এই ট্রল করতে গিয়ে। বিষয়টি আনন্দ বা নিছক মজা না হয়ে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গণমাধ্যম তথ্যভান্ডার, সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার ও সেইসঙ্গে বিনোদনের উৎস। গণমাধ্যম 'এজেন্ডা সেটিং' করে। মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে সমকালীন ও আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি নয়। কীভাবে ভাবতে হবে, মতামত দিতে হবে, প্রতিবাদ জানাতে হবে, তা-ও দেখিয়ে দেয়। শুধু তা-ই নয়, জনমত তুলে ধরাও গণমাধ্যমের কাজ।

কাজেই এখানে যা প্রকাশিত বা প্রচারিত হবে, তা অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। শুধু ভাইরাল হওয়ার জন্য বা ভিউ বাড়াবার জন্য সাংবাদিকরা যা খুশি লিখতে পারেন না, প্রকাশ করতে পারেন না। মানুষের সম্মান নষ্ট করা, সমাজ ও রাষ্ট্রকে কলুষিত ও বিভ্রান্ত করাটা এক ধরনের অপরাধ। অথচ যেহেতু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জয়জয়কার, তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে অন্যরূপে ফিরে এসেছে  'ইয়েলো জার্নালিজম বা হলুদ সাংবাদিকতা'।

গণমাধ্যমগুলোর বড় একটা অংশ মনে করছে পাঠক টুইস্ট, ট্রল, বুলিং, নায়ক-নায়িকার জীবন-যাপন নিয়ে রসাত্মক সংবাদ, খোলামেলা ছবি পছন্দ করেন। কোন নায়ক কতবার বিয়ে করছেন, কয়টা বাচ্চার বাবা হচ্ছেন, কোন নায়িকার ঘরে কে প্রবেশ করছে, কার উচ্চারণ কতটা কদর্য, কার বাচ্চা কার গর্ভে, কোন খেলোয়াড় কতবার পরকীয়া করল, এইসব সংবাদ যখন প্রথম শ্রেণির পত্রপত্রিকা ছাপাতে শুরু করে এবং চ্যানেলগুলোর কেউ কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ে অনুষ্ঠান করে তখন বাধ্য হয়ে বলতেই হয়, ভিন্ন চেহারায় হলুদ সাংবাদিকতা ফিরে এসেছে। এসবের উদ্দেশ্য শুধু ভিউজ বাড়ানো।

একসময় বাজারের নিম্নমানের পত্রিকা তাদের বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য এ ধরনের খবরাখবরকে আশ্রয় করে টিকে থাকত। সেইসময় তারা যা ছাপত, এখন অনেক পত্রিকাই তাদের অনলাইনে সেই ধরনের খবর আপলোড করছে। চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস সেদিন বলেছেন, 'ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতার কারণে আমাদের নানা ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। সাইবার বুলিংয়ের  নেতিবাচক প্রভাব খুবই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। কারণে-অকারণে ভিউয়ার বাড়ানোর আশায় সাইবার বুলিং করছেন। আর এটা মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ আমরা সবাই পরিবার নিয়ে বসবাস করি। আমাদের একটি অবস্থান আছে। হয়তো আমরা চিত্রনায়িকা, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অনেক নিউজের কারণে আমাদের নানা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।' কথাটা খুবই সত্যি।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল লার্নার বলেছিলেন, গণমাধ্যম জনগণের মানসিকতাকে উন্নত করে। তিনি সাংবাদিকদের সমাজের 'গেট কিপার' বলেছেন। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় বাজার সৃষ্টি হওয়ায়। একটা লেখায় পড়লাম, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও সংবাদপত্রের মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে ইন্টারনেটের রমরমা অবস্থাকেই দায়ী করেছেন। ওবামার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল সিনেমার জন্মের পরও তো সমানভাবেই বইয়ের আকর্ষণ ছিল। মানুষ তো বই পড়তে ভুলে যায়নি। তবে কেন ইন্টারনেট কেড়ে নেবে সংবাদপত্রের গুরুত্ব? ওবামা অল্প হেসে জবাব দিয়েছিলেন, 'কারণটা সহজ, ব্যবসা।' তিনি বলেছিলেন, 'দেখুন, মধ্যবিত্তের সুখের দিন গিয়েছে। রোদে পিঠ দিয়ে বসে খবরের কাগজ পড়াটা এখন বিলাসিতা।'

আমেরিকার একের পর এক সংবাদপত্রের দরজায় তালা ঝুলছে। আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রকাশনা 'ওয়াশিংটন পোস্ট'-এর মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। এই সংবাদপত্রের মালিকানা হাতে নিতে চলেছেন 'আমাজন ডট কম'-এর প্রতিষ্ঠাতা। অনলাইনের প্রবল আধিপত্যের মুখে পশ্চিমা দুনিয়ায় সংবাদপত্র সংকটের মুখে পড়েছে। একদা মার্কিন পত্রিকা নিউজ উইক ৮০ বছর দাপটের সঙ্গে চলেছে, এখন তারা মুদ্রণ মাধ্যম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

তবে এটা ঠিক, যতই সংকট তৈরি হোক না কেন, বহুল প্রচলিত প্রকাশনাটির 'সাংবাদিকতার ঐতিহ্য' আগের মতই বজায় থাকবে বলে মালিকপক্ষ মনে করছেন। মিডিয়ার দুনিয়ায় সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন থেকে প্রাপ্ত আয়ের পরিমাণ বজায় রাখা ও পাঠককে ধরে রাখা তাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ঠিক এদিকটার প্রতিই দৃষ্টি দেয়ার অনুরোধ করছি। বাংলাদেশে হিরো আলমের ফলোয়ার ও ইউটিউব ভিউয়ারের সংখ্যা অসংখ্য। এই যুক্তিতে কি আমাদের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হিরো আলমকে আশকারা দেয়নি? আজকের হিরো আলম কীভাবে তৈরি হলো? আমরা অনেকেই হিরো আলমকে নিয়ে হাসাহাসি করি, বিরক্ত হই। অথচ দেশের প্রথম সারির মিডিয়া ও অনলাইন মিডিয়াতে তার সংবাদের প্রচার ঠেকানো যায়নি। মিডিয়া কি সুস্থ কালচারকে পাশ কাটিয়ে শুধু ভিউজের জন্য পপুলার কালচারের দিকে ঝুঁকে যায়নি? উদ্ভট অঙ্গভঙ্গি, উদ্ভট পোশাক, বাজে উচ্চারণ, চিৎকার-চেঁচামেচি করাকে কি গান বা অভিনয় বলা যায়? অর্থহীন এইসব আয়োজন যখন মানুষের কাছে আদৃত হয় অথবা মিডিয়া এগুলোকে প্রমোট করে তখন পুরো জাতির রুচির মান নিয়ে প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক।

ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে একদিকে যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করা যায়, তেমনি এর অপব্যবহার হলে তা অন্য মানুষের মর্যাদা, শান্তি, অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে। ঠিক এই জায়গাটাতেই গণমাধ্যমকে কাজ করতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রজন্মকে নিয়ে। প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে তাদের বুঝাতে হবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন কিছু প্রচার ও সম্প্রচার করা যাবে না, যা  বিদ্বেষপূর্ণ ও ঘৃণাসূচক এবং যা জনশৃঙ্খলা বা শান্তি নষ্ট করতে পারে, সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে বা সহিংসতা উসকে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মেয়েদের যৌন হয়রানি করা যাবে না।

ফেইসবুকের মাধ্যমে এত বেশি ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে, যা বাংলাদেশে নানাধরনের সংঘাত বাড়িয়ে তুলেছে। একশ্রেণির মানুষ ঘৃণা বা বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচার করছেন এবং এর ওপর নির্ভর করে বিভেদ সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের দেশে জনগণের বড় একটা অংশ কম পড়াশোনা জানা ও নিরক্ষর। তারা ডিজিটাল মিডিয়ার প্রচার-প্রচারণা নিয়ে খুব একটা সচেতনও নন। যা দেখেন, তা-ই বিশ্বাস করেন। আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগায় অসাধু ব্যক্তিরা। প্রায় শতকরা ৮৬ জন তরুণ-তরুণীর স্মার্টফোনের প্রবেশাধিকার রয়েছে। এত বড় একটা অংশ ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার করলেও এদের কতজন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে ভাবছেন? অথবা অনলাইনের ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন?

বাংলাদেশে শুধু রাজনীতি নয়, শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্ঞান, গবেষণা, সাহিত্য প্রতিটা ক্ষেত্রেই মান নিম্নমুখী হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশ যটা এগিয়েছে, মানবিক উন্নয়নে ততটাই পিছিয়েছে। হিরো আলমদের উত্থান কিন্তু একদিনে হয়নি। আমাদের রুচির যে অধোগতি হচ্ছে, তা রোধ করে কার সাধ্য। যদি বলি আমাদের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও একটা দায় রয়েছে, এক্ষেত্রে তাহলে কি খুব একটা ভুল বলা হবে? এই যে তিশা নামের একটি ১৯ বছরের মেয়ে তার বাবার চাইতেও বড় একজন ভদ্রলোককে বিয়ে করেছে, এটা বড় করে একটি নিউজ হয়েছে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে। ব্যস, এরপর শুরু হয়ে গেল এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমের ত্যানা পেঁচানো। খবর, ফিচার, ইন্টারভিউ, ভিডিও কিছু বাদ গেল না, যার ফলস্বরূপ এইবার বইমেলায় তাদের প্রেমকাহিনি নিয়ে বইও বের হয়েছে। এরপর দেখি একই নারীর সঙ্গে দুবার পরকীয়া, যেভাবে বিপর্যস্ত ওয়াকারের জীবন অথবা সানিয়া মির্জার সঙ্গে শোয়েব মালিকের ডিভোর্স নিয়ে নানাধরনের অরুচিকর খবর ছবি আপলোড হয়েই চলেছে। কারণ ভিউজ বেশি পাচ্ছে।

একটা সময় ছিল যখন সমাজের রুচিবান, ভদ্র, শিক্ষিত মানুষের ড্রইং রুমে ট্যাবলয়েড পত্রিকা বা এমন কোনো পত্রিকা রাখা হতো না যারা সেনসেশনাল ও রগরগে খবর ছাপাত। যারা হলুদ সাংবাদিকতাকে পুঁজি করত, তারা একসময়ে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতো। সাংবাদিকতার জগতে 'হলুদ সাংবাদিকতা' নতুন কিছু নয়। সংবাদপত্র শিল্পের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার সূত্রপাতের সময় থেকেই 'হলুদ সাংবাদিকতা'র বিষয়টি জড়িয়ে আছে। এখনও সংবাদপত্র শিল্পের বাণিজ্যকে ঘিরেই এই নিউজ-ভিউজের উত্থান। হলুদ সাংবাদিকতা হচ্ছে সেই সাংবাদিকতা যেখানে থাকে তথ্যবিকৃতি, যা উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকাশ ও প্রচার করা হয় এবং মনগড়া ও উসকানিমূলক।

ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে সংবাদপত্রের সেই পুরোনো ইতিহাস নতুনভাবে ফিরে এসেছে। মানসম্মত কনটেন্ট নাকি প্রচারণার কৌশল কোনটা বেশি জরুরি? সংবাদপত্রগুলোই শুধু নয়, ইলেকট্রনিক মিডিয়াও তাদের কন্টেন্ট, আয়োজন, নিউজের ধরন, ফিচার ও অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও যথাসম্ভব পরিবর্তন, পরিবর্ধন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভিউজ বাড়ানোর জন্য এমন অনেক ধরনের ছলনার আশ্রয় নিচ্ছে, যা ঠিক রুচিশীল সংবাদের তালিকায় পড়ে না। মাঝেমধ্যে মিথ্যা ও সেনসেশনাল খবর আপলোড করতেও পিছপা হচ্ছেনা।

কার আগে কে সংবাদটি তুলে ধরবে, এজন্য সত্যতা যাচাইয়ের আগেই তাড়াহুড়ো করে অনলাইনে নিউজ আপলোড করছে, যাতে ভিউজ বাড়ে। এই নতুন কিছু দিতে গিয়েই খানিকটা রংচং, তথ্য বিকৃতি, রগরগে ভাষা ও ছবির ব্যবহার, অর্ধসত্য সংবাদ প্রচার করতে হয় বলে বাধে বিপত্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু বিনোদন ও তথ্য দিলেই হয় না, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংও করতে হয়। আর তখনই প্রশ্ন ওঠে রুচিকর সংবাদ না অরুচিকর কিছু দিয়ে ভিউজ বাড়ানোর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিন্দুকদের আমরা এখন 'হেটার' বা নিন্দুক হিসেবে চিহ্নিত করি। তাদের কাজকে দেখি 'ট্রল' হিসেবে। বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য করে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কমেন্টবক্স ভরে ফেলে। এগুলোকেও কি আমরা ভিউজ হিসেবে ধরে নেব? এর ফলে দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আর পড়েছে বলেই অনলাইনের ওপর জোর দিচ্ছে। মুদ্রিত পত্রিকার সার্কুলেশন ব্যাপক হারে কমেছে, বেড়েছে অনলাইন পত্রিকার পাঠক। যেহেতু অনলাইন মিডিয়াকে ইউটিউবের অসমর্থিত নিউজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক দিকটিও দৃশ্যমান হচ্ছে। প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া হাউজের কি উচিত সামাজিক মাধ্যমের মতো করে কনটেন্ট আপলোড করা?

প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অনেক খবর ও ছবিকে এডিট করে যেকোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে যেমন বিপদে ফেলা যায়, তেমনি সমাজেও হাঙ্গামা সৃষ্টি করা যায়। এসব বানানো বা অর্ধসত্য জিনিস লাখ লাখ ভিউয়ার দেখে, কমেন্ট এবং শেয়ার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এইসব কনটেন্ট কি মূলধারার গণমাধ্যম গ্রহণ করে প্রতিযোগিতায় নামবে নাকি নামা উচিত? নাকি এগুলোকে যেন প্রতিহত করা যায়, সেই চেষ্টা করবে?

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সময় পড়েছিলাম সংবাদপত্রসহ অন্যান্য গণমাধ্যম জনমত তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে এবং মিডিয়া চাইলে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক চেহারা বদলে দিতে পারে। অবশ্য এটা নিয়েও তর্ক হতো যে আসলেই কি তা-ই? অর্থাৎ গণমাধ্যম কি মানুষের মনোজগত নিয়ন্ত্রণ করে? নাকি মানুষ যা দেখতে চায়, শুনতে চায় গণমাধ্যম সেটিই বারবার বলে?

আবার মিডিয়ার আরেকটা দিক হলো, তারা সেসব খবরই বেশি প্রচার করে যেগুলো সাধারণ মানুষ বেশি পছন্দ করে। সে খবর কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা দেখার বিষয় নয়। তাই এখানেও সেই একই তর্ক উঠতে পারে যে মিডিয়াই মতমোড়ল, নাকি পাবলিক যা চায় মিডিয়া তা-ই দেখায়? যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মার্শাল ম্যাকলুহান মনে করেন 'মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ'। মাধ্যমই সংবাদ, অর্থাৎ সংবাদমাধ্যম নিজেই একটা চরিত্র ধারণ করে পরে সে সেই চরিত্রকেই বাজারজাত করে। এটা বাজারের স্বার্থে, প্রতিযোগিতা করার জন্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অন্য নানা কারণে করতে পারে। তাহলে শেষ প্রশ্নটা হলো, গণমাধ্যম কি শুধু জনগণকে প্রভাবিত করে? বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করে? স্বপ্ন দেখায়? নাকি গণমাধ্যম নিজেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ডিজিটাল দুনিয়ার অনিয়ন্ত্রিত তথ্য প্রবাহের কাছে?

শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলামিষ্ট

লেখাটি ইংরেজি দৈনিক দি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের অনলাইনে ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত।